জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর খসড়া: কেন এখনও তদন্তক্ষমতা থেকে বঞ্চিত কমিশন ?
সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় 'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) বিল, ২০২৬'-এর খসড়া প্রকাশ করেছে এবং এ বিষয়ে জনমত আহ্বান করেছে। খসড়া বিলটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনকে না দেওয়া। এর ফলে গত এক দশক ধরে কমিশনের যে প্রাতিষ্ঠানিক 'ক্ষমতাহীনতা' বিদ্যমান, তা বহাল থাকবে। অথচ এই তদন্তক্ষমতাই কমিশনের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান দাবি। সরকারের উচিত প্রস্তাবিত ২০ ধারায় কমিশনকে পূর্ণাঙ্গ তদন্তক্ষমতা প্রদান করা। অন্যথায় কমিশন আগের মতোই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ার অজুহাত হিসেবে তদন্তক্ষমতার অভাবের কথা বলতে থাকবে। ২০০৯ সালের বিদ্যমান আইনের তুলনায় নতুন খসড়া বিলে ৪২টি ধারা রয়েছে এবং কমিশনকে কিছু অতিরিক্ত দণ্ডমূলক ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষমতা কমিশনের মূল ম্যান্ডেটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর স্বাধীনতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞ ও অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করে বিলটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত: এখতিয়ারের সীমা অতিক্রম
খসড়া বিলের ১৩ ধারায় কমিশনকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অথচ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মূল কাজ হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সরকারি সংস্থার মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় নির্ধারণ করা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কাজ, যেখানে অভিযোগ প্রমাণের জন্য 'সন্দেহাতীতভাবে' প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়। অন্যদিকে মানবাধিকার কমিশনের কাজ হলো 'সম্ভাবনার ভারসাম্যের' ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা সরকারি সংস্থার দায় নির্ধারণ করা। এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি কাঠামো। তাই ১৩ ধারায় 'ব্যক্তি' বা 'অভিযুক্ত' শব্দের পরিবর্তে 'সরকার' এবং 'সরকারি সংস্থা' শব্দগুলো ব্যবহার করা উচিত। অন্যথায় কমিশন তার নিজস্ব প্রতিকারমূলক কাঠামো ব্যবহার করে কোনো সুপারিশ কার্যকর করতে বাস্তবসম্মত সমস্যার সম্মুখীন হবে।
কমিশনকে আদালতে পরিণত করার ঝুঁকি
১৩(১)(খ) ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন প্রথমে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে এবং পরে পক্ষগুলোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শুনানি পরিচালনা করবে। এটি কয়েকটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রথমত, মানবাধিকার সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক। কারণ এতে ভুক্তভোগীকে আইনজীবী নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক শুনানিতে অংশ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ভুক্তভোগী অর্থনৈতিক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অভিযোগ করতেই নিরুৎসাহিত হবেন। প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী, মানবাধিকার কমিশনের কাজ আদালতের মতো বিচার পরিচালনা করা নয়। কমিশনের কাজ হলো প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের দায় নির্ধারণ করা এবং এরপর সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে একটি অ-প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক (Non-adversarial) প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। খসড়া বিলটি সেই প্রতিষ্ঠিত মডেল থেকে সরে গিয়ে কমিশনকে আদালতসদৃশ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
রাষ্ট্র ও ব্যক্তির দায় এক করে ফেলার সমস্যা
খসড়া বিলের ১৩ ধারা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতাকে একত্রে মিশিয়ে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মূলত রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাষ্ট্রকে তার কর্মচারী ও প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপের জন্য দায়ী করে। ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার করার জন্য ইতোমধ্যে ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইন বিদ্যমান। এই মৌলিক পার্থক্যকে উপেক্ষা করলে কমিশনের মূল লক্ষ্য—রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা—ব্যাহত হবে।
১৬ ধারা: তদন্ত নাকি ফৌজদারি বিচার?
১৬ ধারায় বলা হয়েছে, অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে শুনানি দিয়ে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। এ বিধান অপ্রয়োজনীয়। যেসব অভিযোগ কমিশনের এখতিয়ারের বাইরে, সেগুলো শুরুতেই খারিজ করা উচিত। অন্যথায় নিরীহ ভুক্তভোগীদের অযথা হয়রানির শিকার হতে হবে।
গ্রেপ্তার ক্ষমতা: মানবাধিকার কমিশন নাকি তদন্ত সংস্থা?
