হাতির মলের ওপর নির্ভর করছে আপনার গিটারের ভবিষ্যৎ, কিন্তু কেন?
বলা হয়ে থাকে, ভাগ্য নাকি রহস্যময় পথে কাজ করে—আর সেই কথার বাস্তব উদাহরণ যেন লুকিয়ে আছে মধ্য আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকার গভীর অরণ্যে। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রান্তীয় রেইনফরেস্টের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় একদিকে রয়েছে এবোনি গাছ, অন্যদিকে বিলুপ্তির মুখে থাকা আফ্রিকান বনহাতি। তাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ক্যামেরুনের স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিখ্যাত গিটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎও। আর এই বিস্ময়কর সম্পর্কের সূত্র মিলেছে হাতির বিষ্ঠা বিশ্লেষণ করে।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার-এর মতে, বাসস্থান ধ্বংস এবং বিশেষ করে অবৈধ হাতির দাঁতের (আইভরি) ব্যবসার কারণে গত তিন দশকে আফ্রিকার বনাঞ্চলের হাতির সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বন্য পরিবেশে এই হাতিগুলো এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
আর হাতির এই বিলুপ্তি, কঙ্গো অববাহিকায় মূল্যবান এবোনি গাছের টিকে থাকার ক্ষেত্রে এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ক্যামেরায় ধারণকৃত চিত্র ও হাতির মল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানতে পেরেছেন যে, এই কালো কাঠের বংশবিস্তার ও বীজ অঙ্কুরোদগমের প্রধান কারিগর মূলত এই হাতিরাই।
হাতির দল এবোনি গাছের ফল খায় এবং মলত্যাগের আগে সেই বীজগুলোকে পেটে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়ায়। এর ফলে বনের দূরদূরান্তে এই বীজ ছড়িয়ে পড়ে এবং একই গাছের বীজের মধ্যে প্রজননের ঝুঁকি কমে যায়। এছাড়া হাতির মলের ভেতরে থাকা বীজগুলো ইঁদুর জাতীয় প্রাণীদের হাত থেকেও রক্ষা পায়।
ইউসিএলএ-র কঙ্গো বেসিন ইনস্টিটিউট-এর নেতৃত্বাধীন এক নয় বছরের দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বনে হাতি নেই, সেখানে এবোনি গাছের চারা গজানোর হার প্রায় ৬৮ শতাংশ কম।
সিবিআই-এর গবেষণা সহকারী এরিক ওনগুয়েন সিএনএন-কে বলেন, 'ফলাফলগুলো বেশ আতঙ্কজনক। শুরুতে আমরা ভেবেছিলাম সব ধরনের প্রাণীই হয়তো এবোনির বীজ ছড়িয়ে দেয় এবং এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই পুনরায় জন্মাবে... কিন্তু যদি হাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে আমাদের এই এবোনি প্রজাতির বিলুপ্তির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।'
এই গবেষণার অন্যতম বড় অর্থদাতা ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক টেইলর গিটারস। প্রশ্ন উঠতে পারে, একটি গিটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কেন আফ্রিকার অরণ্যে গাছ ও হাতি নিয়ে গবেষণায় অর্থ ব্যয় করবে?
এর উত্তর রয়েছে ইবোনি কাঠের মধ্যে। গাঢ় কালো, মসৃণ ও টেকসই এই কাঠ দীর্ঘদিন ধরে গিটারের ব্রিজ ও ফ্রেটবোর্ড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অত্যন্ত ভারী, টেকসই এবং মসৃণ এই কাঠটি গিটারের 'ফ্রেটবোর্ড' এবং 'ব্রিজ' তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
১৯৭৪ সালে বব টেইলর এবং কার্ট লিসটুগের প্রতিষ্ঠিত 'টেইলর গিটারস'-এর বিশ্বব্যাপী সাফল্যের পেছনে রয়েছে এই কালো কাঠের গিটার। টেইলর সুইফট থেকে শুরু করে জেসন মিরাজের মতো বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীরা তাদের এই গিটার ব্যবহার করেন।
ক্যামেরুনের রাজধানী ইয়াওনদে-তে অবস্থিত 'ক্রেলিক্যাম এবোনি মিল'-এর সহ-মালিক বব টেইলর যখন দেখলেন যে এই কাঠ খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কঙ্গো অববাহিকার প্রায় ৩৭ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা এই বনের বিপুল সম্পদ এখন আশপাশের প্রায় ৮ কোটি মানুষের কাটার প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
ক্রেলিক্যাম মিলের পরিচালক ম্যাথু লেব্রেটন সিএনএন-কে বলেন, 'যেসব এলাকায় ইবোনি সংগ্রহ করা হতো, সেসব জায়গায় এখন গাছ প্রায় শেষ।'
