ন্যাটো সম্মেলনের কাছে এক ব্যক্তিকে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ দেখে গোপনে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প
ন্যাটো সম্মেলনের কাছাকাছি এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে ঘুরতে দেখার পরই গোপনে উড়োজাহাজ বদলে তুরস্ক ছাড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
দুজন কর্মকর্তা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, মার্কিন গোয়েন্দারা একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানতে পারেন, ইরানের পক্ষ থেকে এয়ার ফোর্স ওয়ানের ওপর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য (সারফেস-টু-এয়ার) ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার হুমকি রয়েছে। এরপরই ট্রাম্পকে তড়িঘড়ি একটি সামরিক বিমানে তুলে তুরস্ক ছাড়ে সিক্রেট সার্ভিস।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আঙ্কারায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির পাশাপাশি ইরানি গোয়েন্দারা জানতেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট শহরের ঠিক কোথায় অবস্থান করছেন। এমনকি তিনি ভবনের কোন তলায় আছেন, সে তথ্যও তাদের কাছে ছিল।
এসব হুমকির কারণে রিকল্পিত কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ট্রাম্পকে বিমানবন্দরের একটি খাবার সরবরাহকারী লরিতে লুকিয়ে অত্যন্ত গোপনে একটি সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
আর এ কাজে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয় ট্রাম্পের ব্যবহৃত এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটিকে। এটি হোয়াইট হাউসের সাংবাদিক দল ও শীর্ষ সহযোগীদের নিয়ে ইউরোপের আকাশসীমা পাড়ি দেয়। যাত্রীরা জানতে পারেননি যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিমানে নেই।
মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো ইরানের ভয়ে গোপনে তুরস্ক থেকে চলে আসা প্রসঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের পরামর্শ মেনে চলছিলেন। 'ওরা যা বলেছে, আমি কেবল সেটাই করেছি,' বলেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের দাবি, সাংবাদিকদের নিয়ে উড়ে যাওয়া টোপ হিসেবে ব্যবহৃত বিমানের চেয়ে গোপনে যে সামরিক বিমানে তিনি উঠেছিলেন, সেটি বেশি 'ঝুঁকিপূর্ণ' অবস্থায় ছিল।
যেভাবে ঘটেছে পুরো ঘটনা
৮ জুলাই টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে প্রকাশ্যে নীল-সাদা বোয়িং ৭৪৭ বিমানের মূল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন ট্রাম্প। ভেতরে প্রবেশের আগে উপস্থিত মানুষদের উদ্দেশে হাতও নাড়েন।
এর কয়েক মিনিট পরেই বিমানের উল্টো দিক দিয়ে ট্রাম্প ও তার কয়েকজন শীর্ষ সহযোগী একটি উঁচু খাবারের লরিতে প্রবেশ করেন। এই লরিগুলো বিমানের ভেতরে যাত্রীদের খাবার তোলার কাজে ব্যবহৃত হয়।
এরপর লরির কনটেইনার নিচে নামিয়ে টারমাক পেরিয়ে সেটিকে অপেক্ষারত মার্কিন বিমানবাহিনীর সি-৩২এ বিমানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এটি একটি মডিফায়েড বোয়িং ৭৫৭। বিমানটি সাধারণ সামরিক কল সাইন 'রিচ ১৮' ব্যবহার করে উড্ডয়ন করছিল; আর রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে এর প্রাইমারি ট্র্যাকিং ট্রান্সপন্ডারগুলোও বন্ধ ছিল।
এদিকে হোয়াইট হাউসের কর্মী ও সাংবাদিকরা স্বাভাবিকভাবে টোপ হিসেবে রাখা ওই বিমানে আরোহণ করেন। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিলমোহরযুক্ত মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে তাদের স্বাগত জানানো হয়।
