নগরবাসীর নিরাপত্তা ও সেবাপ্রদানের মধ্যেই ঈদের আনন্দ খুঁজে পান জরুরি সেবাদানকারীরা

টানা নয় দিনের ঈদের ছুটিতে প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে যখন ঢাকা ফাঁকা করে অধিকাংশ নগরবাসী বাড়িতে চলে গেছে, তখন নগরের নিরাপত্তা ও সেবাপ্রদানে ব্যস্ত ছিলেন জরুরি সেবাদানকারীরা।
জরুরি সেবাদাতারা বলছেন, এ নিয়ে তাদের কোনো আক্ষেপ নেই, নগরবাসীকে সেবাদানের মধ্যেই ঈদের আনন্দ খুঁজে পান তারা।
জরুরী সেবাদানের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক, পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, ফায়ারফাইটার, সাংবাদিক, নিরাপত্তা কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন সেবায় নিয়োজিত কর্মীরা কর্মস্থল ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গেই পার করেছেন ঈদের ছুটি।
ঈদের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, অর্ধশতাধিক অসুস্থ শিশু নিয়ে অভিভাবকরা হাসপাতালে এসেছেন।
জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত ডা. কেয়া সাহা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমি সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও ঈদের ছুটিতে গ্রামে যেতে ইচ্ছা হয়, কারণ এই ছুটিতে সব আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুরা গ্রামে যায়। কিন্তু যখন দায়িত্বের জায়গা থেকে একটি শিশুর চিকিৎসা দিতে পারছি তখন ওই আনন্দের চেয়ে সেবা দিয়েই বেশি আনন্দ পাই। ঈদে আমরা ছুটি না পেলেও এই সময়টা দায়িত্ব পালন করে খুব উপভোগ করি।'
তিনি আরও বলেন, 'ঈদের দিন সন্ধ্যার পরে রোগীর চাপ বেশি ছিল। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া রোগী বেশি আসছে। মঙ্গলবার ২০০-র বেশি রোগী এসেছে। এই রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যে মানসিক শান্তি, তা ঈদের ছুটিতে পরিবারের সাথে কাটানোর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসকরাও রোগীদের দেখতে আসছেন, আমাদের উৎসাহ দিচ্ছেন।'
এই হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় শরিফুল ইসলাম বলেন, 'যখন একটি অসুস্থ শিশুকে অক্সিজেন লাগিয়ে সুস্থ হয়ে উঠতে সহায়তা করতে পারি, তখন আর ঈদের ছুটি নিয়ে কোনো আফসোস হয় না। এখন হাসপাতাল এবং রোগীদেরই নিজের পরিবার ও পরিবারের সদস্য মনেহয়।'
১০ দিন ধরে অসুস্থ শিশুকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে মঙ্গলবার মহাখালী ডায়েরিয়া হাসপাতাল থেকে শিশু হাসপাতালে আসেন আলো আক্তার। তিনি বলেন, 'বাচ্চা অসুস্থ থাকায় আমাদের আর ঈদের আনন্দ নেই। তবে এই ছুটির মাঝেও সেবা পাচ্ছি, সেটাই অনেক বড় বিষয়। হাসপাতালে এসে মনে হয়নি যে ঈদের ছুটি চলছে। ডাক্তারও ও নার্সরা অনেক আন্তরিক।'
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লিডার কাজী রাহেদুল ইসলাম ঈদের আগ থেকেই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আরও ১৩ জনকে নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাহেদুল বলেন, 'আমাদের এখানে আটটি পয়েন্টে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। আমাদের এখানে থাকতে হবে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত। আমরা কাজের মধ্যেই ঈদের আনন্দ খুঁজে পাই। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে নগরবাসী দুর্ঘটনামুক্ত ঈদ উদযাপন করতে পারে। এবারে সদরঘাট এলাকায় বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি—এটাই আমাদের ঈদের প্রাপ্তি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা চাকরিতে যোগদানের পর দেশের জন্য সবকিছু উৎসর্গের শপথ নিয়েই কাজ শুরু করি। আমাদের ২৪ ঘণ্টাই ডিউটিরত অবস্থায় থাকতে হয়। এই সেবাদানের মাধ্যমেই ঈদকে উদযাপন করছি। ৭ তারিখের পরে অফিসে ফেরার পর ছুটি পেলে সন্তানদের নিয়ে গ্রামে যাওয়ার প্ল্যান করছি।'
শ্যামলী মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপালনকারী কনস্টেবল মো. নুরুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, 'আমাদের এ পেশায় ঈদ আর অন্যকিছু নেই। রাজধানীর মানুষের সাথেই ঈদ উদযাপন করি। আমার দায়িত্বরত এলাকায় যদি ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা এড়াতে পারি, সেটাই আমার কাছে ঈদ উদযাপন।'
ঈদের দিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, 'ঈদের দিন আগারগাঁও চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের ঈদের জামায়াতের ডিউটি পালন করেছি। সেখানেই নামাজ পড়েছি এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সেমাই খেয়ে ঈদ উদযাপন করেছি। নগরবাসীর স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যেই আমাদের ঈদকে স্যাক্রিফাইস।'
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) জরুরি বিভাগে চিকিৎসকরা টিবিএসকে বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আহত রোগীরা আসছেন।
তার বলেন, আহতদের সেবাদানই তাদের ঈদ উদযাপন। তবে হাসপাতালে অমুসলিম চিকিৎসকরা বেশি দায়িত্বে থাকেন ঈদের সময়ে।
ঢাকায় ইউনিসেফ অফিসের গার্ডের দায়িত্ব পালনরত আরাফাত ও হৃদয় এবারেই প্রথম পরিবারকে ছেড়ে দূরে ঈদ উদযাপন করেছেন। তারা জানান, ঈদের দিন কিছুটা ঘোরাঘুরি করেছেন ডিউটি শেষে। সহকর্মীদের সঙ্গে সেমাই, মিষ্টি খেয়ে পাশের ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়েছেন।
শাহবাগে দায়িত্ব পালনকারী দুজন পুলিশ সদস্য বলেন, 'আমাদেরও ইচ্ছা করে পরিবারের সাথে গিয়ে ঈদ উদযাপন করতে। কিন্তু মন খারাপ থাকলেও মেনে নিতে হয়। আমাদের এই কষ্টের কারণে মানুষ ভালোভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারছে, এটাই আমাদের প্রশান্তি দেয়।'
একজন সাংবাদিকও প্রায় একই কথা বলেন। 'অফিস হলো আমাদের সেকেন্ড হোম। সারা বছর যেমন পরিবারকে মিস করি, তেমনি ঈদের দিন না কাজ না করলেও অফিসকে মিস করি। আমরা যারা এই সময় জরুরি দায়িত্ব পালন করি, তাদেরকে নিয়ে আমাদের ছোট পরিবার হয়ে গেছে। সহকর্মীদের সঙ্গে কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিই।'
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বিলকিস বেগম বলেন, 'সিটি কর্পোরেশন থেকে সবাইকে ঈদের ছুটি দেয়নি। আমাদের কয়েকজনকে কাজ করতে হচ্ছে। কারণ বন্ধের মধ্যে রাস্তা ঝাড়ু না দিলে নগরবাসীর কষ্ট হবে। ছুটি পাইনি, এটা ভেবে খারাপ লাগলেও মানুষের সেবায় যে কাজ করছি সেই চিন্তা করে কষ্ট মনে হয় না। ঈদের বন্ধ শেষ হলে কিছুদিন পরে ছুটি নিয়ে বাড়িতে যাব।'