মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি: ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে ফেরা ও তার পরের জীবন
রংপুরের গঙ্গাচড়ার দরিদ্র গৃহবধূ মাজেদা বেগমকে এক অকল্পনীয় দুঃস্বপ্নে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে রুম্মান নামে এক শিশুকে হত্যার অভিযোগে কোনো প্রমাণ ছাড়াই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পরই শুরু হয় নির্মম নির্যাতন; এমনকি তাকে ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হয়। নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি মিথ্যা জবানবন্দিতে সই করানো হয়। তাতে বলা হয়, মাজেদাই শিশুটিকে গলা টিপে হত্যা করেছেন!
২০১৫ সালে আদালত তার মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। মৃত্যুপরোয়ানা মাথায় নিয়ে মাজেদা প্রবেশ করেন কনডেমড সেলে। সেই নির্জন ও জানালাবিহীন কক্ষেই কাটে তার পরের ছয়টি বছর। কারাগারের ভেতরেই তিনি বড় করতে থাকেন তার শিশুসন্তান মারুফকে। চারদেয়ালে বন্দি থেকেই মারুফ শিখতে থাকে কথা বলা ও হাঁটাচলা। সেই সময়ে প্রতিটি দিন আর রাত মাজেদার কাটে ভয়ানক আতঙ্কে।
শেষ পর্যন্ত আদালত বুঝতে পারে, তার স্বীকারোক্তি ছিল পুলিশি নির্যাতন ও হুমকির ফল। মাজেদাকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তত দিনে তিনি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। মারুফের শৈশব হারিয়ে গেছে কনডেমড সেলে, আর মাজেদার জীবন ভরে গেছে দুঃসহ সব স্মৃতিতে।
মাজেদার মতোই কনডেমড সেলে জীবনের সব রং হারিয়ে ফেলা আরেকজন মানুষ শেখ জাহিদ। তিনি প্রথম যেদিন কারাগারে যান, সেদিন তার একটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি তোলা হয়েছিল। বিচারে তারও মৃত্যুদণ্ড হয়। দীর্ঘ ২০টি বছর তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। প্রায় দুই যুগ পর যখন মুক্তির দেখা পান, তখন সেই ছবিতে তার চেহারা আর চেনা যায় না। সময়ের নিয়মে ফিকে হয়ে গেছে ছবির অবয়ব, ঠিক তার জীবনের মতোই।
এই দীর্ঘ সময়ে জাহিদ হারিয়েছেন প্রায় সবকিছু। তিনি যখন ফাঁসির দণ্ড নিয়ে কারাগারে বন্দি, তখন তার বাবা-মা মারা যান। জাহিদ বলেন, 'প্রতিবার কাউরে ফাঁসির জন্য নিতে দেখতাম; মনে হইতো, এইটাই আমার শেষ রাত। ওই ভয়টা কোনোদিন যায় নাই।' মুক্তি পেলেও ভয়টা তাকে তাড়া করে ফেরে। 'রাতে শুইলে মনে হয় মাথার উপরে দড়ি ঝুলতেছে। এত বাস্তব লাগে যে চোখ বন্ধ করতে পারি না।'
শুধু এই দুজন নন; ১৩ জন নিরপরাধ বন্দি ও ১৩টি পরিবার—সবার গল্পই প্রায় এক। বছরের পর বছর কালকুঠুরিতে তারা মৃত্যুর প্রহর গুনেছেন। শেষে একদিন নির্দোষ হিসেবে মুক্তি মিলেছে, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পেরেছেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের আসামি হয়ে যে জীবন তারা হারিয়েছেন, তা কি আর ফিরে পেয়েছেন? 'না মরে বেঁচে থাকার' এই গল্পই ক্যামেরার লেন্সে খুঁজে বেরিয়েছেন আলোকচিত্রী মোশফিকুর রহমান জোহান। সেখান থেকে বাছাই করা কিছু ছবি নিয়ে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী কক্ষে চলছে তার একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী 'মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা'।
ক্যামেরা যখন প্রতিবাদের ভাষা
নৃতত্ত্বে পড়াশোনা করেছেন জোহান। এই শিক্ষার কারণেই মানুষের ভেতরের গল্প, তাদের মনস্তত্ত্ব আর সমাজকে খুব কাছ থেকে দেখার চোখ তৈরি হয়েছে তার। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, বিচারব্যবস্থার ত্রুটি এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মানবাধিকার রক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়েই তার কাজ।
এর আগে দীর্ঘদিন গুম হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করেছেন জোহান। সে সময়েই তিনি এমন সব মানুষের কথা জানতে পারেন, যারা বিনা অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পেয়ে বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। জোহান বলেন, 'আমি ২০২১ সালে প্রথম আয়নাঘর সম্পর্কে জানতে পারি। আমার তখন মনে হয় যে আয়নাঘরের সঙ্গে কনডেমড সেলের আসলে মিল আছে। আয়নাঘরের মতোই কনডেমড সেলে যারা থাকে, তারাও আসলে চরম ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়। তখনই আমি এমন মানুষদের খুঁজতে শুরু করি, যারা কনডেমড সেল থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন।'
