রাশিয়া ও ইরানের অন্যতম সামরিক ‘লাইফলাইন’ এখন কাস্পিয়ান সাগর
রাশিয়া ও ইরানের বিস্তৃত সামরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ করিডোর হয়ে উঠেছে কাস্পিয়ান সাগর। পশ্চিমা নৌবাহিনীর নাগালের বাইরে থাকা এ জলপথে—দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম আদান-প্রদানে স্থলবেষ্টিত কাস্পিয়ানের নৌরুট এখন তাদের মূল ভরসা হয়ে উঠেছে।
কাস্পিয়ান ব্যবহার করে মস্কো ও তেহরান বিপুল পরিমাণ মালামাল আমদানি-রপ্তানি করতে পারছে, যেখানে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সরাসরি প্রবেশাধিকার নেই। আবার নজরদারি চালানোর সুযোগও সীমিত।
সম্প্রতি এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তাদের হাতে আসা একটি নথি অনুযায়ী—যা একজন পশ্চিমা কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন—মস্কো ইতোমধ্যে কাস্পিয়ান সাগর ব্যবহার করে ইরানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিরক্ষানীতি ও কৌশল-বিষয়ক সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্যারি পাভেল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রেডিও ফ্রি ইউরোপ-কে বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধে জর্জরিত এই দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা গভীর হওয়ার প্রেক্ষাপটে, এই করিডোরটির দিকে বিশ্বনেতাদের আরও বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, "এই দুটি দেশ যত কাছাকাছি আসবে, এই পথ দিয়ে দ্বিপক্ষীয় মালামাল আদান-প্রদান ততই বাড়বে।"
কাস্পিয়ান সাগরকে রাশিয়া ও ইরান উভয়ের জন্যই একটি "প্রাকৃতিক ও সুরক্ষিত দ্বিমুখী সরবরাহ লাইন" হিসেবে বর্ণনা করেছেন সারাতোগা ফাউন্ডেশনের সভাপতি গ্লেন হাওয়ার্ড। আর এই সুরক্ষার কারণেই দেশদুটি এই পথটিকে বেছে নিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের গত পাঁচ বছরে ইরান রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সামরিক সরবরাহকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশটি রাশিয়াকে ড্রোন, সামরিক প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। এমনকি রাশিয়ার আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে 'শাহেদ' ড্রোন উৎপাদনেও সহায়তা করেছে তেহরান।
এখন রাশিয়াও ইরানের সেই সমর্থনের প্রতিদান দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রায় ছয় মাসের সংঘাতের ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুনর্গঠনে সহায়তা করছে মস্কো।
রহস্যময় কার্গো ও পশ্চিমা উদ্বেগ
কাস্পিয়ান সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে কী ধরনের মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে, তা অনেকাংশেই অজ্ঞাত। ফলে মোট বাণিজ্যের মধ্যে বেসামরিক বাণিজ্যিক পণ্য ও কাঁচামালের সাথে সামরিক সরঞ্জামের অনুপাত নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। কারণ কাস্পিয়ান রাশিয়া-ইরানের মধ্যে গমসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্য পরিবহনেরও একটি প্রধান রুট।
গ্লেন হাওয়ার্ড বলেন, "জাহাজগুলোতে আসলে কী আছে— তা আমরা সুনির্দিষ্টভাবে জানি না। তবে সেখানে যে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ও মালামাল পরিবহন চলছে, তা নিশ্চিত।"
কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন রাশিয়া-ইরানের এই সামরিক ও লজিস্টিকস সম্পর্কের দিকে কড়া নজর রাখছে। বিশেষ করে যুদ্ধকালীন এই সরবরাহ ব্যবস্থা একটি স্থায়ী কাঠামোতে রূপ নেয় কি না, সে বিষয়ে নজরদারি করা হচ্ছে।
তবে কাস্পিয়ান সাগরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাণিজ্যে স্বচ্ছতার অভাবের কারণে প্রতিটি চালানের সুনির্দিষ্ট উপাদান জানা চ্যালেঞ্জিং। তা সত্ত্বেও মার্কিন নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, কীভাবে রাশিয়া ও ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আর সামরিক চাপ এড়িয়ে একটি সুরক্ষিত সরবরাহ নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, তা মূল্যায়নে এই করিডোরটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
এই করিডোরের ভৌগোলিক অবস্থানই এর প্রধান শক্তি। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বাশার আল-আসাদ সরকারকে ভূমধ্যসাগর ও বসফরাস প্রণালি দিয়ে সরঞ্জাম সরবরাহ করার যে পথ (যাকে 'সিরিয়ান এক্সপ্রেস' বলা হতো) ব্যবহার করা হতো, তার চেয়ে কাস্পিয়ান সাগর সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি চারদিকে স্থলবেষ্টিত একটি হ্রদ।
রুশ বন্দর অলিয়া বা আসত্রাখান থেকে ভারী সামরিক ও বাণিজ্যিক সরঞ্জাম জাহাজে তুলে কাস্পিয়ান সাগর পার করে সরাসরি ইরানে পাঠানো সম্ভব। হাওয়ার্ডের মতে, "এই পথে বিপুল পরিমাণ মালামাল অনেক গোপনে ও নিরাপদে পাঠানো যায়। মার্কিন নৌবাহিনীও কাস্পিয়ানে প্রবেশ করতে পারবে না।" তিনি এটিকে রাশিয়ার একটি সুরক্ষিত 'দুর্গ' হিসেবে বর্ণনা করেন।
