ঢাকার ৪১৬ বছর উদযাপনে প্রতিটি ব্যাংকের কাছে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত স্পন্সর চায় ডিএসসিসি
রাজধানী ঢাকার ৪১৬তম বার্ষিকী উদযাপনে সপ্তাহব্যাপী আয়োজনের ব্যয় নির্বাহে দেশের প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বনিম্ন ৫০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত স্পন্সরশিপ চেয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
চলতি মাসে ৭ দিনব্যাপী 'ঢাকা দিবস-২০২৬: হৃদয়ে ঢাকা'- উদযাপনের আয়োজন করবে ডিএসসিসি। এ প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে এ অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছেন ডিএসসিসি।
তবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) সর্বশেষ বাসযোগ্য শহরের সূচকে ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই তালিকায় ঢাকার নিচে রয়েছে শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত ত্রিপোলি ও দামেস্ক।
ব্যাংক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা এ উদ্যোগকে আইনি দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং নগরবাসীর জরুরি সমস্যার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
তাদের মতে, বারবার জলাবদ্ধতা, ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের নাগরিক সেবার সংকটের কারণে নগরজীবন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় সিএসআর তহবিল উৎসব আয়োজনের পরিবর্তে নগর সমস্যার সমাধানে ব্যয় করা উচিত।
গত সপ্তাহে ডিএসসিসি ১৩ জুলাই তারিখের চিঠি দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে 'ঢাকা ডে ২০২৬' আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা চায়।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠির অনুলিপি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) হাতে এসেছে।
তবে ডিএসসিসির পাঠানো আনুষ্ঠানিক চিঠিতে কোনো সুনির্দিষ্ট অঙ্কের উল্লেখ ছিল না। গত সপ্তাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় অর্থের পরিমাণ জানানো হয়।
ডিএসসিসির প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সভায় একটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে ব্যাংক ও এমএফএস টেকনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বনিম্ন ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত স্পন্সরশিপ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তবে এ ধরনের স্পন্সরশিপের বিষয়ে ঘোর আপত্তি ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা (এমডি)।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আর্থিক ভিত্তি এমনিতেই দুর্বল। ২০২৫ সাল শেষে দেশের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিট মুনাফা কমেছে, এমনকি অনেকে লোকসানেও রয়েছে।
তথ্যানুসারে, ২০২৫ সাল শেষে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংকের সম্মিলিত নিট মুনাফা আগের বছরের ৪ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা থেকে ৩১% কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকায়।
এমন পরিস্থিতিতে ডিএসসিসির মতো একটি সংস্থার উৎসব আয়োজনের জন্য কোটি কোটি টাকার স্পন্সরশিপ চাওয়াকে ব্যাংকের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে দেখছেন তারা।
একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী সিএসআর তহবিল থেকে এ ধরনের উৎসব বা মেলায় অর্থায়নের কোনো সুযোগ নেই। তাই ব্যাংক থেকে স্পন্সর নিয়ে উৎসব আয়োজনের এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
চিঠিতে যা বলেছে ডিএসসিসি
ডিএসসিসির পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ১ আগস্ট থেকে ঢাকাবাসীর সর্বজনীন উৎসব 'ঢাকা দিবস-২০২৬: হৃদয়ে ঢাকা'- উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
'আমার শহর, আমার দায়িত্ব: আমি বদলাই, ঢাকা বদলাবে'—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ৭ দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে ডিএসসিসি। এতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, ঐতিহ্যবাহী মেলা, ম্যারাথন, সাইক্লিং, কনসার্ট ও প্রদর্শনীসহ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে; যা ঢাকার নাগরিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, 'আপনার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণমূলক কাজের সুনাম সর্ববিদিত। আমরা বিশ্বাস করি, আপনাদের উদার আর্থিক অংশীদারিত্ব এই উৎসবের সফলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।'
যা বলছেন ডিএসসিসি প্রশাসক ও ব্যাংকাররা
বিষয়টি নিয়ে ডিএসসিসির প্রশাসক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'ঢাকা একটি ঐতিহ্যবাহী শহর, তবে এর ইতিহাস কখনোই ওভাবে ফোকাস পায়নি। এই উদযাপনের মাধ্যমে ঢাকার অতীত, ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হবে, যা ঢাকাবাসীকে গর্বিত করবে।'
ব্যাংকগুলোর অমতের বিষয়ে তিনি বলেন, 'ব্যাংকের স্পন্সর করার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা আমরা জানি। দেখা যাক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেমন ফান্ড পাওয়া যায়।'
অন্যদিকে, প্রায় ২০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
একটি ব্যাংকের এমডি বলেন, 'ব্যাংকের আমানতের অর্থ আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের। প্রশাসক চাইলেন বলেই তো আর সেই টাকা দেওয়া যায় না। সিএসআর ফান্ডের টাকা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ৭ দিনের কোনো মেলা বা কনসার্টে এই অর্থ ব্যয়ের কোনো আইনি সুযোগ নেই। আমরা অর্থায়ন করব না।'
আরেকটি ব্যাংকের এমডি বলেন, 'দৃশ্যমান জনকল্যাণমূলক কাজ ছাড়া আমরা সিএসআর ফান্ড দিই না। আমাদের মতো দরিদ্র দেশে সিএসআর ফান্ড খরচ করার জন্য শিক্ষাবৃত্তি বা স্বাস্থ্যসেবার মতো অনেক উপযুক্ত জায়গা রয়েছে।'
আরেকজন এমডি ডিএসসিসির কাজের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, 'সামান্য বৃষ্টিতেই যখন ঢাকা দক্ষিণ সিটির অধিকাংশ সড়ক জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়ে এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজের কারণে নাগরিক দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়, তখন সেই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ৭ দিনের উৎসব আয়োজন কতটা যুক্তিযুক্ত?'
তিনি আরও বলেন, 'ডিএসসিসির উচিত তাদের নিজস্ব তহবিল থেকেই যদি সম্ভব হয় এটি পরিচালনা করা, ব্যাংকগুলোকে চাপ দেওয়া নয়।'
নগরপরিকল্পনাবিদরা যা বলছেন
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, 'ঢাকার দক্ষিণে ড্রেনেজ সিস্টেমকে উন্নত করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আরও উন্নত করা জরুরি। ঢাকাকে উন্নত করতে সিটি কর্পোরেশনকে আরও অনেক কাজ করতে হবে। কারণ বৃষ্টি পড়লে ঢাকার দক্ষিণের রাস্তাঘাট পানির নীচে তলিয়ে যায়।'
তিনি বলেন, 'সিটি কর্পোরেশন এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর কাছে এভাবে অর্থায়ন চাইতে পারে কি না সেটা নিয়ে একটা নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে, আমার মনে হয় এর কোনো নৈতিক জায়গা নেই। এই রকম অর্থ চাওয়া এক রকম চাঁদাবাজি।'
তিনি আরও বলেন, 'আওয়ামী সরকারের আমলেও আমরা এমন চর্চা দেখেছি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কথা বলে ব্যাংক ও নানা প্রতিষ্ঠান থেকে স্পন্সরের নামে চাঁদা নেওয়া হয়েছে।'
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, 'ব্যাংক আমানতকারীর অর্থ দিয়ে ব্যবসা করে, তাই ব্যাংক কেনো এ ধরনের অনুষ্ঠান করার জন্য অর্থ চাওয়া ঠিক নয়। তাছাড়া এ রকম অনুষ্ঠানে অর্থ দেওয়া হলে সেটার হিসাবও ঠিকমতো থাকে না।'
