বাংলাদেশের গুর্খারা: লড়েছেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য, থেকে গেছেন স্বাধীন দেশে, ভুলে গেছে দু-পক্ষই
রাঙ্গামাটি শহরের জেল রোডের ঠিকাদার পাড়ার বাসিন্দা মনোজ বাহাদুর গুর্খা। তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এখানেই। এলাকায় তিনি একজন প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে পরিচিত।
মনোজ বলেন, 'আমার নাতনিসহ আমরা এখন এ অঞ্চলের সপ্তম প্রজন্ম হিসেবে বসবাস করছি।'
নেপালি একটি সুপরিচিত প্রবাদ হলো 'কায়ার হুনু ভান্দা মারনু রামরো', যার অর্থ—কাপুরুষের মতো বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুও শ্রেয়। এটিই বিশ্বের অন্যতম অকুতোভয় যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত গুর্খা সৈন্যদের মূল আদর্শ বা স্লোগান।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর 'গুর্খা রাইফেলস', যুক্তরাজ্যের 'ব্রিগেড অব গুর্খাস' কিংবা সিঙ্গাপুরের 'গুর্খা কন্টিনজেন্ট'-এর মতো একাধিক দেশের শীর্ষ অভিজাত বাহিনীতে তাদের অবদান ও সুনাম আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের ডাক এই অকুতোভয় সৈন্যদের পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে নিয়ে গেছে। ঠিক এভাবেই তারা একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিল এবং তাদের ক্ষুদ্র একটি অংশ আর ফিরে যাননি, তারা পরবর্তীতে এ ভূখণ্ডেরই স্থায়ী অংশে পরিণত হয়েছেন।
মনোজ জানান, 'তবে এই অঞ্চলের অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাথে আমাদের একটি মৌলিক পার্থক্য আছে।'
তিনি ব্যাখ্যা করেন, অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো শত শত বছর ধরে এখানে বাস করছে অথবা স্থানীয় সংঘাত ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আশেপাশের এলাকা থেকে এলেও, গুর্খারা নিজেদের ইচ্ছায় এখানে আসেনি। তৎকালীন বৈধ সরকার নিজেদের স্বার্থে তাদের পূর্বপুরুষদের এখানে এনেছিল।
অথচ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত এই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে সঠিক মূল্যায়ন পায়নি, এমনকি দেশের ইতিহাসেও তাদের স্থান হয়নি।
গুর্খারা যেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিল
গল্পের শুরু ১৮১৪ থেকে ১৮১৬ সালের মধ্যে সংঘটিত অ্যাংলো-নেপালি যুদ্ধের মাধ্যমে। ভারতের প্রায় পুরোটাই দখলে নেওয়ার পর, ব্রিটিশরা সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে উত্তরে হিমালয়ের দিকে নজর দেয়।
তাদের ধারণা ছিল তারা খুব দ্রুত ও সহজে জয়লাভ করবে। কিন্তু পাহাড়ের বুকে পা রাখতেই তারা গুর্খা সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হয়ে এক নৃশংস ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মুখে পড়ে।
এই সামরিক অভিযান ব্রিটিশদের জন্য এতোটাই দুঃসাধ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, শত্রুর প্রতি ব্রিটিশদের মনে গভীর শ্রদ্ধার জন্ম নেয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই এই দুর্ধর্ষ পাহাড়ি যোদ্ধাদের নিজেদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া শুরু করে ব্রিটিশরা।
দুই বছরব্যাপী পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যাপক লড়াইয়ের পর ক্লান্ত ও কৌশলগতভাবে পরাস্ত নেপাল অবশেষে ১৮১৬ সালে 'সুগৌলি চুক্তি' স্বাক্ষর করে।
এটি ছিল একটি তিক্ত শান্তি চুক্তি, যার মাধ্যমে গুর্খারা শিমলা ও দার্জিলিংয়ের মতো মূল্যবান অঞ্চলসহ তাদের সাম্রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড হারায় এবং বর্তমান নেপালের আধুনিক সীমানা নির্ধারিত হয়।
পরবর্তীতে গুর্খারা ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। বার্মা, আফগানিস্তান ও মাল্টাসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানে সম্মুখ সারির আক্রমণকারী সৈন্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
পূর্ব সীমান্তে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় পুরোদমে ব্রিটিশদের সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু হয়। চট্টগ্রামকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার পর, তাদের নজর যায় চট্টগ্রাম বন্দর, ত্রিপুরা ও আরাকানের মধ্যবর্তী পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলে, যা 'কার্পাস মহল' নামে পরিচিত ছিল। মূলত স্থানীয় জুম্ম আদিবাসীরা তুলা উৎপাদন করত বলেই মোঘলরা এই এলাকার নাম দিয়েছিল কার্পাস মহল।
