ইরানে টানা ১৪ দিন বোমা হামলার পরিকল্পনা ট্রাম্পের জেনারেলের
তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে ইরানের ওপর টানা দুই সপ্তাহ বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক শীর্ষ মার্কিন কমান্ডার।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এই পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে, তখন তেহরানের লড়াইয়ের সক্ষমতা নির্মূল করতে এই ১০ থেকে ১৪ দিনের হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে তেহরানের আকস্মিক হামলার পর ইরানে ফের হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। সেন্টকমের দাবি, মার্কিন বাহিনী ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সামরিক কমান্ড সেন্টারসহ কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ইরনা জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের বেশ কয়েকটি শহরের পাশাপাশি কেশম দ্বীপেও হামলা করা হয়েছে। হামলায় হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে তিনজন নিহত হয়েছেন।
বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি ইরানে কড়া আঘাত হানবেন এবং 'তাদের উচিত শিক্ষা দেবেন'। তার এই হুমকি উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়াই ইঙ্গিত দেয়।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানে এই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন অ্যাডমিরাল কুপার। ফ্লোরিডার টাম্পায় নিজের প্রধান কার্যালয় থেকে তিনি এই যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুত যে ফুরিয়ে আসছে, সেই সতর্কবার্তাকেও আমলে নেওয়া হচ্ছে না এই পরিকল্পনায়।
ওয়াশিংটনের ক্রমশ কমে আসা আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জয়েন্ট চিফস অভ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। এসব ইন্টারসেপ্টর সারা বিশ্বে প্রয়োজন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যে এগুলোকে জড়ো করা সম্ভব নয়।
একটি নতুন প্রতিবেদন অনুসারে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছে।
মার্কিন থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর তথ্যমতে, ২ হাজার ৩৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল আমেরিকা। কিন্তু গত কয়েক মাসে সেই মজুত কমে সংখ্যাটি মাত্র ৭৫৯-এ দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন বাহিনীর ক্রমশ ফুরিয়ে আসা ইন্টারসেপ্টর মজুতের চরম 'পরীক্ষা' নেওয়া হবে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতিকেও তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধে জয়লাভ একপ্রকার অসম্ভব। ইরানে নতুন করে বিমান হামলা শুরু হলে ওয়াশিংটন এই সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যাবে। এতে যে শুধু আমেরিকানদেরই বিপুল অর্থ ব্যয় হবে তা নয়, মার্কিন সেনাদের জীবনও আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে মার্কিন প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এই মুহূর্তে 'সংঘাত বাড়ানোর মেজাজে' রয়েছেন। তবে পাল্টা আঘাতের 'মাত্রা কতটা তীব্র হবে', তা নিয়ে এখনও ভাবছেন তিনি।
অ্যাডমিরাল কুপারের পরিকল্পনা হলো দ্রুতগতিতে যুদ্ধের তীব্রতার পারদ চড়ানো। এবার বড়সড় হামলার পথে হাঁটতে চাইছেন তিনি। কারণ অনেক চেষ্টা করেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের ওপর তেহরানের আক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
অ্যাডমিরাল কুপার বেশ কয়েকটি বিকল্প পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো সর্বাত্মক আঘাত। তার যুক্তি, এই কৌশল কাজে লাগালে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যাবে। কারণ তখন ইরানের আক্রমণ করার ক্ষমতা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাবে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকিও কমে আসবে।
এদিকে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, যুদ্ধ কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, তা নিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার মতবিরোধে 'হতাশ' ট্রাম্প। সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তার এক বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
ট্রাম্পের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, 'প্রেসিডেন্ট ভীষণ বিরক্ত। আমার মনে হয় না তিনি ভেবেছিলেন যে ইরানিদের চুক্তিতে রাজি করানো এতটা কঠিন হবে। যুদ্ধ কতদিন চলবে বা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ঠিক কী করা উচিত, তার কোনো বাস্তবসম্মত কৌশলই ছিল না।'
এদিকে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনার পর মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে দুজনের মধ্যে 'খোলামেলা' আলোচনা হয়েছে।
এর আগে মার্চ মাসে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ওই সময় তিনি অভিযোগ করেছিলেন, যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলি নেতার মূল্যায়ন মাত্রাতিরিক্ত আশাবাদী।
জুনে ইসরায়েলকে ভ্যান্স বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে একঘরে হয়ে পড়েছে ইসরায়েল, আর দুনিয়ায় একমাত্র আমেরিকাই এখন তাদের শেষ বন্ধু। শুধু 'মানুষ হত্যা করে' সব সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার পরের মাসেই তিনি বলেন, কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার যোগসূত্র ছিল।
মঙ্গলবারের বৈঠক সম্পর্কে একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, 'আলোচনা অত্যন্ত খোলামেলা ও স্পষ্ট ছিল'। অন্যদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ভ্যান্স ও নেতানিয়াহুর কথাবার্তা ছিল বেশ 'সোজাসাপটা'।
এদিকে সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তির জানান দিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার রাতে জর্ডানে চালানো আকস্মিক হামলা ও চলতি মাসের শুরুর দিকে তিন মার্কিন সেনার প্রাণ কেড়ে নেওয়া হামলা অন্যতম।
অন্যদিকে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে সৌদি আরব। ইরাকে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর এক হামলায় মার্কিন বাহিনীর অংশ নিয়েছে তারা। এ হামলায় ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) প্রায় ২০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। ইরানি সংবাদমাধ্যম 'হামশাহরি' বলেছে, পিএমএফের ওপর ওই হামলায় আইআরজিসি চারজন সামরিক উপদেষ্টা প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরান অবশ্য সৌদির তেল অবকাঠামোতে পিএমএফের হামলার নেপথ্যে থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
