২৫০ দিন সাগরে, খাদ্য-শৌচাগার সংকট, রণতরিতে ভেঙে পড়ছে মার্কিন সেনাদের মনোবল; উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে
২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরিতে হাজার হাজার সেনাসদস্য খাদ্য সংকট, নষ্ট শৌচাগার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন; হচ্ছেন তীব্র মানসিক অবসাদের শিকার। মানসিক সমস্যা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন একাধিক সেনা।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে পেন্টাগনের কাছে তাদের অবস্থা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর চাইছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। সেইসঙ্গে ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন তারা।
সামরিক বিষয়ক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ক্ষোভ ও হতাশায় রণতরি 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন'-এর কিছু নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন। এছাড়া নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা জাহাজে থাকা কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেন, রণতরির অবস্থা নিয়ে আসা প্রতিবেদনগুলো 'সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন' করা হয়েছে।
রণতরিটি গত বছরের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে রওনা দেয়; ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার আগে একে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। চলতি বছরের মে মাসে এর মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বারবার তা বাড়ানো হয়েছে। জাহাজটি কবে ফিরবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। তবে বৃহস্পতিবার একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এই রণতরিটিকে সরিয়ে সেখানে 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন' রণতরি মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হেগসেথকে দেওয়া এক চিঠিতে কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল প্রায় ৫ হাজার মানুষ থাকা ওই রণতরির বিভিন্ন কষ্টের কথা তুলে ধরেন: 'মৌলিক রসদের সংকট, পানি দূষণ, শৌচাগার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, জাহাজের ডেকে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ ও যোগাযোগে গোলযোগের কারণে জাহাজে পাঠানো পার্সেল পথেই মাসের পর মাস হারিয়ে গেছে।'
মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির এই ডেমোক্র্যাট সদস্য আরও লেখেন, 'এ প্রতিবেদনগুলোর দিকে অবিলম্বে নজর দেওয়া প্রয়োজন। তবে একইসাথে এগুলো একটি বড় প্রশ্নও তুলে ধরছে: মার্কিন নৌবাহিনী কি তাদের বিমানবাহী রণতরিগুলোর ওপর বর্তমানে যেভাবে টানা অপারেশনের চাপ দেওয়া হচ্ছে, তা বজায় রাখতে সক্ষম?'
সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালের সাথে সুর মিলিয়ে আরেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগো একটি কংগ্রেসীয় প্রতিনিধি দলকে ওই রণতরীতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, 'এই ভয়াবহ পরিস্থিতির ওপর যেন একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক তদন্ত চালানো যায়, তার জন্য তাদের যেতে দেওয়া উচিত।'
বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই মাসের শুরুর দিকে একজন নাবিক জাহাজ থেকে লাফ দেন। পরে হেলিকপ্টারের সাহায্যে তাকে উদ্ধার করে জাহাজের চিকিৎসা বিভাগে প্রাথমিক সেবা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য রণতরী থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়।
দ্য মিলিটারি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে জানায়, পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একাধিক সেনাসদস্য জাহাজ থেকে পানিতে লাফ দেওয়ার কথা ভেবেছেন। স্বজনরা জানান, দীর্ঘদিন টানা সমুদ্রে থাকা এবং জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি অনেক সেনাসদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজের এমন পরিস্থিতির মধ্যে আরও ছিল—এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাপড় ধোয়ার সুযোগ না থাকা এবং বন্দরে ভেড়ার কমে যাওয়ায় টাটকা খাবার না পাওয়া। তাছাড়া জাহাজ বন্দরে থামলেও সেনাসদস্যদের সবসময় বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।
ওই রণতরিতে থাকা এক নাবিকের আত্মীয় বিবিসিকে বলেন, মিশন শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের পরিবারের ওই সদস্য প্রায় ২৯ কেজি ওজন হারিয়েছেন।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শাস্তির আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তি বলেন, বেশ কয়েকজন নাবিক যে জাহাজ থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন তার ওই স্বজন।
সম্প্রতি ওই হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া মেসেজ বলেন, 'আমি ক্লান্ত। ভীষণ ক্লান্ত।'
ওই নাবিক আরও জানান, জাহাজের ইঞ্জিনের বিকট শব্দ ও অবিরাম যুদ্ধবিমান ওঠা-নামার কারণে সেখানে সার্বক্ষণিক আওয়াজ ও কম্পন হচ্ছে।
ওই নাবিকের স্বজন আরও বলেন, 'সে তার মিশন সম্পর্কে জানে, এবং এটাও বোঝে যে এটি কোনো আদর্শ বা আরামদায়ক পরিস্থিতি হতে যাচ্ছে না। এটা কোনো ছুটির সফর নয়। তাকে কী করতে হবে, তা সে ভালো করেই জানে। কিন্তু কোনো বন্দরে নোঙর না ফেলে, ডাঙায় পা না রেখে, বিশ্রাম ছাড়া টানা অবস্থান করা অত্যন্ত কঠিন। সারাক্ষণ একধরনের কম্পন হতে থাকে—সকালে, দুপুরে, রাতে, ঘুমানোর সময়, খাওয়ার সময়, এমনকি গোসলের সময়ও। এক মুহূর্তও স্বস্তিতে থাকা যায় না।'