ব্রিটিশ শাসনের আগে এই অঞ্চলটি মূলত স্বশাসিত ছিল। মোঘল শাসকরাও কখনো পাহাড়ে সরাসরি নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেননি; বরং তারা স্থানীয় আদিবাসী প্রধানদের কাছ থেকে কেবল কাঁচা তুলার মাধ্যমে বাণিজ্যিক কর আদায় করতেন।
এর আগে, এই পাহাড়ি অঞ্চলটি ছিল কুকি, লুসাই এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের ভূমি, যারা সমতলের রাজনৈতিক কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ দূরে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতেন। কিন্তু আরাকানের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল পাহাড়ে আসতে শুরু করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। বাস্তুচ্যুত এই বিপুল জনসংখ্যার পুনর্বাসন পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে জাতিগত উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
নতুন জনগোষ্ঠীর বিস্তারের কারণে সেখানকার প্রাচীন অধিবাসী—যেমন কুকি, লুসাই ও সেন্দুজদের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের জমি কমে যেতে থাকে, যার ফলে শুরু হয় বহু দশক স্থায়ী সহিংসতার চক্র। ১৮৩৭ থেকে ১৮৫৪ সালের মধ্যে অন্তত বিশটি বড় আক্রমণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়, যেখানে নতুন বসতি স্থাপনকারী ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
এই কঠিন পরিবেশে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে বিশাল বাস্তব প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছিল। সমতলের উন্মুক্ত প্রান্তরে লড়াইয়ে অভ্যস্ত তাদের সেনারা খাড়া ও দুর্গম বনাঞ্চলে সুবিধা করতে পারছিল না।
অন্যদিকে, কুকি অধিবাসীরা জঙ্গলের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়ে প্রাকৃতিক সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাত। একাধিক ব্যর্থ অভিযানের পর ব্রিটিশ শাসকরা বুঝতে পারে যে এই পাহাড়ি রণাঙ্গনে তাদের সাধারণ সেনারা পুরোপুরি অনুপযুক্ত। ফলে পরিবেশের সাথে জন্মগতভাবে অভ্যস্ত এমন একটি সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
মনোজ বাহাদুর গুর্খা বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, 'ওই সময় পাহাড় বা জঙ্গলে লড়াই করার কোনো পূর্বঅভিজ্ঞতা ব্রিটিশদের ছিল না। পাহাড়ি পিচ্ছিল কাদা আর তাদের পায়ে ভারী চামড়ার বুট—সব মিলিয়ে তারা পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছিল। তারা কুকিদের পাতা ফাঁদে আটকে গিয়ে সহজেই পরাস্ত হতো। শেষ পর্যন্ত "কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে" ইংরেজরা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ২য় গুর্খা রেজিমেন্ট পাঠাতে বাধ্য হয়।'
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লেউইন তার 'এ ফ্লাই অন দ্য হুইল' বইতে গুর্খা সৈন্যদের সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। ১৮৭১-৭২ সালের লুসাই অভিযানের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন—'বিদ্রোহ দমনে কর্নেল এইচ ম্যাকফারসনের নেতৃত্বে ২য় গুর্খা রেজিমেন্ট কাসালংয়ে (বর্তমানে রাঙ্গামাটির সংরক্ষিত বন) অবস্থান নেয়।'
এই সৈন্যদের সুসংহত কাজের দক্ষতা দেখে লেউইন অভিভূত হয়েছিলেন। শান্ত, সুশৃঙ্খল ও দৃঢ় মানসিকতার অধিকারী এই লড়াকুদের তিনি 'চমৎকার একদল খুদে মানব' বলে অভিহিত করেন। তাদের লড়াইয়ের ধরন স্থানীয় উপজাতিদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। নেপালের খাড়া ও রুক্ষ পাহাড়ে বেড়ে ওঠা গুর্খারা ছিল বনাঞ্চলে চলাচলে অত্যন্ত পারদর্শী। তারা গাছের মগডালে উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপচাপ বসে শত্রুর গতিবিধির ওপর নজর রাখতে পারত।
পাহাড়ে জীবনযাপনের কঠোর সহনশীলতা এবং বিশেষ গেরিলা কৌশলের সমন্বয়ে অবশেষে এই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে। তাদের মতো জঙ্গলে সমান পারদর্শী একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ অসম্ভব বুঝতে পেরে লুসাইরা চুক্তির শর্ত মেনে নেয়। এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির সূচনা হয়।
কিন্তু এই অর্জিত শান্তি স্থায়ী হবে কি না—তা নিয়ে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের মনে সংশয় ছিল। তাই গুর্খাদের দিয়ে একটি স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যারিকেড গড়ে তোলার কৌশল নেয় তারা। ক্যাপ্টেন লেউইন তার বইয়ের উপসংহারে উল্লেখ করেন, সীমান্তে অনাবাদী পড়ে থাকা ভূখণ্ডে নেপাল থেকে অধিবাসীদের এনে বসতি গড়ে তোলার জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি চেয়েছিলেন।
