ইরান ‘ভীষণ শয়তান’, ওদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকাতে জ্বালানির ‘বাড়তি দাম’ মেনে নেওয়াই যায়: ট্রাম্প
একদিকে তেহরানকে 'ভীষণ শয়তান' আখ্যা দিয়ে যুদ্ধের জেরে জ্বালানির চড়া দাম মেনে নিতে দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে ওয়াশিংটনকে পরাজয় স্বীকার করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান।
২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েলের শুরু করা এই সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি কিংবা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল—দুটোই পুরোপুরি স্থবির।
শনিবার এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, 'এই প্রণালি খোলা বা বন্ধ করার নিয়ন্ত্রণ কেবল ইরানের হাতেই থাকবে। যতদিন না আপনারা পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন এবং অলীক কল্পনায় বিভোর থাকা বন্ধ করছেন, ততদিন ইরান এই অবরোধ অব্যাহত রাখবে।'
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেননি। শনিবার প্রকাশিত ইরানি সংবাদমাধ্যম শাহারারা নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, সেখানে জাহাজ চলাচল ফের শুরু করতে হলে ওয়াশিংটনকে অবশ্যই প্রণালি-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলাকালীন মার্কিন জনগণকে কিছুটা বাড়তি দামে গ্যাসোলিন কেনার বাস্তবতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প।
শুক্রবার নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে তিনি বলেন, 'ভীষণ শয়তান একটি দেশ' যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে, তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে 'গ্যাসোলিনের পেছনে সামান্য কিছু বাড়তি ডলার খরচ' মেনে নেওয়াই যায়। যুদ্ধ শুরুর পেছনে একেই অন্যতম যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪.০৮ ডলার—যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। এই মূল্যবৃদ্ধি দেশটিতে মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারণায় জ্বালানি খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন আসন্ন নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনে যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক ধাক্কাকেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু করতে চাইছে ডেমোক্র্যাটরা।
শুক্রবার ক্রুড তেলের ফিউচারস ব্যারেলপ্রতি ১ ডলার বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক সপ্তাহে বেড়েছে ৬.০ শতাংশ ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটেরদর বেড়েছে ৫.৪ শতাংশ।
গারিবাবাদি তিনি আরও বলেছেন, 'টুইট করে, বিমানবাহী রণতরি পাঠিয়ে, সরকারি আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনি মঞ্চ কাঁপিয়ে হরমুজ প্রণালি দখল করা যায় না।'
তবে ইরানের অনমনীয় সুরের আড়ালেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষত তেহরানের গায়েও দাগ কাটার লক্ষণ দেখা গেছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের চড়া মূল্যস্ফীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ ও তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞাই এই অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ।
ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতি আর বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট জানান, আগামী সপ্তাহেই ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা আসছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে তেহরান বলছে 'অবরোধ'—যে শব্দটি ব্যবহার করে ওয়াশিংটন ইরানি জাহাজগুলোকে বন্দর ছাড়তে দিচ্ছে না।
ট্রাম্প বলেছেন, 'আমরা শুধু নিজেদের জন্যই নয়, পুরো বিশ্বের জন্য মহৎ একটা কাজ করছি...আর সত্যি বলতে, আমরা দারুণ এগোচ্ছি।'
জাহাজ চলাচলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুক্রবার হরমুজ দিয়ে মাত্র দুটি জাহাজ পার হয়েছে; সেগুলোতেও অপরিশোধিত তেলের কোনো চালান দেখা যায়নি। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে কিছু জাহাজ গোপনে প্রণালি পার হতে আপ্রে; তবে সেই সংখ্যা যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে পার হওয়া ১৩০টির বেশি জাহাজের ধারেকাছেও নেই।
এদিকে যুদ্ধ থামাতে জুনে যে সম্ভাব্য চুক্তির আভাস মিলেছিল, তা এখন ভেস্তে গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির বলেছেন, 'প্রথমত, এমন কোনো যুদ্ধবিরতি ছিল না যার মেয়াদ আমরা এখন বাড়াতে চাইব। আমাদের লক্ষ্য ছিল "যুদ্ধের সমাপ্তি", আর এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।'