২০২২ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ চার বছর এই 'হতভাগ্য' মানুষদের খুঁজে বেরিয়েছেন জোহান। প্রত্যেকের সঙ্গে মিশেছেন, চেষ্টা করেছেন তাদের মনোজগৎ বুঝতে। এই আলোকচিত্রী বলেন, 'চার বছরে আমি ৫৬ জন মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি, তাদের গল্প শুনেছি। নির্দোষ হয়েও কী ভয়াবহ জীবন তারা কাটিয়েছেন, কীভাবে তাদের জীবন থেকে সব হারিয়ে গেছে, কীভাবে তাদের পরিবার সমাজচ্যুত হয়েছে—এসব অভিজ্ঞতা শুনে ও বুঝে আমি ছবি তুলতে শুরু করি।'
জোহানের কাজের মূল লক্ষ্য সমাজের সেই অন্ধকার দিকগুলো আলোর সামনে নিয়ে আসা। তিনি মনে করেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষের ক্ষেত্রে রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের 'সামাজিক মৃত্যু' ঘটে। তারা ও তাদের পরিবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর পর তারা যখন ফিরে আসেন, দেখেন আগের মতো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
'মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা' জোহানের পঞ্চম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। যারা নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত সাজা পেয়েছিলেন এবং দীর্ঘ ক্ষয়িষ্ণু আইনি লড়াই শেষে উচ্চ আদালতে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছেন—এমন ১৩ জন মানুষের জীবনের গল্প বলছে এই প্রদর্শনী।
'কনডেমড সেলে প্রতিদিন মৃত্যু'
এই প্রজেক্টের কাজ করতে গিয়ে জোহান যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের প্রায় সকলেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছেন। জোহান ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। ভুক্তভোগীদের জীবনের গল্প শুনে তার সেই অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে।
জোহান বলেন, 'মানুষ আসলে বাঁচতে চায়। যখন তারা দেখেছে যে রাতে কারাগারে তার এক বন্ধুর ফাঁসি হয়ে গেছে, তখন তারা ভেবেছে কাল হয়তো তাদের পালা। প্রত্যেক সেলের কয়েদিরা দেখতেন ফাঁসির আসামিকে গোসল করানো হচ্ছে, তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা কি চোখে দেখে সহ্য করা যায়? ফাঁসির আসামিদের প্রতিদিন অসংখ্যবার মৃত্যু হয়।'
বিনা অপরাধে প্রায় ৯ বছর কারাগারে ছিলেন আলমগীর হোসেন। ফাঁসির আসামি হিসেবে থাকাকালীন তার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত নির্মম। আলমগীর হোসেন বলেন, 'আমি যখন কারাগারে ছিলাম, তখন বগুড়ার আব্দুর শুক্কুর ভাইকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। রাত ১০টা ১ মিনিটের দিকে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। যখন তাকে ফাঁসির জন্য গোসল করানো হচ্ছিল, তিনি একদম স্তব্ধ ছিলেন। আমি জানালা দিয়ে সব দেখেছি। তাকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, রাস্তার মাঝখানে তিনি বসে পড়েছিলেন। সেই সময় আমি আকাশ থেকে একধরনের 'গুম গুম' শব্দ শুনেছিলাম। চারপাশের পাখিগুলো এত ডাকছিল যে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল। সবাই 'আল্লাহ আল্লাহ' বলে চিৎকার করছিল। দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসে, ভুলতে পারি না।'
২০১৪ সালে একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ফেঁসে গিয়ে লক্ষ্মীপুর কারাগারে বন্দি হয়েছিলেন আব্দুর রহিম। ২০১৭ সালে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। দীর্ঘ সাত বছর তাকে কনডেমড সেলের চরম একাকিত্ব ও অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়। স্বজনহীন সেই দিনগুলোতে একদিকে ছিল পরিবারের জন্য তীব্র উদ্বেগ, অন্যদিকে প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে ফিরত ফাঁসির মৃত্যুভয়। দীর্ঘ আট বছর পর মুক্তি পেলেও সেই ট্রমা ও আতঙ্ক তাকে ছেড়ে যায়নি।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আব্দুর রহিম বলেন, 'রাতদিন ২৪ ঘণ্টা ভয় লাগত, কখন যেন ফাঁসি দিয়ে দেয়! মাঝে মাঝে মনে হতো হয়তো আজকেই ফাঁসি হবে। আবার কখনো স্বপ্নে দেখতাম বাড়ি ফিরে গেছি। তখন ভাবতাম, আমার ছেলেরা কী খায়? অসুস্থ মা কোথায় আছে? এসব চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘুরত।'
