ইরান যুদ্ধ: আশঙ্কাজনক হারে কমছে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপ্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চরম আকার ধারণ করেছে ইরান যুদ্ধ। এরমধ্যেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের মজুত, বিশেষ করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক তথ্য ও একটি নতুন বিশ্লেষণী প্রতিবেদনের বরাতে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে এমনটাই জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ওয়াকিবহাল তিনটি সূত্র।
এই সংঘাত নিরসনে এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমঝোতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টরের এমন চরম ঘাটতি— অন্যান্য রণাঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (সিএসআইএস)-এর গবেষকরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, বর্তমানে মার্কিন ভাণ্ডারে ৮২৭টির কম প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর এবং ২৭৮টির কম থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের ভাণ্ডার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, সিএসআইএস-এর এই প্রাক্কলন সরকারের অভ্যন্তরীণ হিসাবের অনেকটাই কাছাকাছি।
ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগের মজুতের তুলনায় বর্তমান এই সংখ্যাটি এক বড় ধরনের ঘাটতিকে নির্দেশ করে। সিএসআইএস-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ২,২০০টি প্যাট্রিয়ট (সবচেয়ে আধুনিক দুটি সংস্করণের) এবং ৪৫২টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। প্রতিপক্ষের দিক থেকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মূল ভরসা এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো, যেখানে প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ব্যয় হয় কোটি কোটি ডলার।
সিএসআইএস-এর প্রতিবেদনের লেখকেরা জানিয়েছেন, "অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র জোটগুলোকে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আরও বেশি ঝুঁকি নিতে হতে পারে। কারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্যাট্রিয়ট এবং থাডের কার্যকর কোনো বিকল্প নেই। আর এ ধরনের হুমকি মোকাবিলা করার মতো 'স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল' সজ্জিত মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো সাধারণত ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে।"
গত সোমবার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও উন্নত ও আধুনিক অস্ত্রাগার পুনর্গঠনের অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। তবে একই সাথে তিনি দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অস্ত্রের ভাণ্ডার 'খুবই ভালো অবস্থায়' রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন গত সপ্তাহে সিনেটরদের সতর্ক করে বলেছেন, চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত বাজেট ও তহবিল না পেলে—পেন্টাগন প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করতে পারবে না।
এর আগে সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত শুক্রবার ট্রাম্পের সঙ্গে এক বৈঠকে জেনারেল কেইন অস্ত্রের দ্রুত হ্রাস পাওয়া মজুতের বিষয়টি তুলে ধরেন, যখন কমান্ডার-ইন-চিফ ট্রাম্প যুদ্ধকে আরও তীব্র করার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছিলেন।
জেনারেল কেইন ও অন্যান্য কর্মকর্তারা সংঘাত বাড়ানোর বিভিন্ন নেতিবাচক দিক নিয়ে ব্রিফ করার পর ট্রাম্প ইরানে হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেন। তবে সেই বিরতি ছিল ক্ষণস্থায়ী। মঙ্গলবার মার্কিন ও সৌদি বাহিনী যৌথভাবে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালায়। পরে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের একটি 'আকস্মিক হামলা' ব্যর্থ করে দিয়েছে।
প্রতিবেদনের মূল লেখক, সিএসআইএস-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও মার্কিন মেরিন কোরের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান চলতি মাসের শুরুর দিকে সিএনএনকে বলেন, ইরানের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই চলতে থাকলে [যুক্তরাষ্ট্রের] অস্ত্রের মজুত এমন বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যেতে পারে, যা চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে।
এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজেদের মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর বাঁচানোর তাগিদে মার্কিন কমান্ডারেরা এখন সেইসব ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যেগুলো মার্কিন ঘাঁটির জনমানবহীন বা অনাবাসিক এলাকায় আঘাত হানবে। এই কৌশলটি মধ্যপ্রাচ্যে আগের অনুসৃত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা; যেখানে ২০২৫ সালের জুনে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার সময়—অধিকাংশ মার্কিন সেনাকে সরিয়ে নেওয়ার পরও সেখানে থাকা প্যাট্রিয়ট ইউনিট দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পেন্টাগন তাদের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করেছে। এর অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের রকেট মোটর উৎপাদনের জন্য দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে এই উৎপাদন সম্প্রসারণের ফল ঠিক কবে নাগাদ পাওয়া যাবে, সে সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি পেন্টাগনের এক মুখপাত্র।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উচ্চমানের এসব উন্নত অস্ত্র উৎপাদনে দীর্ঘ সময় লাগে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের এই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
অবশ্য প্রকাশ্যে সেটা স্বীকার করতে রাজি নয় ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা দপ্তর। গত ২৮ জুলাই দেওয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল জানান, "মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেকোনো সময় ও স্থানে তা বাস্তবায়নের জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই তাদের রয়েছে। আমাদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর যে একটি শক্তিশালী অস্ত্রাগার রয়েছে—তা নিশ্চিত করেই আমরা বিভিন্ন কমব্যাট্যান্ট কমান্ড জুড়ে একাধিক সফল অভিযান পরিচালনা করেছি।" গত এপ্রিল মাসের পর থেকে সিএনএনকে পাঠানো একই ধরনের তিনটি বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি ছিল এটি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের এই ঘাটতির জন্য মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে দায়ী করেছেন। তবে মূলত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই এ সংকট আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সিএসআইএস-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের প্রধান প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টরের ৬০ শতাংশেরই বেশি ব্যবহার করে ফেলেছে।
অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা তহবিলের জন্য পেন্টাগনের অনুরোধের মধ্যে অস্ত্রাগার পুনর্গঠন সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত সপ্তাহে জরুরি অর্থায়নের আবেদনের ওপর সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কমিটির শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ যুক্তি দেন, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ও অন্যান্য সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো দ্রুততম সময়ে প্রতিস্থাপনের বদলে ধীরগতির আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করেছিল, যা সময়মতো চাহিদা মেটাতে পারেনি।
তবে উভয় দলের [ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান] আইনপ্রণেতারা মনে করেন, এই ঘাটতির পেছনে কোনো একক প্রশাসনের দায় নেই; বরং এটি সমাধানের জন্য দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা প্রয়োজন। শুনানিতে মেইন অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স বলেন, "অস্ত্রের এই ঘাটতির বিষয়টি বেশকিছু দিন ধরেই কমিটির জানা রয়েছে। যদিও এই সংকট বহু বছর ধরে তৈরি হয়েছে, তবে এখন এটি দিনে দিনে আরও বেশি জরুরি ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।"