মাঝ-আকাশে টোপ হিসেবে ব্যবহৃত বিমানটি তার ট্রান্সপন্ডার চালু করে এবং 'এএফ১' কল সাইন সম্প্রচার করতে শুরু করে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান থেকে সবার মনোযোগ সরিয়ে নিতেই এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল।
বিমানে ওঠার পর সাংবাদিকদের বারবার জানালার পর্দা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বিমান পরিবর্তন করছেন, তা যেন তারা দেখতে না পান, সেটি নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
রাত ১০টা ২০ মিনিটে গোপন সি-৩২এ ফ্লাইটটি সাফোক-এর আরএএফ মিলডেনহল-এ অবতরণ করে। টারমাকে বেরিয়ে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটির কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের খানিক আগে ট্রাম্পকে গোপনে আবার মূল প্রেসিডেন্সিয়াল ৭৪৭ বিমানে স্থানান্তর করা হয়।
জানালার পর্দা টেনে রাখার কারণ নিয়ে পরে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, 'কারণ আপনারা হয়তো অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা ফ্লাইটে ছিলেন। আমাদের যে ধরনের নোংরা প্রকৃতির লোকদের মোকাবিলা করতে হয়, তার কারণেই এই সতর্কতা।'
সাংবাদিকদের 'টোপ' বানানোর অভিযোগ
মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, সিক্রেট সার্ভিসের প্রত্যক্ষ পরামর্শেই বিমান পরিবর্তনের এই ঘটনা ঘটেছিল।
এ হুমকির বিষয়ে গোয়েন্দা সতর্কবার্তার বিস্তারিত তথ্য কংগ্রেসের সিনিয়র সদস্য ও হোয়াইট হাউসের বেশিরভাগ কর্মীর কাছেও গোপন রাখা হয়েছিল।
তবে সম্ভাব্য বিপজ্জনক একটি বিমানে সাংবাদিকদের রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট মার্ক শোয়েফ জুনিয়র দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, 'সাংবাদিকরা কোনো টোপ নন। বাস্তব হুমকির মুখে নিরাপত্তাজনিত গোপন কৌশলের অংশ হিসেবে সাংবাদিকদের যদি না জানিয়েই কোনো বিমানে ফেলে রাখা হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আদৌ ঠিকমতো বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।'
বারাক ওবামার সাবেক উপদেষ্টা ডেভিড অ্যাক্সেলরড বলেন, 'ভাবতেও অবাক লাগে, [নিয়মিত] বিমানে থাকা সবাই ছিলেন একধরনের টোপের মতো। প্রেসিডেন্ট যে বিমানে নেই, সে কথাও তাদের বলা হয়নি। এমনকি তিনি নিরাপদে ওয়াশিংটনে ফিরে আসার পরও এই প্রতারণা অব্যাহত রাখা হয়েছিল।'
গত বছর কাতারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমান হস্তান্তর করে। এই নিরাপত্তা অভিযান ওই বিমান ঘিরে তৈরি হওয়া উদ্বেগকেও সামনে এনেছে।
কাতারের দেওয়া ওই জেটে চড়েই আঙ্কারায় গিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ফেরার সময় সেটি ব্যবহার করেননি। পুরোনো প্রেসিডেন্সিয়াল বিমানের তুলনায় এই বিমানের মিসাইল প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে—এমন আশঙ্কার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
বিমান পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেছিলেন, 'পুরোনো দিনের স্মৃতির টানে' তিনি পুরোনো ৭৪৭-এ চড়ে ফিরছেন। যদিও পরে তিনি নিশ্চিত করেন, ওই দুই জেটের কোনোটি করেই তিনি আঙ্কারা ছাড়েননি।
এ অভিযানের সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চ্যাং বলেন, 'প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমনটা বলেছেন—আমেরিকার অগণিত শত্রুর চোখ এখন তার ওপর। আর সেই হুমকি বানচাল করতে আমরা হাতের কাছে থাকা প্রতিটি কৌশলই প্রয়োগ করব—সেটি নজর অন্যদিকে ঘোরানো কিংবা শত্রুকে ভুল পথে চালিত করা, যা-ই হোক না কেন।'
