ইরান যুদ্ধের কারণে তীব্র খাদ্য সংকটের আশঙ্কা, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা পৌঁছাতে পারে ঐতিহাসিক পর্যায়ে: জাতিসংঘ
ইরান যুদ্ধ বিশ্বের অন্যান্য দুর্যোগগুলোকে আরও তীব্র রূপ দিচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ তীব্র ক্ষুধার দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর এটা হচ্ছে এমন এক সংকটময় সময়ে, যখন দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার বৈশ্বিক তহবিল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) উপ-প্রধান।
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার কারণেই সাড়ে ৪ কোটি মানুষ নতুন করে এই সংকটের মুখে পড়েছে।
বিশ্বজুড়ে যখন খাদ্যের এই বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই গত বছর সংস্থাটির বৈশ্বিক তহবিল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। ডব্লিউএফপির সবচেয়ে বড় দাতা দেশ যুক্তরাষ্ট্র একাই তাদের আর্থিক সহায়তার পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস করেছে।
কার্ল স্কাউ, যিনি আগামী সোমবার থেকে ডব্লিউএফপির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন (বর্তমান নির্বাহী পরিচালক সিন্ডি ম্যাককেইন শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করছেন), তিনি বলেন, চাহিদা এবং তহবিলের মধ্যে তৈরি হওয়া এই বিশাল ব্যবধানের কারণে সংস্থাটি বাধ্য হয়ে জরুরি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিগুলো কাটছাঁট করছে। চরম দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হওয়া মানুষদের বাঁচিয়ে রাখতেই মূলত এই কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'কে কার্ল স্কাউ বলেন, "আমরা ক্ষুধার্তদের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে মুমূর্ষু বা অনাহারী মানুষদের মুখে তুলে দিচ্ছি। এটাই এখনকার নির্মম বাস্তবতা। এই সংকটের বড় অংশটিই তৈরি হয়েছে যুদ্ধবিগ্রহের কারণে। গত বছর আমাদের দুটি দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে হয়েছিল। গত কয়েক দশকের মধ্যে এমন ঘটনা আর ঘটেনি, তাই ক্ষুধার এই মাত্রা ঐতিহাসিকভাবে ভয়াবহ।"
২০২৫ সালে ঘোষিত এই দুটি দুর্ভিক্ষ ছিল মূলত গাজা ও সুদানে। গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজার পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও—সুদান এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে, দেশটির দারফুর এবং দক্ষিণ কর্দোফানের কিছু অংশে এখনও চরম দুর্ভিক্ষ বিরাজ করছে।
স্কাউ বলেন, "তহবিলের দিক থেকে, আমাদের বার্ষিক অনুদান গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।" তিনি উল্লেখ করেন, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ডব্লিউএফপির কর্মী ও সেবামূলক কার্যক্রমের ওপর, বিশেষ করে আফগানিস্তান ও ইয়েমেনে, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন সমস্ত জরুরি খাদ্য সহায়তা তহবিল বন্ধ করে দিয়েছে।
"আমাদের বাধ্য হয়ে ৫,০০০ কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। আফগানিস্তানে যেখানে আমরা ১ কোটি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতাম, সেখানে এখন মাত্র ২০ লাখ মানুষকে দিতে পারছি। গত বছর এটি ছিল আমাদের জন্য এক বিশাল ধাক্কা," –যোগ করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় আঘাত
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখোমুখি ছিল। কিন্তু যুদ্ধের জেরে তেহরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমূজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর পাল্টা নৌ-অবরোধ আরোপ করে, যা সংকটকে আরও উস্কে দেয়।
ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে ডব্লিউএফপি প্রাক্কলন করেছিল, তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের উপরে অবস্থান করে, তবে আরও সাড়ে ৪ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসলেও, মার্চ ও মে মাসের বেশ কয়েক সপ্তাহ তা ১০০ ডলারের অনেক উপরে ছিল। বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী গড়ের চেয়ে এখনও ৩০ শতাংশ বেশি এবং এটি যেকোনো সময় আবারও বাড়তে পারে।
এই যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনা –- বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতি এবং দুর্ভিক্ষে মানুষের মৃত্যু ঠেকানোর ক্ষেত্রে ডব্লিউএফপির সক্ষমতার ওপর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর সবচেয়ে বড় এবং সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ খাদ্যদ্রব্যের দামের ওপর, যার প্রধান কারণ বৈশ্বিক পরিবহন খরচ বৃদ্ধি।
স্কাউ বলেন, "খাদ্য এবং জ্বালানির দাম একে অপরের সাথে এতটাই নিবিড়ভাবে জড়িত যে, কিছু কিছু জায়গায় জ্বালানির দাম ৩০ শতাংশ বাড়লে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও প্রায় সেই স্তরে পৌঁছে যায়। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষজন ইতিমধ্যে তাদের আয়ের সবটুকু অর্থ খাবারের পেছনেই ব্যয় করছেন। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার অর্থ হলো তারা এখন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছেন।"