১৮৭৩ সালের শুরুতে কর্ণফুলীর উত্তর উপনদী মাইনী উপত্যকায় এই গুর্খা পল্লীগুলো গড়ে তোলা হয়। কুকি আর লুসাইদের হামলার আতঙ্কে এতদিন এসব অঞ্চল জনশূন্য পড়ে ছিল। সেখানে দুঃসাহসী গুর্খা পরিবারগুলোকে বসতি গড়ার সুযোগ দিয়ে ব্রিটিশরা মূলত মং রাজার সীমানা ও অন্যান্য লোকালয়কে পূর্বের স্বাধীন উপজাতিগুলোর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে একটি 'বাফার জোন' বা মধ্যবর্তী সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছিল।
পরবর্তীতে ১৯০০ সালের 'পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন আইন'-এর মাধ্যমে এই বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্তকে আইনিভাবে আরও শক্তিশালী করা হয়। এই আইনে মাইনী উপত্যকাকে একটি 'বিশেষ অঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা করে ব্রিটিশরা, যা স্থানীয় গোত্রপ্রধানদের প্রশাসনিক সীমানার বাইরে রাখা হয়েছিল। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যেন গুর্খা বসতিটি একটি স্বাতন্ত্র্যসূচক ও কৌশলগত সরকারি প্রতিরক্ষা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
কিন্তু পাহাড়ের বুকে প্রশাসনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে যে গুর্খারা এত বড় ভূমিকা রাখল, কালের আবর্তে তারাই হারিয়ে গেল। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস, স্বীকৃতি আর মানুষের স্মৃতিপটে তারা রয়ে গেল সম্পূর্ণ উপেক্ষিত।
মনোজের ভাষায়, 'এখানকার অধিবাসীদের নিরাপত্তা ও শান্তি সুনিশ্চিত করতেই প্রথম ব্রিটিশ সরকার আমাদের পূর্বপুরুষদের এনেছিল; তারা নিজস্ব কোন স্বার্থে আসেননি। আর ঠিক এ কারণেই আমাদের লোকজনের মধ্যে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন কষ্ট রয়ে গেছে। এটি খুব স্বাভাবিক যে, যখন আপনার পূর্বসূরীরা দেশের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করবেন, তখন আপনি রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে ন্যূনতম একটা স্বীকৃতি চাইবেন। আমরা এ মাটিতে পা রেখেছি, রক্ত দিয়েছি এবং শান্তি স্থাপনে ভূমিকা রেখেছি। অথচ বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আজকের বাংলাদেশে খুব কম মানুষই খবর রাখে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি গুর্খা জনগোষ্ঠী বাস করে।'
বহু দশক ধরে বাংলাদেশের গুর্খা সম্প্রদায় সুপরিকল্পিতভাবে অবহেলা ও প্রান্তিকতার শিকার হয়ে আসছে। মনোজ এ বিষয়ে বলেন, 'আমাদের জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কোনো বিসিএস বা সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা নেই, সরকারি কোনো উচ্চপদেও আমাদের কেউ পৌঁছাতে পারেনি।'
তিনি আরও বলেন, 'পাহাড়ের অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী যে ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক সুবিধা ও কোটা সুবিধা পেয়ে থাকে, আমরা তা থেকে বঞ্চিত; কারণ দীর্ঘদিন আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতিই ছিল না। ২০১৮ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় অবশেষে আমাদের দেশের ৫০টি আদিবাসী গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত করে। তবে আজও পার্বত্য জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ বা স্থানীয় কোনো প্রশাসনিক কাঠামোতে আমাদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি।'
সীমিত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্বল্প জনসংখ্যার কারণে পার্বত্য জেলাগুলোতে বাস করা গুর্খারা ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব ভাষা ও রীতিনীতি হারাতে বসেছে। প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করতে গিয়ে নিজেদের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা দিন দিন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া, জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের অভাবে তাদের মাঝে নিজস্ব জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জোরালো বোধ গড়ে ওঠার পথও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
মনোজ জানান, তাদের মধ্যে অনেকে স্কুলে শিক্ষকতা করছেন, অনেকে সরকারি চাকুরিজীবী, আবার অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।
