হরমুজ: শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্বের ১০ কোটি মানুষের খাদ্য সরবরাহেরও প্রধান পথ
হরমুজ প্রণালী; বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই জলপথ কেবল জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়, এটি ১০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনরেখা।
তাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহও চাপের মুখে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকা সহজ নয়। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি পৌঁছে যায় এবং চাষযোগ্য জমি খুবই কম। ফলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর পানীয় জলের বড় অংশ সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে সংগ্রহ করা হয়। তবে তাদের অধিকাংশ খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
সৌদি আরব তাদের ৮০ শতাংশের বেশি খাদ্য আমদানি করে, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ৯০ শতাংশ এবং কাতার প্রায় ৯৮ শতাংশ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইরাকেরও খাদ্য আমদানির বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে।
সার্বিকভাবে, এই অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহের বেশিরভাগ চালান এই প্রণালী দিয়ে আসে। কিন্তু পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কারণে বর্তমানে এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
জলপথ বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে পণ্য আনার চেষ্টা চলছে, তবে সেগুলো ব্যয়বহুল ও জটিল হওয়ায় সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানও তাদের বাণিজ্যের বড় অংশের জন্য এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছে, সরবরাহ শৃঙ্খল কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
ডব্লিউএফপির উপ-নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ বলেন, জাহাজ পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে তাৎক্ষণিক খাদ্য সংকটের আশঙ্কা না থাকলেও; যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে বিঘ্ন হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক তাজা খাদ্য ও সবজি বিক্রেতা কিবসন্স ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর ৫০ হাজার টন খাদ্য আমদানি করে, যা দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ খুঁজে বের করা।
কিবসন্সের ক্রয় পরিচালক ড্যানিয়েল কাবরাল বলেন, 'এই মুহূর্তে সরবরাহ শৃঙ্খল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।'
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য তদারকি সংস্থা ইউকেএমটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে প্রায় দুই ডজন জাহাজে হামলা হয়েছে, যার মধ্যে ওমান উপকূলের একটি কার্গো জাহাজও রয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের ঝুঁকি নিতে চাইছে না জাহাজ কোম্পানিগুলো।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ইতোমধ্যে সমুদ্রে থাকা জাহাজগুলো। তাজা পণ্যসহ কিবসন্সের প্রচুর খাদ্যপণ্য এখনও জাহাজের কনটেইনারে প্রণালীর বাইরে অপেক্ষারত। এসব পণ্য পৌঁছানোর সময় বা গন্তব্য এখনও অনিশ্চিত।
কাবরাল বলেন, 'অনিশ্চয়তা অনেক বেশি।'
এছাড়া বীমা খরচও রয়েছে।
ব্যবসা পরিচালনার খরচ
জাহাজ পরিবহন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এখন 'যুদ্ধকালীন ধারা' কার্যকর হয়েছে। এসব ধারা অনুযায়ী জাহাজগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ থেকে বিরত থাকার সুরক্ষা দেওয়া হয় এবং তারা নিজেরাই পণ্য খালাসের বন্দর নির্ধারণ করতে পারে।
কিবসন্সের একটি কনটেইনার দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন ভারতের মুন্দ্রায় রয়েছে।আরেকটি পাঠানো হয়েছে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে।
তবে স্থলভাগে পৌঁছালেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
কাবরাল বলেন, 'জাহাজ কোম্পানি জানতে চাইছে, এখন আমরা এসব পণ্য কী করব? ভারতের ভেতরেই বিক্রি করব, নাকি অন্য কোনো পরিকল্পনা আছে? এটি আমাদের জন্য খুবই কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করছে।'
বীমা সংস্থা ও জাহাজ কোম্পানিগুলো এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে।
কাবরালের মতে, 'মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রতিটি কনটেইনারে জাহাজ কোম্পানিগুলো ৪ হাজার ডলার অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করেছে। স্থলপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রতি কনটেইনারে ৪ হাজার থেকে ৯ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ পড়ছে।
