হুথিদের ওপর বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব; সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা পাঠিয়েছে পাকিস্তান
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। এ অভিযানের কৌশল হিসেবে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলের রুট সুরক্ষিত করতে উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালানো, কিংবা একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে আক্রমণ করার মতো বিকল্পগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা। এছাড়া পাকিস্তান সৌদির জন্য সামরিক সরঞ্জামের পাশাপাশি সেনাও পাঠিয়েছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই অভিযান শুরু হতে পারে। এ প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত ৬ জন ব্যক্তি জানিয়েছেন, রিয়াদের তত্ত্বাবধানে ইয়েমেনি বাহিনীর নেতৃত্বেই এই স্থল অভিযান চালানো হবে। এতে বিমান হামলা চালিয়ে সহায়তা দেবে সৌদি আরব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তিরা জানান, ইয়েমেনে রিয়াদের এ অভিযানে সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। এর পাশাপাশি কিছু আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে সম্মুখ সমরে সৌদির মিত্রদের সরাসরি অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই।
২০১৫ সালে প্রতিবেশী ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। সে সময় তারা হুথিদের হাতে রাজধানী সানা থেকে বিতাড়িত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে গঠিত আরব জোটের নেতৃত্ব দেয়। ২০২২ সালে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, যা এ বছর পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই টিকে ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের জেরে হুথিরা সৌদি আরবের জাহাজ চলাচল ও তেল-অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করলে পরিস্থিতির অবনতি হয়। গত মাসে হুথিরা উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
সৌদির পরিকল্পিত অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হুথিদের সেই অগ্রগতি প্রতিহত করে এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা।
হামলার জন্য সম্ভাব্য দুটি বিকল্প বিবেচনা করছে সৌদি আরব। প্রথমটি হলো, শুধু বাব আল-মান্দেব ও আশপাশের অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট আক্রমণ চালানো। দ্বিতীয় বিকল্প হলো, বিস্তৃত অভিযান পরিচালনা করা—যার অংশ হিসেবে ইয়েমেনের আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশে একাধিক ফ্রন্টে সমন্বিত আক্রমণ চালানো হবে।
কর্মকর্তারা সবাই জানান, অভিযানের পরিধি ভিত্তিতে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সৈন্যকে মোতায়েন করা হতে পারে।
এই পরিকল্পনা সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে সৌদি ও ইয়েমেনি সরকার, হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।
ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যকার অন্যতম প্রধান নৌরুট বাব আল-মান্দেব হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ নির্গমন পথ। ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় বিকল্প পথ হিসেবে চলতি বছর বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও অনেক বেড়ে গেছে।
পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় কর্মকর্তারা বলছেন, রিয়াদ মনে করছে, বাব আল-মান্দেবকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রেখে তাদের সঙ্গে ইয়েমেন বিষয়ক নতুন কোনো শান্তি আলোচনায় বসা সম্ভব নয়। কারণ এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের বৈশ্বিক অঙ্গনে বড় প্রভাব বিস্তারের সুবিধা দিচ্ছে।
সৌদি আরবের এই সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত ছয়জন ব্যক্তি অভিযান শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি। তবে তাদের ধারণা, আগামী এক সপ্তাহ থেকে নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত যেকোনো সময়ে এটি শুরু হতে পারে।
সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, তিনি ধারণা করছেন, অভিযানটি হবে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকেন্দ্রিক এবং বেশ সীমিত। 'সৌদি আরব হুথিদের পুরোপুরি পরাস্ত করতে যতটা আগ্রহী, তাদের জন্য তার চেয়েও জরুরি হলো বাব আল-মান্দেব উপকূল হুথিদের দখলে যাওয়ার আগের স্থিতাবস্থায় ফিরে যাওয়া।'
গত তিন বছরে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি কমে যাওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে হুথিরাই ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য মিত্রে পরিণত হয়েছে।
এদিকে একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেছেন, সৌদির সবচেয়ে ক্ষমতাধর মিত্র ওয়াশিংটন দেশটিকে ইয়েমেনে বিমান হামলায় সহায়তা দিতে সামরিক উপদেষ্টা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে।
তবে এই সহায়তার পরিধি সীমিত হতে পারে। রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, বিমান হামলার মতো সরাসরি সামরিক সহায়তার বিষয়ে সৌদির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
কার্গো বিমানে করে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে পাকিস্তান, পাঠিয়েছে সেনা
গত মাসে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করা তুরস্ক ও পাকিস্তান দেশটিকে বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। সেসব সরঞ্জাম রিয়াদ এখন ইয়েমেনে ব্যবহার করছে বলে পাকিস্তানি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পাকিস্তানের একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, গত মাসে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের কেন্দ্রস্থল এডেনে চারটি কার্গো বিমানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে পাকিস্তান। এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন-বিধ্বংসী ব্যবস্থা।
আরেকজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় কর্মকর্তা ও একজন পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তা করতে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও মাঠে থেকে সৌদি উপদেষ্টাদের সঙ্গে কাজ করছেন। বর্তমান যুদ্ধের আগেই সৌদি আরবের কেনা তুরস্কের ড্রোনও ইয়েমেনের আকাশে মোতায়েন করা হয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের তেল স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো রক্ষা। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানান, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার জন্য রিয়াদ ইতিমধ্যে কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে সাহায্য চেয়েছে।
দ্বিতীয় পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরবের স্থল সীমান্ত রক্ষায় এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সহায়তা করতে দেশটিতে ৩০-৪০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। গত বছর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পরও দফায় দফায় ওই সৈন্যরা সৌদিতে পৌঁছেছে।
তবে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য সেনা পাঠানোর বিষয়ে ইসলামাবাদ এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
রিয়াদকে সামরিক সহায়তার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাড়া দেয়নি।
এদিকে লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় সাহায্য করার জন্য সৌদি আরবে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরে যেকোনো ধরনের স্থল অভিযান ইয়েমেনি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত এক ভিন্নধর্মী জোটের ওপর নির্ভর করবে। গৃহযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে যখন সংঘাত রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থায় পৌঁছেছিল, তখন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।
ইয়েমেন বিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশা বলেন, 'হুথিদের মতো সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনীকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য যে ধরনের ধারাবাহিক অভিযানের প্রয়োজন, অনেক হুথি-বিরোধী বাহিনী এখনও তার জন্য সুসংগঠিত বা প্রস্তুত নয়। হুথিরা যখন একযোগে একাধিক ফ্রন্টে চাপ প্রয়োগ করছে, তখন এই বাহিনীগুলোর আসল পরীক্ষা চলছে।'
গত শীতকালে ইয়েমেনি বাহিনীগুলো আরও বেশি বিভক্ত হয়ে পড়ে। সে সময় আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট দক্ষিণাঞ্চলীয় যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকা দখলের চেষ্টা করে এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। তবে ধারাবাহিক কিছু সংঘর্ষের পর সৌদি-সমর্থিত যোদ্ধাদের কাছে তারা পরাজিত হয়।
সৌদি সরকারের নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবি সতর্ক করে বলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদির যেকোনো অভিযানের ফলাফল স্থল বাহিনীর পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করবে।