কারাগার বা কনডেমড সেল থেকে আইনি মুক্তি মিললেও আব্দুর রহিম বা আলমগীর হোসেনদের আসল লড়াই শুরু হয় বাইরে আসার পর। সমাজ তাদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না বলে পদে পদে তারা অবহেলা ও একাকিত্বের শিকার হন। এমনকি ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবন নতুন করে গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্র থেকেও কোনো আর্থিক বা সামাজিক সহায়তা মেলে না।
বেঁচে ফেরার পর
২০০৫ সালে মিথ্যা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আনোয়ার হোসেন প্রায় ১৮ বছর কারাগারে কাটান। রিমান্ডে নির্যাতন ও কনডেমড সেলের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাকে সইতে হয়েছে। 'হত্যা মামলার আসামি' হিসেবে পরিচিত হওয়ায় একপর্যায়ে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। মুক্তির পরও সামাজিক কলঙ্ক তাকে তাড়া করছে। তিনি বলেন, 'মিডিয়ায় প্রচার হলে আমার পরিবারের লোকজন জানতে পারে আমি জেলে আছি। তারা দেখা করতে আসত। কিন্তু যখন সবাই জানল আমি মার্ডার কেসের আসামি, তখন সমাজ মেলামেশা কমিয়ে দিল। পরিবার জমিজমা বিক্রি করে অন্য জায়গায় চলে গেছে, আমার সাথে আর দেখাও করেনি।'
মুক্তির পর আনোয়ারের আইনজীবী তাকে যাত্রাবাড়ীর একটি কাপড়ের দোকানে কাজের ব্যবস্থা করে দেন। তবে সমাজের নজর থেকে এখনো তার মুক্তি মেলেনি। 'মানুষ পিছে নানান কথা বলে, ফিসফাস করে, যেন আমি অপরাধী। এই একাকীত্ব ধইরা খাইতেছে ভিতর থেইকা।'
আনোয়ারের মতো যারা বছরের পর বছর জেল খেটে নির্দোষ প্রমাণিত হন, রাষ্ট্র তাদের কোনো দায়ভার নেয় না—এই অমানবিক সত্যই উঠে এসেছে প্রদর্শনীতে। জোহান জানালেন, ভুক্তভোগীদের হারানো সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছাই ছিল তার চার বছরের সংগ্রামের প্রধান অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, 'আমার এই কাজের একমাত্র কারণ তাদেরকে ডিগনিফাইড (সম্মানিত) করা। ছবিতে আমি তাদের অন্য কোনোভাবে দেখানোর চেষ্টা করিনি। কারণ তাদের সম্মান, ক্ষতিপূরণ ও স্বীকৃতি দরকার।'
জোহান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, 'শেখ জাহিদ ২০ বছর ফাঁসির দণ্ড ভোগ করেছেন। নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর আদালত তাকে বলেছে তারা 'দুঃখিত'। আদালত দুঃখিত বললে কী লাভ? তিনি কি ক্ষতিপূরণ বা স্বীকৃতি পেয়েছেন? তার তো পুরো জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে।'
ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস পাওয়া আউয়াল হোসেনের কাছে এটি ছিল নতুন জীবন পাওয়ার মতো। কিন্তু দীর্ঘ মামলার বোঝা তার সব কেড়ে নিয়েছে—জমিজমা, ঘরবাড়ি ও আর্থিক নিরাপত্তা। মুক্তি পেলেও হারানো সময় ও প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
রাষ্ট্র যাতে এই মানুষদের সম্মান ফিরিয়ে দেয় এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে, সে জন্য কাজ করে যাবেন বলে জানান জোহান। তার মতে, 'শেখ জাহিদ এখনো মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠে দেখেন দড়ি ঝুলছে, তার গলার ভেতরে এসে ফাঁস লাগে। আনোয়ার হোসেন এখনো ট্রমার মধ্যে আছেন। ১৫-১৬ বছর টানা ট্রমার মধ্যে থাকলে তা থেকে বের হওয়া কঠিন। প্রায় সবারই মানসিক অবস্থা করুণ। তাই রাষ্ট্রের উচিত তাদের দায়িত্ব নেওয়া।'
'মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা' প্রদর্শনীর প্রতিটি ছবি যেন একেকটি জীবন্ত দলিল। আলোকচিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে লুকিয়ে আছে মানবিক অসহায়ত্বের গল্প। ছোট্ট একটি চারকোনা কক্ষে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়ার সেই দমবন্ধ অনুভূতি নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে ছবির কম্পোজিশনে। সেখানে আছে খাঁচাবন্দি জীবনের হাহাকার ও চরম হতাশা, আছে দমবন্ধ অনুভূতি, যা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে স্পর্শ করবে।
আয়োজকেরা জানান, শুরু থেকেই প্রদর্শনীর প্রতি দর্শনার্থীদের ব্যাপক সাড়া মিলছে। ভিজিটর বইয়ের পাতায় এক দর্শনার্থী লিখেছেন: 'কৌতূহল থেকে ঢুকেছিলাম, এখন চোখে পানি নিয়ে বের হচ্ছি। সত্যি অসাধারণ একটি কাজ হয়েছে।'