প্রথমবার উন্মুক্ত নিলামে রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
বিনিময় হারের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে প্রথমবারের মতো নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২ কোটি ডলার বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে নিলাম আয়োজন করলেও ছয়টি ব্যাংকের কাছে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা।
নিলামে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৮ শতাংশ ডলার বিক্রি হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর তুলনামূলক কম চাহিদার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডলারের বিনিময় হার যাতে আরও না বাড়ে, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে।
তিনি বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে যে, চাহিদার চাপে ডলারের দাম বাড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকও বাজারে ডলার বিক্রি করতে পারে। আবার বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনতেও পারে।
এর আগে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময়ও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে তখন উন্মুক্ত নিলামের পরিবর্তে নির্দিষ্ট গ্রাহকের প্রয়োজন মেটাতে বাছাই করা ব্যাংকের কাছে সরাসরি ডলার বিক্রি করা হয়েছিল।
একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আগের ওই পদ্ধতিকে 'অযৌক্তিক, অদক্ষ ও অপেশাদার' বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, কোন ব্যাংক ডলার পাবে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই নির্ধারণ করত বলে ওই পদ্ধতিতে বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতার সুযোগ ছিল না।
গতকালের নিলামটি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য উন্মুক্ত ছিল। নিলামে সর্বোচ্চ দর দেওয়া ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করা হয়।
এমন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার বিক্রি করল, যখন এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে ১২৩ টাকা ৪৫ পয়সায় উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার এ হার ছিল ১২৩ টাকা ১০ পয়সা এবং এর আগের সপ্তাহে ছিল ১২৩ টাকার নিচে।
একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমবারের মতো এ ধরনের নিলাম হওয়ায় এবং প্রক্রিয়াটি নতুন হওয়ায় অনেক ব্যাংক হয়তো পুরোপুরি অংশ নেয়নি।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক দুপুর ১টার পর ব্যাংকগুলোকে নিলামের বিষয়ে জানায়। ততক্ষণে অনেক ব্যাংক দৈনন্দিন লেনদেন ও পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। ভবিষ্যতের নিলামগুলোতে ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে মোট ৫ কোটি ডলার কিনেছিল।
এতদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ বাড়াতে মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে আসছিল। এবারই প্রথম নিলামের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর কাছে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে কমতে পারে ডলারের দর
গতকাল সকালে কয়েকটি রেমিট্যান্স হাউস বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সা দরে বিক্রির প্রস্তাব দেয়। পরে তারা দর ২০ পয়সা বাড়িয়ে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা চায়। তবে কয়েকটি ব্যাংক এই বাড়তি দরে ডলার কিনতে রাজি হয়নি।
ব্যাংকাররা বলেন, রেমিট্যান্স হাউসগুলোর বেশি দর চাওয়ায় বাজারে ডলারের বিনিময় হারের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছিল।
দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছে, গতকাল ব্যাংকগুলো তাদের এলসি নিষ্পত্তির জন্য প্রতি ডলারের দর ১২৩ টাকা ৪৫ পয়সা প্রস্তাব করে।
তবে গতকালের নিলামে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সা দরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করায় আজ এলসি নিষ্পত্তি ও রেমিট্যান্স হাউস—উভয় ক্ষেত্রেই ডলারের দর কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছেন ব্যাংকাররা।
তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর রেমিট্যান্স হাউসগুলোর জন্য প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা দর ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এতে বাজারে ডলারের দামের ওপর আরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
