নিজেদের সক্ষমতা দেখাল ইরান; মিশরের বন্দরে মার্কিন গ্যাস ট্যাংকারে চালাল ড্রোন হামলা, দুই জাহাজে আগুন
বুধবার ইরানের ড্রোন হামলায় মিশরের ভূমধ্যসাগরীয় দামিয়েত্তা বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি গ্যাস সংরক্ষণকারী ট্যাংকারে আগুন ধরে গেছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা অ্যামব্রে এ তথ্য জানিয়েছে। এ ঘটনায় ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রথমে মিশরের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বন্দরে অগ্নিকাণ্ডের খবর নিশ্চিত করলেও ড্রোন হামলার বিষয়টি তারা এড়িয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে বন্দর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইঞ্চকেপ এক বার্তায় জানিয়েছিল, দামিয়েত্তা বন্দরে আগুন লেগেছে দুটি গ্যাস ট্যাংকারে।
তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। তবে পরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি ইরানি সূত্র নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছে, মিশরে মার্কিন মালিকানাধীন ওই গ্যাস ট্যাংকারে ড্রোন হামলা নেপথ্যে তেহরানই ছিল। চলমান যুদ্ধে মিশরতে এটিই প্রথম সরাসরি আঘাত। ইরানের সক্ষমতা দেখানোই এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল বলে জানায় তারা।
ওই দুই ইরানি জানিয়েছেন, ড্রোন হামলা থেকে ওই বিস্ফোরণ হয়েছে। এই হামলার পেছনে একটি বার্তা রয়েছে—ইরান যদি এই সংঘাতের তীব্রতা ও পরিসর আরও বাড়াতে চায়, তাহলে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহ আরও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করা সম্ভব।
তবে এই হামলা সরাসরি ইরান চালিয়েছে, নাকি ওই অঞ্চলে সক্রিয় তাদের সমর্থিত কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী চালিয়েছে, সে বিষয়ে সূত্র দুটি কিছু বলেননি। এমনকি কোথা থেকে এই হামলা চালানো হয়েছে, সেটিও তারা স্পষ্ট করেননি।
বুধবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই বিস্ফোরণের বিষয়ে তাকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ না দিলেও তিনি জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেন, এই হামলার পেছনে রয়েছে ইরান।
ঘটনা সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, ড্রোনটি সরাসরি 'এনার্গোস উইন্টার' নাম ভাসমান স্টোরেজ ট্যাংকারে আঘাত হানে। সঙ্গে সঙ্গে তাতে আগুন ধরে যায়। আর সেই আগুনের শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাশের জাহাজ 'গ্যাসলগ সালেম'-এ।
এই বিস্ফোরণ এমন সময়ে ঘটল, যখন মধ্যপ্রাচ্য চূড়ান্ত সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল, তা এখনো সমাধানের কোনো স্পষ্ট পথ দেখায়নি। উল্টো মার্কিন ঘাঁটি থাকা একাধিক আরব দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান। পাশাপাশি ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীরাও সম্প্রতি সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে।
এতদিন পর্যন্ত মিশর ইরানের ড্রোন হামলার আওতার বাইরেই ছিল।
ড্রোন হামলার শিকার 'এনার্গোস উইন্টার' ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা ভাসমান গ্যাস রূপান্তরকারী ইউনিট (এফএসআরইউ)। এর গ্যাস ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৫০ ঘনমিটার। জাহাজটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান এনার্গোস ইনফ্রাস্ট্রাকচার-এর মালিকানাধীন। পাশাপাশি এর কারিগরি, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে আরেক মার্কিন কোম্পানি উইলহেলমেন শিপ ম্যানেজমেন্ট।
ভূমধ্যসাগরে জাহাজের ওপর এই হামলা বিশ্ববাণিজ্যে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এখন মিশরের বন্দরগুলো ব্যবহার করার আগে জাহাজ কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা ঝুঁকি নতুন করে খাসিয়ে দেখতে হবে। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বহু জাহাজ কোম্পানি ইতিমধ্যেই লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর এড়িয়ে চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই রুট—পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে জাহাজে একের পর এক হামলা ওলটপালট করে দিয়েছে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল। তার ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে।
যুদ্ধের জেরে পারস্য উপসাগরের সংকীর্ণ প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত হয়ে উঠেছে চরম বিপজ্জনক। বাধ্য হয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব লোহিত সাগরকে রপ্তানির প্রধান পথ হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু সম্প্রতি হুথিরা লোহিত সাগরও অবরুদ্ধ করার হুমকি দিয়েছে।
এসব হামলা ও হুমকির জেরে শিপিং কোম্পানিগুলো এই জলসীমায় জাহাজ পাঠাতে পিছিয়ে যাচ্ছে। সামুদ্রিক উপাত্ত বিশ্লেষণকারী সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড-এর তথ্যমতে, ২০ জুলাইয়ের পর থেকে লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এক-পঞ্চমাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব সময়ের দশ ভাগের এক ভাগে গিয়ে ঠেকেছে।
