ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের মানসিক চাপে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা নাবিকদের
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রেকর্ড সময় সমুদ্রে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তীব্র হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাবিকদের পরিবার ও কংগ্রেস সদস্যরা। জাহাজটির প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন টানা নয় মাস ধরে সমুদ্রে রয়েছেন। আধুনিক সময়ে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জন্য এটি দীর্ঘতম সমুদ্রযাত্রা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামারিক বিষয়ভিত্তিক দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা 'নেভি টাইমস' এবং 'স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস' রিপোর্ট করেছে যে, লিংকন যুদ্ধজাহাজে অত্যন্ত নিম্নমানের জীবনযাত্রা এবং মানসিক চাপ সহ্যসীমা পেরিয়ে যাওয়ার জেরে বেশ কয়েকজন নৌসেনা সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এই যুদ্ধজাহাজের ক্রু বা আরোহীরা বর্তমানে সমুদ্রে তাদের নবম মাস পার করছেন এবং টানা ২৫০ দিন মাটিতে পা না দিয়ে সাগরে অবস্থান করছেন—যা আধুনিক যুগে একটি বিমানবাহী রণতরীর বা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের জন্য একটি অনন্য রেকর্ড।
স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সান ডিয়েগোতে নৌবাহিনীর নেতাদের সাথে আয়োজিত এক আবেগঘন টাউন হল মিটিংয়ে বা যৌথ সভায় লিংকনে থাকা প্রিয়জনদের নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। প্রায় ২০০ জন পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে এক নৌসেনার স্ত্রী জানান, তার স্বামী ওই দিন তাঁকে টেক্সট করে বলেছেন যে, 'তিনি আশা করেন কাল যেন তার আর ঘুম না ভাঙে।'
পরিবারগুলোর এই গভীর উদ্বেগ সরাসরি নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে ভারপ্রাপ্ত নৌ-সচিব হাং কাও এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকে এক নারী কাওকে সরাসরি বলেন যে, নৌবাহিনী 'আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যে থাকা বিশ্বাসের সম্পর্কটি ভেঙে দিয়েছে।'
নেভি টাইমস এই বিমানবাহী রণতরীতে চলমান মোতায়েনের সময় ব্যর্থ হওয়া কয়েকটি আত্মহত্যার চেষ্টার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। অ্যানাবেল লোমা নামক এক নারী পত্রিকাটিকে বলেন, পিআর বা সমুদ্রে থাকার মেয়াদ বারবার বাড়ানোর কারণে তার স্বামী লিংকন থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি বলেন, 'সে ভীত। সে ভাবছে তাকে অসম্মানজনকভাবে বরখাস্ত করা হবে, এবং স্রেফ সে ক্লান্ত বা বার্নআউট হয়ে পড়ার কারণে তার ১৩ বছরের ক্যারিয়ার নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যাবে।'
পত্রিকাটিতে আরেক নৌসেনার স্ত্রীর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তার স্বামী লিংকনে ঘটে যাওয়া আরেকটি পৃথক ঘটনায় এক সহকর্মীকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে রক্ষা করেছেন এবং তাকে ধরে ডেকে ফিরিয়ে এনেছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন এই যুদ্ধজাহাজের শোচনীয় পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহারের পঞ্চম মাসে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি ক্রু বা আরোহীদের দুর্দশার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, 'ছত্রাকযুক্ত শাওয়ার, ভাঙা টয়লেট, কয়েক সপ্তাহ ধরে লন্ড্রি বন্ধ থাকা, দীর্ঘ সময় ধরে গরম পানি না থাকা, এবং খাবারের পরিমাণ কমে মাত্র আধা কাপ চাল বা ভাত এবং দুটি টরটিলাস-তে নেমে আসা। কোনো সাবান, ডিওডোরেন্ট বা টুথপেস্টও নেই।'
আফগানিস্তান ও ইরাকে দায়িত্ব পালন করা সাবেক আর্মি রেঞ্জার এবং কলোরাডোর ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো সতর্ক করে বলেছেন যে, লিংকনের সৈন্য ও তাদের পরিবারের ওপর এই মানসিক চাপ 'সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে বাড়ছে।'
