ইলেকট্রনিক্স থেকে পোশাক ও কাচ শিল্প: যেভাবে কারখানার ছাদকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে
গ্রিডের বিদ্যুৎ চলে গেলেও এখন আর কারখানার চাকা বন্ধ হচ্ছে না। লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশের একের পর এক কারখানার ছাদ রূপান্তর করা হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় এবং ব্যয়বহুল জেনারেটরের ব্যবহার এড়াতে দেশের শিল্পমালিকেরা এই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন।
কারখানাগুলোর কাছে রুফটপ সোলার এখন কেবল বিদ্যুৎ বিল কমানো বা বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর শর্ত পূরণের মাধ্যম নয়; বরং এটি জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের সময়েও উৎপাদন সচল রাখার এক নির্ভরযোগ্য উপায় হয়ে উঠেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটেরও বেশি ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি বড় অংশ রয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায়। তবে ইলেকট্রনিক্স, ইস্পাত, কাচ, সিরামিক এবং টেক্সটাইল খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও দ্রুত তাদের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। জ্বালানি সংকট ঘনীভূত হওয়ার কারণে গত দুই বছরে সবচেয়ে বেশি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে।
যেমন ওয়ালটন গ্রুপের কারখানাগুলোতে এখন রুফটপ সোলার থেকে ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা কোম্পানির মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ মেটায়।
ওয়ালটন গ্রুপের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, 'শিগগিরই আরও ২৫ মেগাওয়াট সোলার স্থাপন করা হবে। এর ফলে বছরের শেষ নাগাদ আমরা আমাদের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করতে পারব।'
তিনি জানান, বছরে প্রায় ২৮,৫০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এই সিস্টেমে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় মাত্র ৪ টাকা ২০ পয়সা, যা প্রচলিত জেনারেটরের খরচের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।
এই আনুমানিক খরচের মধ্যে প্রাথমিক সেটআপ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সিস্টেমের জীবনকালও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে লোডশেডিংয়ের সময় দিনের বেলায় এই সৌরবিদ্যুৎ একদিকে যেমন গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমায়, অন্যদিকে ডিজেল বা গ্যাস জেনারেটরের ব্যয়বহুল ব্যবহার থেকে মুক্তি দেয়। তবে যেসব কারখানায় ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) রয়েছে, তারা দিনের আলোর বাইরেও এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।
উৎপাদন চালু রাখছে সৌর
নরসিংদীর ঘোড়াশালে আকিজবশির গ্রুপের কারখানা জনতা জুট মিলসে ২১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এই প্ল্যান্টে একটি ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমও রয়েছে, যা সূর্যাস্তের পরও কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ দেয় এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমায়। ২০২৩ সাল থেকে চালু হওয়া এই প্ল্যান্টে চীনের তৈরি ট্রিনা সোলার প্যানেল এবং হুয়াওয়ে ইনভার্টার ব্যবহার করা হয়েছে, যা বছরে প্রায় ২.৭৬ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
আকিজবশির গ্রুপের প্রজেক্ট ম্যানেজার হুসাইন মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, 'সোলার সিস্টেম আমাদের লোডশেডিংয়ের ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং অনেক কম খরচে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ করে দিয়েছে।'
গ্রুপটি হবিগঞ্জে তাদের আকিজ গ্লাস কারখানায় আরও ১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে, যার মধ্যে ৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম রয়েছে। আল আমিন বলেন, 'ব্যাটারি সিস্টেমযুক্ত কারখানাগুলোতে লোডশেডিংয়ের সময়ও প্রায় শতভাগ উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব।'
আকিজবশির গ্রুপের পার্টিকেল বোর্ড, সিরামিক, গ্লাসসহ বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে প্রায় ৯০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা রয়েছে। তারা আরও ৫০ মেগাওয়াট যুক্ত করার কাজ করছে এবং আগামী দুই বছরে আরও ৭৫ মেগাওয়াট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রুপের কারখানাগুলোর মোট ১,২৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ এই সৌর উৎস থেকে আসছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকটের এই সময়ে কারখানার চাকা সচল রাখার এই ক্ষমতা দিন দিন আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে।
১৮টি শিল্প পার্কে ডজন খানেক কারখানা পরিচালনা করা এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ তাদের ২০টি কারখানায় প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার সিস্টেম স্থাপন করেছে। তাদের মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮০ মেগাওয়াট।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, 'গত কয়েক সপ্তাহে লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। কিন্তু যেসব কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ রয়েছে, সেখানে আমরা স্বস্তিতে ছিলাম।' গ্রুপটি বর্তমানে তাদের চাহিদার ১৫-১৬ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটাচ্ছে এবং বছরের শেষ নাগাদ এটি ৫০ শতাংশে উন্নীত করার আশা রাখছে। কামাল বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে আমাদের শতভাগ চাহিদা পূরণ করা।'
জরুরি ব্যাকআপ থেকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে
কিছু প্রস্তুতকারকের কাছে এটি প্রথমে জ্বালানি সংকটের প্রতিক্রিয়া হিসেবে শুরু হলেও এখন তা সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।
রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান বলেন, 'গ্যাস সংকট মোকাবেলায় ২০১৯ সালে আমরা প্রায় বাধ্য হয়ে কারখানায় সোলার স্থাপন করেছিলাম। পরে খাঁটি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা অন্যান্য কারখানায় সোলার স্থাপন করি, কারণ সৌরবিদ্যুতের খরচ গ্রিড বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেক।'
গ্রুপটির বর্তমানে ছয়টি কারখানায় ১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার রয়েছে। সোলার থেকে তাদের দুটি পোশাক কারখানায় ৬০ শতাংশ এবং দুটি স্পিনিং মিলের প্রায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো হচ্ছে।
কারখানার মালিকদের জন্য এই হিসাবগুলো উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সংযোগের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে শিল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ১২ টাকা ৭৩ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৮৫ পয়সা পর্যন্ত, যা রাতের পিক আওয়ারে প্রায় ১৬ টাকায় পৌঁছায়। বিপরীতে, প্রকল্প ও প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে রুফটপ সোলারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়ে মাত্র ৪ থেকে ৮ টাকা।
তাছাড়া এই সিস্টেম স্থাপনের খরচও আগের চেয়ে অনেক কমেছে।
সুপার স্টার রিনিউয়েবল এনার্জির প্রধান নির্বাহী মিজানুর রহমান বলেন, 'পাঁচ বছর আগে এক মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপনে খরচ হতো প্রায় ৫ কোটি টাকা। এখন সেই খরচ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকায়।' তাঁর কোম্পানি প্রায় ৯০টি শিল্প কারখানায় ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার স্থাপন করেছে এবং আরও ১০টির বেশি প্রকল্পে কাজ করছে, যা থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট যুক্ত হবে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার ২০২১ সাল থেকে প্রায় ১০০টি শিল্প কারখানায় ১৩০-১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে এবং ১২টি কারখানায় আরও ২০ মেগাওয়াট স্থাপনের কাজ চালাচ্ছে। ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী মাসুদুর রহিম বলেন, জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার পর গত দুই বছরে সোলার স্থাপনের গতি অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, 'একটি সোলার প্ল্যান্টের জীবনকাল প্রায় ২০-২৫ বছর। একবার বিনিয়োগের পর রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া তেমন কোনো খরচ নেই।'
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে কারখানাগুলোর দৌড়
সোলারে বিনিয়োগের এই ধারা বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলোর মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আবুল খায়ের স্টিল, হা-মীম গ্রুপ, বিএসআরএম, ইয়াংওয়ান গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, প্যাসিফিক জিন্স, টিম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, রাইজিং গ্রুপ, উর্মি গ্রুপ, মাইক্রোফাইবার গ্রুপ, পালমাল গ্রুপ, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, কর্ণফুলী সুজ এবং মাসকো গ্রুপসহ অনেক কোম্পানি ইতিমধ্যে রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে অথবা তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
ডিবিএল গ্রুপ তাদের সাতটি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানায় ৫.৫ মেগাওয়াট সোলার স্থাপন করেছে এবং আরও ১০টি তৈরি পোশাক ও সিরামিক কারখানায় ১৬ মেগাওয়াট যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, 'আমাদের কারখানার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিদেশি ক্রেতাদের চাপ—এই দুই কারণে আমরা দ্রুত সোলারে বিনিয়োগ করছি।'
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ৬৪.৮৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে, যা তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ মেটায়। তারা আরও ৫০ মেগাওয়াট যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এমজিআই-এর পরিচালক তানভীর মোস্তফা বলেন, 'নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আমরা কেবল কারখানার ছাদেই নয়, ভবনের সম্মুখভাগ, সীমানা প্রাচীর ও রোড ডিভাইডারেও সোলার প্যানেল বসানোর সৃজনশীল উপায় খুঁজছি।'
তবে শিল্পমালিকদের কাছে এর তাত্ক্ষণিক আকর্ষণ পরিবেশগত সুবিধার চেয়ে গ্রিড না থাকার সময় কারখানা সচল রাখার ক্ষমতার মধ্যেই বেশি। রুফটপ সোলার দিয়ে হয়তো একটি বড় কারখানার সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনও কারখানার অনাকাঙ্ক্ষিত বন্ধ হওয়া রোধ করতে পারে এবং ব্যয়বহুল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা কমায়।
এগিয়ে এসেছে সরকারও
শিল্পমালিকদের উৎসাহিত করতে সরকারও নতুন প্রণোদনা যুক্ত করেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি গেজেট অনুযায়ী, 'নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০২৫'-এর আওতায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা অতিরিক্ত বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা প্রদান করবে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ ব্যাটারিচালিত রুফটপ সোলার সিস্টেমের সর্বোচ্চ উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিট ৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। এই উৎপাদন খরচের সাথে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১.২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে অতিরিক্ত বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
এই প্রণোদনা শিল্প গ্রাহকদের তাদের নিজস্ব চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় প্ল্যান্ট স্থাপনে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে যেসব কারখানা দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখোমুখি হচ্ছে, তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রণোদনা ইতিমধ্যে কারখানার ফ্লোরে দৃশ্যমান: গ্রিড যখন অন্ধকার হয়ে যায়, সোলার তখনো মেশিনের চাকা সচল রাখে।
