মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক মেজর জিয়াকে দণ্ডমুক্ত করতে সাবেক সহকর্মীদের আইনি ও প্রশাসনিক তৎপরতা
দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন সেনাবাহিনীর বহিষ্কৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক (মেজর জিয়া)। তিনটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে দণ্ড ও মামলা থেকে মুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এখন আইনি ও প্রশাসনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন তার কয়েকজন সাবেক সহকর্মী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা ডজনখানেক মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এমনকি যে তিন মামলায় জিয়ার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, সেগুলোর সাজা স্থগিতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
পাশাপাশি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানির জন্য আসামির পক্ষে আইনি লড়াই লড়তে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একজন আইনজীবীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কল্যাণ সমিতি 'রাওয়া'-র কয়েকজন নেতা। তারা চাইছেন, সাজা বাতিল ও মামলা প্রত্যাহার করে জিয়াউল হককে সেনাবাহিনীতে সপদে পুনর্বহাল করা হোক।
এ বিষয়ে রাওয়ার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশীদ আলম শনিবার (০১ আগস্ট) বিকেলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'হাইকোর্টে দণ্ডিত তিন মামলায় জিয়ার ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য ডিফেন্স আইনজীবী পরিবর্তন করে নতুন একজন আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর জেনারেলকে একটি আবেদন দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ বিষয়ে সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও জানান, আইনমন্ত্রী এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। বিশেষ করে হাইকোর্টে চলমান মামলাগুলো দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রীর ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশীদ আলমের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জিয়াকে মামলার আসামি করা এবং দণ্ড দেওয়ার বিষয়গুলো ছিল 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত'।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হন মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক। সে সময় পুলিশের তালিকায় তিনি ছিলেন একজন 'মোস্ট ওয়ান্টেড' জঙ্গি। তাকে কখনো আনসার উল্লাহ বাংলা টিম, কখনো আইএস বা আল-কায়েদার সদস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে তাকে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় জিয়াকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
এছাড়া, লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া এবং আকরাম হোসেন ওরফে আবির ওরফে আদনানের তথ্য পেতে ২০২১ সালে ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের এক টুইট বার্তায় এই পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
সুদীর্ঘ ১৪ বছর পর 'মোস্ট ওয়ান্টেড' হিসেবে পরিচিত এই মেজর জিয়ার হদিস মিলেছে। গত বছরের শুরুর দিকে মামলা ও জঙ্গির তালিকা থেকে নাম কাটাতে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন তিনি। সৈয়দ জিয়াউল হকের দাবি, তিনি ফ্যাসিবাদ ও ভারতবিরোধী অবস্থানে অনড় থাকায় শেখ হাসিনা সরকার তাকে কেন্দ্র করে একের পর এক 'জঙ্গি নাটক' সাজিয়েছে।
ব্লগার দীপন, অভিজিৎ ও জুলহাস হত্যাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি তিনি। এর মধ্যে তিনটিতে তার মাথায় ঝুলছে ফাঁসির দণ্ড। তবে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে মেজর জিয়া কোথায় আছেন; জীবিত না মৃত—সেই প্রশ্নের সুরাহা কেউ দিতে পারেনি।
২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ে নিজের মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন জিয়াউল হক। এছাড়াও, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও আবেদন করে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকা থেকে তার নাম প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান তিনি। সেখানে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার উৎখাতে 'ধর্মান্ধ' কিছু সেনা কর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাৎ করার খবর দেয়। তখন এই অভ্যুত্থানচেষ্টাকারীদের নেতা হিসেবে মেজর জিয়ার নাম সামনে আসে। এরপর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডের পর ধারাবাহিকভাবে লেখক, ব্লগার ও সমকামী অধিকারকর্মীদের ওপর হামলা শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি ছিল, এসব হামলার পেছনে রয়েছে আল-কায়েদা সমর্থিত নিষিদ্ধ সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (পরবর্তীতে আনসার আল ইসলাম), যার নেতৃত্বে ছিলেন বরখাস্ত মেজর জিয়া।
২০১৬ সালে গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পর পুলিশ সদর দপ্তর জিয়াকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন এবং এলজিবিটি অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয় হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে। পলাতক থাকায় এসব মামলায় সরাসরি আপিল করার সুযোগ না থাকলেও তার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মামলা লড়তে পারবেন।
জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে বর্তমানে অন্তত ৯টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি মামলা এখনো বিচারিক এবং একটি তদন্ত পর্যায়ে। লেখক নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যা, ব্লগার নীলাদ্রি নিলয় হত্যা, প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলকে হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলা এবং বাড্ডা ও ভাটারা থানায় গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত মামলায় তার বিচার চলছে। এছাড়া কোতোয়ালি থানায় হেফাজত থেকে পালানোর অভিযোগে একটি মামলা তদন্তাধীন।
জিয়ার পক্ষে কাজ করা সাবেক সহকর্মীদের দাবি, ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে 'মতপ্রকাশের কারণে' তিনি নজরদারিতে পড়েন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে একটি 'কথিত সামরিক অভ্যুত্থান' মামলায় তাকে জড়ানো হলে তিনি আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। রাওয়া সদস্যদের মতে, জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রতিটি মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় অনেক অসংগতি ছিল।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল খুরশীদ বলেন, প্রাথমিকভাবে তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এরপর চলতি বছরের মে মাসে রাওয়ার চেয়ারম্যান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইনমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে জিয়ার আইনি নথিপত্র জমা দেন। আইনমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক হিসেবে বিবেচিত বাকি ৯টি মামলা 'সেন্ট্রাল রিভিউ কমিটি'র মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হবে।