জাহাজটিতে কর্মরত এক নাবিকের স্ত্রী অ্যানাবেল লোমা মিলিটারি টাইমসকে বলেন, রণতরি থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টার পর তার স্বামীকে বর্তমানে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
লোমা বলেন, 'ও ভীত। সে ভাবছে ওকে অসম্মানজনকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হবে। শুধু চরম ক্লান্তির কারণে ওর ১৩ বছরের ক্যারিয়ার এভাবেই শেষ হয়ে গেল।'
স্যান ডিয়েগোতে এ উদ্বেগ নিয়ে আলোচনার জন্য নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করা প্রতিনিধিদলের মধ্যে থাকা এক নারী বলেন, তার স্বামী মেসেজ পাঠিয়ে বলেছে, 'ও চায় আগামীকাল যেন আর ওর ঘুম না ভাঙে।'
এপ্রিলে মাসে জাহাজটিতে নিম্নমানের ও রেশনিং করা খাবারের ছবি প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।
এক ছবিতে দেখা যায়, আগে থেকে রান্না করা এক টুকরো জাইরোস, শনাক্ত করা যায় না এমন এক দলা বাদামি বস্তু ও কিছু সেদ্ধ গাজর। ওই খাবার নিয়ে উপহাস করে তিউনিসিয়ায় ইরানি দূতাবাস এক্সে লিখেছিল: 'ওএমজি, অবিশ্বাস্য!! হরমুজ প্রণালি খোলার জন্য ট্রাম্প তার সৈন্যদের এই খাবারই খাওয়াচ্ছেন।'
নিম্নমানের খাবারের পাশাপাশি নাবিকরা দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতিতেও রয়েছেন।
মেইডাসটাচ-এর সাথে শেয়ার করা একটি টেক্সট বার্তায় এক নাবিক দুধ ছাড়া সিরিয়ালের ছবি দিয়ে পরিস্থিতির বাস্তবতা তুলে ধরে লেখেন: 'আমি এখন সিরিয়াল খাচ্ছি। যদিও একটু দুধ থাকলে ভালো হতো। গত তিন মাস ধরে কোনো দুধ পাইনি।'
দুধ কেন পাওয়া যাচ্ছে না জানতে চাইলে ওই নাবিক বলেন, পচনশীল খাবার সরবরাহ করতে অনেক সময় লাগছে। আসতে আসতে প্রায়ই খাবার পচে যাচ্ছে।
ওই নাবিক আরও বলেন, 'নৌবাহিনীর এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের কাছে মিশন সবসময়ই আগে আসবে।'
বিপজ্জনক পরিবেশে কোনো বিরতি ছাড়া দীর্ঘ সময় কাজ করা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ওই রণতরিতে কর্মরত এক নাবিকের বাবা ও নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য ব্রেট স্নো বলেন: 'এটি এমনিতেই বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। তার ওপর এখন সেখানে কোনো বিরতি ছাড়া দিনের পর দিন ভয়ানক পরিশ্রম করানো হচ্ছে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।'
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন এক্সে সমস্যাগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরে লেখেন: 'ছত্রাক জমে থাকা গোসলখানা, ভাঙা টয়লেট, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা বন্ধ, দীর্ঘ সময় ধরে গরম পানি না থাকা, এবং কেবল আধা কাপ ভাত ও দুটি রুটি দিয়ে সেরে নেওয়া এক বেলার খাবার। এছাড়া সাবান, ডিওডোরেন্ট কিংবা টুথপেস্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র অভাবও আছে।'
মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, জাহাজে আত্মহত্যা করার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বৃদ্ধির তথ্য তারা পাননি। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে তাদের 'প্রথাগত রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলো ব্যাহত হয়েছিল'।
নৌবাহিনী বর্তমানে রণতরিটিতে মিশনের জন্য 'অতি জরুরি রসদ' পৌঁছানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বুধবার এক কর্মকর্তা বলেন, 'প্রথমত খাবার, তারপর পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী, তারপর চিঠিপত্র। জাহাজ থেকে আসা বর্তমান খবরগুলোতে বিশুদ্ধ পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, সচল এসি ও স্বাস্থ্যকর খাবার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।'
বৃহস্পতিবার পানামায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে হেগসেথ বলেন, 'সরকার নিশ্চিত করে প্রতিটি জাহাজ, প্রত্যেক ক্রু ও প্রত্যেক ক্যাপ্টেনকে যেন প্রতিটি মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব সুবিধা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেওয়া হয়।'
তিনি আরও বলেন, 'কিছু মিশনের মেয়াদ অন্যগুলোর চেয়ে দীর্ঘ হয়, আর ওইসব নাবিকদের প্রতি আমার মনে অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে বেশি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে।।'
রণতরির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্পের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্প ও হেগসেথ দুজনেরই সামরিক বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও রসেদে সুসজ্জিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
স্টার্স অ্যান্ড স্ট্রাইপসের তথ্যমতে, অতীতে দীর্ঘদিন সমুদ্রে অবস্থানের সময় নৌবাহিনী সেনাদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল—যার মধ্যে ছিল বিঙ্গো খেলা, চিত্রাঙ্কন সেশন ও গান গাওয়ার প্রতিযোগিতা।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে কর্মরত সেনাসদস্যরাই সবচেয়ে বেশি 'গুরুতর মানসিক কষ্টে' ভোগেন।
ওই গবেষণায় মানসিক কষ্টের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে 'বসবাস বা জীবনযাত্রার নিম্নমান, অবিরাম বিকট শব্দ ও অতিরিক্ত কাজের চাপ, যার ফলে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের সময় না পাওয়া'।
এদিকে ইউএসএনআই নিউজের সামরিক তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনী ও মেরিন কোরের সদস্যদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। এছাড়া ভেটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সাধারণ নাগরিক সেনাবাহিনীতে কাজ করেননি, তাদের তুলনায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি।