বব টেইলরের জন্য এই গবেষণায় অর্থায়নের সিদ্ধান্তটি ছিল তার ব্যবসার একটি অন্যতম প্রধান মূলনীতি—'অনিবার্য ভবিষ্যতে বিনিয়োগ'। তিনি সিএনএন-কে বলেন, 'আপনি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবলেন—উফ, এটি তো চিরকাল থাকবে না। আমি এখানে 'টেকসই' শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না, তবে এটুকু বলা যায় যে এটি ফুরিয়ে যাবে। তাই আমাদের কিছু একটা করতে হবে... আমাদের গাছ ফুরিয়ে যাওয়াটা অনিবার্য, তাই আমি গাছ লাগানোর পেছনে বিনিয়োগ করছি।'
২০১৬ সালে একটি সাধারণ তথ্য সংগ্রহের মিশন হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে তা রূপ নেয় 'এবোনি প্রজেক্ট'-এ। এটি মূলত কঙ্গো বেসিন ইনস্টিটিউট (সিবিআই), স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং বিজ্ঞানীদের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
গবেষণায় দেখা গেছে, এবোনি গাছ খুব দ্রুত বড় হয় না। একটি চারা গাছ পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হতে প্রায় ১০০ বছর সময় লেগে যায়। এই কারণে সিবিআই বনের আদিবাসী 'বাকা' সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বীজ বিতরণের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যারা হাতিদের সঙ্গেই এই বনের ভাগীদার।
সিবিআই-এর গবেষক জ্যাক চুনজেউ সিএনএন-কে বলেন, 'কঙ্গো অববাহিকার ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ রক্ষা করার জন্য কেবল নিয়ম জারি করা বা প্রতিটি গাছের সামনে একজন করে পুলিশ দাঁড় করিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আপনাকে স্থানীয় জনগণকে এর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং এই চাষের মাধ্যমে তাদের নিজেদের কী স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তা বুঝিয়ে দিতে হবে।'
চুনজেউয়ের এই মূল্যায়ন একটি অত্যন্ত জটিল প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে—যে গাছের ছায়ায় আপনি নিজে কোনোদিন বসতে পারবেন না, সেই গাছের বীজ বোনার জন্য মানুষকে কীভাবে রাজি করাবেন?
এই সমস্যার সমাধানে বাকা সম্প্রদায়কে রোপণকৃত এবোনি গাছের মালিকানা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের দ্রুত বর্ধনশীল কিছু ফল ও ঔষধি গাছের বীজ (যেমন অ্যাভোকাডো ও আম) দেওয়া হয়, যা তারা খুব দ্রুত খেয়ে বা বাজারে বিক্রি করে লাভবান হতে পারে।
এর অন্যান্য ইতিবাচক দিকও ছিল। স্থানীয়রা নার্সারিতে চারা তৈরির আধুনিক কৃষি কৌশল শেখার সুযোগ পান, যা এই প্রকল্পের অংশীদার ১৩টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
কঙ্গো অববাহিকার 'দজা ফনাল রিজার্ভ'-এর প্রান্তে অবস্থিত বিফোলোন গ্রামের বাকা আদিবাসী রোপণকারী স্যামুয়েল বাম্বো মেমপং বলেন, 'এটি আমাদের জীবন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এটি আমাকে এমন জ্ঞান দিয়েছে যা আমার আগে ছিল না। আমি এখন অন্যান্য অঞ্চলের মানুষদেরও এই প্রশিক্ষণ দেব এবং এর মাধ্যমে নিজেও উপকৃত হব।'
নিজের আড়াই হেক্টরের জমিতে প্রথম রোপণ করা সাত বছর বয়সী এবোনি গাছটি দেখিয়ে মেমপং বলেন, 'এই অর্থ মূলত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যাবে। আমার সন্তান ও নাতি-নাতনিরা—তারাই মূলত এর সুফল ভোগ করবে।'
এবোনি প্রজেক্ট এখন ১০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। এই সময়ে প্রায় ৫০ হাজার ইবোনি গাছ এবং আরও ৩৪ হাজারের বেশি ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। তবে টেইলরের লক্ষ্য আরও বড়।
তিনি বলেন, 'আগামী ১০ বছরে হয়তো আমরা ১০ লাখ গাছ লাগানোর মাইলফলকে পৌঁছে যাব।' তার মতে, এই প্রকল্প মূলত একটি উদাহরণ তৈরি করছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও বড় উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়।
মেমপংয়ের কথাতেও সেই ভাবনাই ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, 'আমরা আর বন ধ্বংস করতে চাই না। আমরা বনকে এমনভাবে ব্যবহার করতে চাই, যাতে আমাদের পরের প্রজন্মও একই বন থেকে উপকার পেতে পারে।'