তিনি বলেন, 'ইউরোপ থেকে একটি কনটেইনার আনার জন্য আগে যেখানে প্রায় ৩ হাজার ইউরো খরচ হতো, এখন সেই খরচ বেড়ে ১৪ হাজার ৫০০ ইউরো হয়েছে, তাও এসব কনটেইনার জেদ্দা পর্যন্ত যেতে পারে। এরপর সেখান থেকে ট্রাকে করে নিতে আরও খরচ যোগ হবে, ফলে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে।'
এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।
কাবরাল জানান, দুগ্ধজাত পণ্য ও কিছু তাজা পণ্যের ক্ষেত্রে কিবসন্স প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়াতে পারে। বর্তমানে তাদের গুদামে প্রায় এক মাসের তাজা পণ্যের মজুত রয়েছে।
অন্যদিকে, আকাশপথে পণ্য পরিবহনও সাম্প্রতিক সময়ে নানা সমস্যায় পড়েছে।
ইরান ২৮ ফেব্রুয়ারি পাল্টা হামলা চালানোর পর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৪৮ ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে। এতে যাত্রীদের পাশাপাশি কার্গো পরিবহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সোমবার ড্রোন হামলায় বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লাগার ঘটনা জানায় দুবাই সিভিল ডিফেন্স। এর পরপরই বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
তাই এ অঞ্চলের খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে বিকল্প পথ খুঁজছে।
১৯২৪ সাল থেকে কার্যক্রম চালানো স্পিনিস অবশ্য জানিয়েছে, তারা খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে।
স্পিনিসের সরবরাহ শৃঙ্খল বিভাগের প্রধান লুইস বোথা বলেন, 'আমরা কোনোভাবেই না খেয়ে থাকব না।'
লেবানন ও মিসরের মতো বাজারে অতীতের সংঘাত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা থাকলেও, এবার উপসাগরীয় অঞ্চলে তারা নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিকল্প পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্পিনিস যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্স হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত সড়কপথে খাদ্যবাহী কনটেইনার পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে, যা পরে ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাবে।
বোথা বলেন, 'আমরা যুক্তরাজ্য থেকে সরাসরি জেবেল আলি গুদাম পর্যন্ত প্রায় ১২ দিনের মধ্যে সড়কপথে পণ্য আনতে পারি। আর একটানা চালালে সময় লাগে প্রায় ৭২ ঘণ্টা।'
তিনি জানান, এটি আকাশপথের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম খরচের।
খুচরা বাজারে বাড়ছে পণ্যের দাম
সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব ইতোমধ্যেই ভোক্তাদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে তাদের বেশি দাম দিয়ে কম পণ্য কিনতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর সরকার সরবরাহ জট কমানোর চেষ্টা করছে।
ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নতুন একটি বাণিজ্য করিডর চালু করেছে, এর মাধ্যমে মাস্কাট ও জেবেল আলি বন্দরের মধ্যে দ্রুত পণ্য খালাস করা যাবে।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মিড বলেন, 'যদি পর্যাপ্ত অর্থ দিতে রাজি থাকেন, তবে বীমা পাওয়া সম্ভব।'
তবে তার মতে মূল সমস্যা এটি নয়। তিনি বলেন, 'মূল বিষয় হলো নিরাপত্তা, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।'
সাম্প্রতিক সময়ে সামরিকভাবে হরমুজ প্রণালী নিরাপদ করার আলোচনা বেড়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শিপিং কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে ইউএস ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া এবং মার্কিন নৌবাহিনীর এসকর্ট দেওয়ার কথা বলার পর।
তবে এ বিষয়ে মিড সন্দিহান।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নৌবাহিনীর এসকর্ট শিগগিরই আসছে না।'
তার মতে, এ ধরনের সহায়তা এলেও তেলবাহী ট্যাঙ্কার অগ্রাধিকার পাবে, পণ্যবাহী জাহাজ নয়।
তিনি আরও বলেন, এমন একটি অভিযানের জন্য বড় পরিসরের প্রস্তুতি দরকার হবে।
তার ভাষ্য, 'প্রতিদিন পাঁচ থেকে ১০টি ট্যাঙ্কারকে এসকর্ট দিতে আট থেকে ১০টি ডেস্ট্রয়ার প্রয়োজন হবে।'
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ৬০টি ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করত। এমন জটিল ও ব্যয়বহুল ব্যবস্থা চালু হলেও অগ্রাধিকার পাবে তেলবাহী জাহাজ, ফলে খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি পণ্য পরিবহনের সমস্যা থেকেই যাবে।
ট্রাম্প ও তার প্রশাসন নিজেদের শর্তে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে আশাবাদী থাকলেও সময় যত গড়াচ্ছে, এর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলছে।
