এআইয়ের মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আরেকটু হলেই চীনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করছিল যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের এক পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এক মারাত্মক ভুলের কারণে একটি চীনা জাহাজকে প্রায় আটকে ফেলতে বসেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। এর জেরে চীনের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধ বেধে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের।
সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত একটি চীনা জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্রের সরঞ্জাম রয়েছে—একট গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে এমন খবর পেয়ে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের কমান্ডোরা প্রায় জাহাজটিতে উঠে পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে আকাশে মার্কিন সামরিক বিমানও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
হাওয়াই-ভিত্তিক ইউ.এস. স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড প্যাসিফিক-এর হাতে আসা জাহাজের পণ্যতালিকার ভিত্তিতেই এই অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অভিযানটি যদি বাস্তবায়িত হতো, তবে চীনের সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত আমেরিকা।
কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হঠাৎ আবিষ্কার করেন, যে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তার পুরোটাই আসলে একটি এআই চ্যাটবটের ভুলে ভরা তথ্য। তাই বাস্তবায়িত হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে বাতিল করা হয় অভিযান।
ঘটনা যাচাই করে দেখা যায়, এক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ওই চ্যাটবটে প্রাথমিক কিছু তথ্য ইনপুট দিয়েছিলেন। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চ্যাটবটটি জাহাজের মালপত্র সম্পর্কে একেবারে ভুল এক উপসংহার টেনে বসে—প্রযুক্তির ভাষায় যাকে বলা হয় 'হ্যালুসিনেশন'।
ঘটনা সম্পর্কে অবগত এক সূত্র সিএনএনকে জানায়, ওই গোয়েন্দা তথ্যটি ছিল 'ডাহা মিথ্যা'; আর এর জেরে 'প্রায় যুদ্ধ বেধে যাচ্ছিল'।
লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের মতো স্পর্শকাতর সামরিক অভিযানে পেন্টাগন এখন দ্রুতগতিতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিকে যুক্ত করছে। সেই প্রেক্ষাপটে এ ঘটনা অতি-প্রযুক্তিনির্ভরতার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিই তুলে ধরছে।
সামরিক এআই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন, এমন এক সাবেক মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, 'এই অভ্যন্তরীণ টুলগুলো আসলে বাজারে বিক্রি হওয়া বাণিজ্যিক সফটওয়্যারেরই একটু সাজানো-গোছানো (লিপস্টিক) রূপ।'
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই টুলগুলো নিয়মিতই ওপেন-সোর্স তথ্যের সঙ্গে অতিগোপনীয় সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্সকে মিশিয়ে ফেলে। ফলে এমন আপাত-নিখুঁত রিপোর্টের জন্ম হয়, যা আসলে মিথ্যা।
একজন গোয়েন্দা বিশ্লেষক হাওয়াইয়ের ইউ.এস. স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড প্যাসিফিক থেকে পাওয়া তথ্যগুলোকে প্রম্পট হিসেবে চ্যাটবটে ইনপুট দেওয়ার পর এই ভুলের সূত্রপাত। ওই টুল ওপেন-সোর্স তথ্যের সাথে গোপন সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স গুলিয়ে ফেলে জাহাজের কার্গো সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভুল ধারণা দিয়ে বসে। এরপর সেই মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতেই ওই বিশ্লেষক আবারও এআই ব্যবহার করে একটি গোছানো গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করে তা সামরিক বাহিনীর ভেতরে ছড়িয়ে দেন।
তবে সিএনএন জানিয়েছে, ওই জাহাজের কার্গো বা আসল মালপত্র আসলে কী ছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এমনকি ব্যবহৃত সফটওয়্যারটি সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক পণ্য ছিল, নাকি সরকারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কোনো টুল—তা-ও নিশ্চিত করে জানা যায়নি।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ধরে রাখতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই—শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা এমন দাবি করলেও, সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে এ প্রযুক্তির ব্যবহারে অভিন্ন সুরক্ষানীতি না থাকায় উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন সরকারের আলাদা আলাদা শাখাগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, যেগুলোর সুরক্ষাবিধি ও কাজ করার সীমাবদ্ধতাও একেক রকম।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই মার্কিন যুদ্ধ দপ্তর ঘোষণা করেছিল, তারা গুগলের জেমিনাইয়ের পাশাপাশি ইলন মাস্কের গ্রোক এআই ও চ্যাটজিপিটির বিভিন্ন সংস্করণ ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
এছাড়া সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এআই ত্বরান্বিতকরণ কৌশলের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে নেওয়া এই পদক্ষেপের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে 'এআই-নির্ভর যুদ্ধশক্তি' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
এই কৌশল সম্পর্কে জানাতে গিয়ে হেগসেথ বলেন, 'সামরিক এআই প্রযুক্তিতে আমাদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে আমরা সব ধরনের আমলাতান্ত্রিক বাধা গুঁড়িয়ে দেব। আমাদের বিনিয়োগকে আরও বেশি লক্ষ্যভেদী করব এবং নতুন নতুন পরীক্ষার পথ উন্মুক্ত করব। জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে—সব রণাঙ্গনেই আমরা পরিণত হব এক "এআই-ফার্স্ট" যুদ্ধশক্তিতে।"
এর পাশাপাশি জারি করা একটি মেমোতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বমানের এআই মডেলগুলোকে সরাসরি সামরিক ও বেসামরিক প্রায় ত্রিশ লাখ কর্মীর হাতে তুলে দেওয়া হবে, যাতে প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভেতরে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ও রূপান্তরকে 'গণতান্ত্রিক' করে তোলা যায়।
সিএনএনকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই অত্যাধুনিক সিস্টেমগুলোর ওপর তরুণ বিশ্লেষকরা চোখ বন্ধ করে ভরসা করছেন। ফলে খুব দ্রুত বড় ধরনের ভুলের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গোয়েন্দা মহলের ভেতরের লোকেরাই সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত প্রতিবেদন নামানোর জন্য প্রবীণ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ওপরও প্রচণ্ড চাপ তৈরি করা হচ্ছে। আর সেই তাড়াহুড়োয় যাচাই-বাছাই না করেই যাচা না করা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন দপ্তরে।
দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের এই চাপ প্রসঙ্গে এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, 'এআই বুদ্ধিমত্তা আসলে আপনাকে আরও দ্রুত একটি বাজে ও ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিচ্ছে।'
আরেক সূত্র বলেছে, 'লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় একজন মানুষ যুক্ত থাকলেও, ঠিক কীভাবে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি কিংবা নিজেদের বাহিনীর সদস্যদের ওপর ভুল হামলা ঠেকানো যাবে—সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশিকাই নেই।'
এসব বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য দি ইন্ডিপেনডেন্টের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে।