তার মেয়ে 'ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন' (ডব্লিউএইচও)-এ কর্মরত এবং ছোট ছেলে ব্যবসা করেন। তিনি আরও জানান গুর্খাদের সংস্কৃতি, সংগীত ও শিল্পের প্রতি গভীর এবং সহজাত অনুরাগ রয়েছে ফলে এ সম্প্রদায়ের মাঝে প্রচুর সুরকার, গায়ক এবং এমনকি অভিনেতাও গড়ে উঠেছেন।
বর্তমানে রাঙ্গামাটি ছাড়াও বাংলাদেশের আরও বিভিন্ন প্রান্তে গুর্খা সম্প্রদায় বসবাস করছে। মনোজ বাহাদুর বলেন, 'বান্দরবান, ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং কুষ্টিয়াসহ বাংলাদেশের অনেক জেলায় গুর্খা সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে। শুধু রাঙ্গামাটিতেই বর্তমানে প্রায় ৩০টি পরিবারে ৩০০ জনের মতো গুর্খা অধিবাসী রয়েছেন। এছাড়া বান্দরবানে ১০-১২টি পরিবার এবং অবশিষ্ট সদস্যরা ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে ছড়িয়ে আছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'এমন একটা সময় ছিল যখন রাঙ্গামাটির আসাম বস্তি এবং মাঝি বস্তিজুড়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর বিশাল উপস্থিতি ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় অনেকেই নেপালে ফিরে যান, আবার কেউ কেউ ভারতে পাড়ি জমান। আমাদের জনসংখ্যা কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো অন্য সম্প্রদায়ের সাথে আন্তঃবিবাহ। কেউ কেউ বাঙালি হিন্দুদের বিয়ে করেন, কেউ অন্য নৃগোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, আবার কেউ কেউ বাঙালি মুসলিমদেরও বিয়ে করেন। তবে ধর্ম ও রীতিনীতির মিল থাকার কারণে অনেক গুর্খা অসমিয়াদের বিয়ে করেন।'
মনোজ বলেন, 'কিন্তু এর জন্য আমি অন্য কাউকে দায়ী করতে চাই না। সত্যি বলতে, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় আমাদের নিজেদের মানুষের মধ্যেই চরম অসচেতনতা ছিল। আমাদের তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে না; তারা এখন বাংলায় অভ্যস্ত—যা হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ আমাদের পড়ালেখা ও জীবনযাত্রার মূল মাধ্যমই হলো বাংলা।'
দীর্ঘকাল একা বা বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনের দরুন, এদেশের গুর্খারা যে নেপালি ভাষায় কথা বলে তা বাংলার সাথে মিশে গিয়ে এক আঞ্চলিক উপভাষার রূপ নিয়েছে। যদিও লেখার ক্ষেত্রে তারা এখনও দেবনাগরী লিপি ব্যবহার করে। ধর্মে তারা সনাতনপন্থী এবং বাঙালি হিন্দুদের মতোই কালী, দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর আরাধনা করে। তবে তাদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সামাজিক প্রথা স্বতন্ত্র।
মনোজের ভাষ্যমতে, এমনকি আজকের নেপালের সাথেও তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অমিল রয়েছে। নেপালে কালক্রমে অনেক পরিবর্তন ও আধুনিকতা এসেছে। অথচ তারা ২০০ বছরেরও বেশি আগে পূর্বপুরুষদের আনা সেই প্রাচীন প্রথা ও নিয়মকানুনগুলোই এখানে সযত্নে ধরে রেখেছেন। তা সত্ত্বেও, নিত্যদিনের খাওয়া-দাওয়া এবং জীবনযাপনের দিক থেকে গুর্খারা এখন তাদের বাঙালি প্রতিবেশীদের সাথে পুরোপুরি মিশে গেছেন।
মনোজ বাহাদুর সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় নিজেদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে তিনি তার সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'সুরনিকেতন'-এ নেপালের আদিকবি ভানুভক্ত আচার্যের স্মরণে 'ভানু জয়ন্তী' পালন করেন। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জয়ন্তীও তিনি শ্রদ্ধার সাথে আয়োজন করে থাকেন।
বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের এই সঙ্গীতশিল্পী বাংলা, নেপালি ও চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় গান রচনা ও সুরারোপ করার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্যকর্ম নেপালি ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
নিজের সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মনোজ মৃদু স্বরে বলেন, 'আমরা আর বেশি কিছু প্রত্যাশা করি না। সত্যি বলতে, আজকের এই দুরবস্থার পেছনে আমাদের নিজেদের অবহেলাই বেশি দায়ী। তবে দেরিতে হলেও আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। হয়ত আমরা অনেকটা পিছিয়ে গেছি, তবুও আমি আশাবাদী যে আগামী প্রজন্ম এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে এবং আমাদের আত্মপরিচয়কে টিকিয়ে রাখবে।'