খসড়া বিলের ১৬(৫) ধারায় কমিশনকে ব্যক্তিগত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটি কমিশনের স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা থাকলে কমিশনকে চার্জশিট দিতে হবে, আদালতে হাজির হতে হবে এবং কার্যত সরকারি কৌঁসুলির ভূমিকা পালন করতে হবে। প্যারিস নীতিমালার অধীনে বিশ্বের কোনো জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান প্রসিকিউটর বা গ্রেপ্তারকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে না। এমন ক্ষমতা কমিশনের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করবে।
ক্ষতিপূরণ আদায়: অবাস্তব বিধান
১৭(৫)(খ) ধারায় কমিশনকে ফৌজদারি কার্যবিধির মাধ্যমে ব্যক্তিগত অভিযুক্তের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে কমিশন কার্যত ক্ষতিপূরণ আদায়কারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। অথচ ২০০৯ সালের আইনে কমিশন 'পাবলিক ল' আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সুপারিশ বাস্তবায়নের সুযোগ পেত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় সাধারণত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নির্ধারিত হয়, ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। ফলে এই বিধান মানবাধিকার আইন ও ফৌজদারি আইনকে এক করে ফেলেছে।
শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তক্ষমতা না থাকা: সবচেয়ে বড় দুর্বলতা
খসড়া বিলের সবচেয়ে গুরুতর ত্রুটি হলো শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনকে না দেওয়া। এই সীমাবদ্ধতা গত এক দশক ধরে কমিশনের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাই নতুন আইনের ২০ ধারায় কমিশনকে পূর্ণাঙ্গ তদন্তক্ষমতা প্রদান করা জরুরি। তা না হলে কমিশন স্বাধীনভাবে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না।
বিচারাধীন মামলার অজুহাতে অভিযোগ খারিজ
২৯ ধারায় বলা হয়েছে, 'কোনো কার্যক্রম বিচারাধীন থাকলে কমিশন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না।' বাস্তবে গত এক দশকে এই বিধানের অপব্যবহার করে কমিশন গুম, হেফাজতে নির্যাতন, 'ক্রসফায়ার' ও হেফাজতে মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগের ৯০ শতাংশেরও বেশি নিষ্পত্তি (নথিভুক্ত) করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের কোনো আদালতেই 'মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলা' বিচারাধীন থাকে না। তাই আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত: 'অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকাকে ভিত্তি করে কমিশন কোনো মানবাধিকার অভিযোগ খারিজ করতে পারবে না।'
ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে প্রস্তাবিত সুরক্ষা ব্যবস্থা
২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে কমিশন উচ্চ আদালতের তিনটি নির্দেশনা সত্ত্বেও নিজস্ব কার্যপ্রণালি বিধিমালা প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে সমস্যা কেবল আইনে নয়, কমিশনের ভেতরেও রয়েছে। এছাড়া কমিশন যেসব অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে দাবি করেছে, তার ৬০ শতাংশেরও বেশি পরবর্তীতে তাদের নথি থেকেই হারিয়ে গেছে। অথচ একই অভিযোগ নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান দেখিয়েই কমিশন সাফল্যের দাবি করেছে। কমিশনের জবাবদিহি বাড়াতে খসড়া বিলে নিম্নোক্ত বিধানগুলো যুক্ত করা উচিত:
(ক) কমিশনের সুপারিশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত না হলে কমিশন বাধ্যতামূলকভাবে হাইকোর্টে রিট আবেদন করবে। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাকেও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করতে হবে।
(খ) কমিশন প্রতি বছর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সঙ্গে বৈঠক করবে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি, ফলাফল ও সরকারি বাস্তবায়ন পরিস্থিতি প্রকাশ করবে।
(গ) কমিশন প্রতি বছর একটি পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির কাছে উপস্থাপন করবে। ব্যর্থ হলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
(ঘ) কমিশন প্রতিটি অভিযোগ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত তার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে। এতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের সরকারি দায়িত্ব লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করা হবে।
(ঙ) কমিশন ছয় মাসের মধ্যে তার বিধিমালা প্রণয়ন সম্পন্ন করবে। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাকেও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করতে হবে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
halim_md@yahoo.co.uk