জ্বালানি তেলের দামের এই উল্লম্ফন সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ডব্লিউএফপির খাদ্য সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করছে। সংস্থাটির পরিচালন ব্যয়ের এক বড় অংশ এখন পরিবহনের পেছনে চলে যাচ্ছে এবং বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ত্রাণ রুট পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সাথে সীমান্ত উত্তেজনার কারণে পাকিস্তান তাদের সীমান্ত পারাপার বন্ধ করে দেয়, যা খাদ্য সহায়তার নিয়মিত পথকে অবরুদ্ধ করে। এরপর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সংঘাতের কারণে আফগানিস্তানের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সীমান্ত—যা ইরানের সাথে সংযুক্ত—তাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ডব্লিউএফপিকে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল স্থলপথের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
কার্ল স্কাউ জানান, আফগানিস্তানের জন্য পাঠানো ৮৫,০০০ টন খাদ্য সহায়তা মাসের পর মাস পাকিস্তান সীমান্তে আটকে ছিল। এরপর তা ঘুরিয়ে দুবাইতে পাঠানো হয়, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর ইরান যুদ্ধ শুরু হলে তা আবারও আটকে যায়। পরবর্তীতে ডব্লিউএফপি সেই ত্রাণ তুরস্ক, কাস্পিয়ান সাগর এবং তুর্কমেনিস্তান হয়ে পাঠায়। দীর্ঘ সাত মাস বিলম্বে গত সপ্তাহে অবশেষে সেই খাদ্য সহায়তা গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা ছিল।
হ্রাস পাচ্ছে বৈশ্বিক অনুদান
তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এর ফলে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া তীব্র মূল্যস্ফীতি দাতা দেশগুলোর ডব্লিউএফপিকে তহবিল দেওয়ার মানসিকতাকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। বৈশ্বিক দাতা সংস্থাগুলোর মোট অনুদান ২০২৪ সালের ৯.৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৫ সালে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এই সময়ের মধ্যে মার্কিন অর্থায়ন ৪.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২.১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং যুক্তরাজ্যের অনুদান ৬১০ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৪৩৫ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চলতি বছরে ডব্লিউএফপির আনুমানিক তহবিল চাহিদা ১৩ বিলিয়ন ডলার হলেও—এপর্যন্ত মাত্র ২.৮ বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে।
এসব ঘটনা বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতির ওপর ইরান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাব। তবে এই যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যেই ব্যাহত হচ্ছে সমুদ্রপথে সার পরিবহন, যা অতি-জরুরি এই কৃষি উপকরণের সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করে আগামী বছরের জন্য আরও মারাত্মক কৃষি সংকট তৈরি করছে।
কার্ল স্কাউ বলেন, "পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোর প্রয়োজনীয় সমস্ত সার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং অন্য কোনো অঞ্চল থেকে তা কেনার মতো সামর্থ্য বা সম্পদ তাদের নেই। এর অর্থ হলো, এই পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে তবে তারা কোনো সারই পাবে না। অথচ পূর্ব আফ্রিকায় এখন বীজ বপনের মৌসুম শুরু হচ্ছে, যার ফলে আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে সেখানকার কৃষি উৎপাদনে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব আমরা দেখতে পাব।"
ইরান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবের বাইরেও স্কাউ আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের চরম অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করেন, যা ডব্লিউএফপির মতো মানবিক সংস্থার সহায়তাকর্মীদের কাজকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। গত তিন বছরে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে ১,০০০-এরও বেশি সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন।
ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ডব্লিউএফপির ৩৮ জন কর্মীকে এখনও বন্দি করে রেখেছে। গত বছর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাঁদের আটক করা হয়েছিল, যার ফলে সংস্থাটি হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে তাদের সমস্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
স্কাউ আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা সত্যিকার অর্থেই আইনের শাসনের প্রতি এই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জটি টের পাচ্ছি। বিভিন্ন চেকপয়েন্ট বা তল্লাশি চৌকিতে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এবং চলমান ড্রোন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সহকর্মীকে হারাচ্ছি এবং এর দায় কার ওপর বর্তায় তা সুনির্দিষ্ট করা অত্যন্ত কঠিন—আমরা ঠিক আঙুল দিয়ে দেখাতে পারি না কে এই কাজ করেছে—এবং নিশ্চিতভাবেই এখানে কোনো জবাবদিহিতা নেই। আমাদের কাজ করার পরিবেশ এর আগে কখনোই এতটা বিপজ্জনক ছিল না।"
