শেরেবাংলা নগরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ৩,৫৪২ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্পের প্রস্তাব
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আধুনিক আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রায় ৩,৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। গত ১৩ জুলাই কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্যা ভূইয়ার সভাপতিত্বে প্রকল্পটির ওপর একটি মূল্যায়ন সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের মূল্যায়ন সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির আওতায় শেরেবাংলা নগরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিভিন্ন আয়তনের মোট ৪২টি ভবনে ১,৫১২টি আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে।
এর মধ্যে ২,৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের জন্য একটি, ১,৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের জন্য ১০টি, ১,৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের জন্য ১১টি এবং ১,২৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের জন্য ২০টি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের উচ্চতা হবে ১০ তলা।
'হাউজিং ফর গভর্নমেন্ট অফিসিয়ালস/এমপ্লয়িজ ইন শেরেবাংলা নগর, ঢাকা' শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০৩০ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ঢাকায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে আবাসন সংকটে রয়েছেন।
তিনি বলেন, "ঢাকায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।"
ভবনের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১০ তলা
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্প এলাকাটি জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন। জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন শেরেবাংলা নগরের ৪৩ একর জায়গা নিয়ে সংসদ ভবনের নকশা প্রণয়ন করেছিলেন এর স্থপতি লুই আই কান।
ওই নকশা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরের এ এলাকায় কোনো ভবনের উচ্চতা জাতীয় সংসদ ভবনের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। এ কারণে প্রস্তাবিত আবাসিক ভবনগুলোর উচ্চতা সর্বোচ্চ ১০ তলা রাখা হয়েছে বলে মূল্যায়ন সভায় জানান স্থাপত্য অধিদপ্তরের একজন নির্বাহী স্থপতি।
সুইমিং পুল, স্কুল-কলেজ, মসজিদ ও বাজার
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প এলাকার পুরোনো ভবনগুলো ভেঙে সেখানে নতুন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পে বিভিন্ন নাগরিক ও বিনোদন সুবিধাও রাখার প্রস্তাব দিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে বহুতল বেজমেন্ট পার্কিং, দুই স্তরের বেজমেন্টসহ তিনতলা আটটি সুবিধা ভবন এবং দুই স্তরের বেজমেন্টসহ ছয়তলা পাঁচটি কমিউনিটি সুবিধা ভবন। এসব ভবনে স্কুল, কলেজ, মসজিদ, বাজার ও কমিউনিটি সেন্টার থাকবে।
এ ছাড়া এক স্তরের বেজমেন্টসহ ১০ তলা একটি ডরমিটরি ভবন, সুইমিং পুল, শিশুদের খেলার মাঠ এবং ভূগর্ভস্থ পানির জলাধার নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্পে মোট ২,৮৩৮টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২,৫০০ ও ১,৮০০ বর্গফুটের প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য দুটি করে এবং ১,৫০০ ও ১,২৫০ বর্গফুটের প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য একটি করে গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের গাড়ির জন্য কমিউনিটি স্পেসে সাধারণ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।
মূল্যায়ন সভায় প্রকল্পটির সার্বিক দিক পর্যালোচনার পাশাপাশি জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের মূল মাস্টারপ্ল্যান অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় বুয়েট, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ এবং অভিজ্ঞ স্থপতিদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। লুই আই কানের মূল মাস্টারপ্ল্যান ও স্থাপত্যের নীতিগুলো অক্ষুণ্ন থাকছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পর্যালোচনা করবে এই প্যানেল।
সভা থেকে প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করারও নির্দেশ দেওয়া হয়। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে পুনরায় জমা দিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ঢাকায় প্রায় দেড় লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত থাকলেও চাহিদার তুলনায় মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ সরকারি আবাসন সুবিধা পান। আবাসন সংকটের কারণে সিংহভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় করে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়, যা তাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, শেরেবাংলা নগরসংলগ্ন ফার্মগেট, শেরেবাংলা নগর ও তেজগাঁও এলাকায় অনেক সরকারি অফিস গড়ে উঠেছে। এসব অফিসে কর্মরত কর্মকর্তাদের অনেককেই দূর থেকে কর্মস্থলে যাতায়াত করতে হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