এই বর্তমান সংকট মূলত কয়েক মাস ধরেই তৈরি হচ্ছিল। গত ২১ নভেম্বর যুদ্ধজাহাজটি সান ডিয়েগো ছেড়েছিল এবং মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের উদ্দেশে রওনা হলেও ইরানের সাথে যুদ্ধ
শুরু হওয়ার পর এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।
এরপর থেকে, ৫ হাজারেরও বেশি ক্রু সদস্য মাটিতে থাকার জন্য মাত্র দুটি দিন পেয়েছেন—গত ডিসেম্বরে গুয়ামে এবং জুলাইয়ে ওমানে। এই মোতায়েনটি মূলত গত মে মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু চলমান যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে কয়েকবার এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
এর আগে গত এপ্রিলে এই রণতরীর শোচনীয় পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র জনসমালোচনা তৈরি হয়েছিল। নিম্নমানের ও রেশন করা খাবারের ছবি প্রকাশ্যে এসেছিল এবং পানি সংকট, ছত্রাকযুক্ত শাওয়ার ও লন্ড্রি মেশিন নষ্ট থাকার খবর পাওয়া গিয়েছিল।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই বিবরণগুলোকে 'ভুয়া খবর' বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
হেগসেথের এই মন্তব্যের তীব্র জবাব দিয়ে কংগ্রেস সদস্য লেভিন চলতি সপ্তাহে বলেন, 'এই পুরুষ ও নারীরা দেশের সেবা করার জন্য যোগ দিয়েছেন। তাদের দেশের কাছে তাদের ন্যূনতম পাওনা হলো গরম পানি, একটি সচল টয়লেট এবং এক বেলা ভালো খাবার। হেগসেথ সেটিও করতে পারছেন না, অথচ তিনি তাদের পরিবারের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের মিথ্যাবাদী বলার সাহস দেখাচ্ছেন।'
এ বিষয়ে জানতে মার্কিন নৌবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করেছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'। পরে এক নৌ-কর্মকর্তা জানান, তারা সচেতন আছেন যে 'দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন আমাদের সেনাসদস্য এবং তাদের পরিবারের ওপর বড় ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং আমরা তাদের সহনশীলতা ও আত্মত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞ।'
ওই কর্মকর্তা দাবি করেন যে, প্রতিটি লিংকন নৌসেনার স্বাস্থ্য ও মঙ্গল নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার: 'কমান্ডের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে, আমরা বাউন্সার বা অন্য কোনো উপায়ে আমরা জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার কোনো বৃদ্ধি বা অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করিনি।'
তিনি আরও জানান, একটি 'বিস্তৃত সহায়তা নেটওয়ার্ক'-এর অংশ হিসেবে ধর্মীয়, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা নিয়োজিত রয়েছেন, যার মধ্যে 'জাহাজে মোতায়েন থাকা কাউন্সিলর এবং চ্যাপ্লিন (ধর্মীয় শিক্ষক)' অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে যুদ্ধ প্রথাগত সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে, তবে তিনি যোগ করেন যে 'জাহাজ থেকে পাওয়া বর্তমান রিপোর্টগুলো পরিষ্কার পানি, সচল এসি এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের অবিরাম সুবিধা নিশ্চিত করছে।'
অবশ্য সক্রিয় মার্কিন নৌসেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জের বিষয়টি বেশ সুপরিচিত। গত বছরের একটি গবেষণায় মোতায়েনকৃত নৌসেনাদের মুখোমুখি হওয়া অনন্য মানসিক চাপের কারণগুলো খতিয়ে দেখা হয়েছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ছিল উচ্চ শব্দ, বিশ্রামের অভাব এবং অপর্যাপ্ত মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা।
গবেষকেরা মোতায়েনকৃত নৌসেনাদের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে দেখতে পান যে, প্রায় অর্ধেক নৌসেনা অভিযোগ করেছেন যে তারা সাগরে মানসিক চাপ সামাল দিতে পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না। গবেষণাটির উপসংহারে বলা হয়েছে, 'নৌবাহিনীসহ সামগ্রিক সামরিক বাহিনীতে আত্মহত্যার উচ্চ হার বিবেচনায় নিয়ে, জাহাজগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ উন্নত করার প্রচেষ্টা জরুরিভাবে প্রয়োজন।'
