ট্রাম্পের কাছে গোপনে ফ্লাইট বদল ছিল চমকপ্রদ এক কৌশল, পুতিনের কাছে তা ‘মামুলি ব্যাপার’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'এয়ার ফোর্স ওয়ান' (মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমান) নিয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা ছিল সরকারি ধোঁকার এক চমকপ্রদ ঘটনা। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে থাকা গোপনীয়তার কাছে এটি কিছুই নয়।
পুতিনের কর্মকাণ্ড এতটাই রহস্যে ঘেরা যে, সাংবাদিকরা এমনকি তার কার্যালয়ের গাছের পাতা শুকিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখেই তার খবরাখবর জানার চেষ্টা করেছেন।
চলতি বছরে রুশ রাষ্ট্রপ্রধানের প্রচার করা বৈঠকগুলো আসলেই ক্রেমলিনের দাবি করা সময়ে হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতেই কিছু সাংবাদিক এই পথ বেছে নিয়েছিলেন।
পুতিনের ঘরের টবের গাছের পাতা শুকিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে তা আবার সতেজ হয়ে ওঠার চিত্র দেখে বোঝা গেছে, বৈঠকগুলো বাস্তবে আলাদা সময়ে এবং অন্য কোনো দিনে হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট পুতিনের জন্য এ ধরনের ছলচাতুরি বা গোপনীয়তা একেবারেই সাধারণ ঘটনা। অন্যদিকে, গত মাসে তুরস্কের রানওয়েতে ট্রাম্পের গোপনে বিমান বদল করার বিষয়টি গোপন রাখার কারণে হোয়াইট হাউসের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে—বিশেষ করে এই সপ্তাহে 'দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট' খবরটি ফাঁস করার পর।
রুশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিন বলেন, 'রাশিয়ার অভিজ্ঞতার তুলনায় এগুলো কেবল বাচ্চাদের খেলা।'
মিখাইল রুবিন ও অন্যান্য সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রেসিডেন্ট পুতিন তার প্রতিটি বাসভবনে প্রায় একই রকম অফিস কক্ষ তৈরি করে রেখেছেন, যাতে ভিডিও দেখে তিনি আসলে কোথায় আছেন তা ধরা না যায়। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও স্যাটেলাইট ছবি অনুযায়ী, তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তার জন্য একটি বিশেষ প্রেসিডেন্সিয়াল ট্রেন তৈরি করেছে। সেই সাথে তার অন্তত তিনটি গ্রাম্য বাসভবনের কাছে গোপন রেললাইন ও গোপন স্টেশনও বানিয়ে রাখা হয়েছে।
এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও বাধ্য হয়ে এতে তাল মিলিয়ে চলেন। পুতিনের সঙ্গে তাদের বৈঠকগুলো টিভিতে সম্প্রচার না হওয়া পর্যন্ত (কখনো কখনো সপ্তাহখানেক পরেও হতে পারে) তারা তা গোপনে রাখেন এবং পরে ভান করেন যেন বৈঠকটি কেবল সেদিনই অনুষ্ঠিত হলো।
নির্বাসনে থেকে ক্রেমলিনের ওপর খবর সংগ্রাহক রুশ সাংবাদিক ফারিদা রুস্তামোভা বলেন, রাশিয়ায় প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি বা অবস্থান নিয়ে এমন সরকারি মিথ্যাচার "অতি সাধারণ বিষয়"। তিনি প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন, পুতিনের টিভিতে দেখা যাওয়া বৈঠকের আলোচনাকারীরা মাঝে মাঝে বহু পুরোনো ঘটনার কথা বলেন। অন্তত একটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুতিনের পোশাক ও চুলের কাটিং তার অন্যান্য প্রকাশ্য উপস্থানের সঙ্গে একদমই মিলছিল না।
রুশ সাংবাদিকদের কাছে এই ধরনের দেরিতে প্রচারিত পুতিনের ভিডিও মিটিংগুলোর একটি বিশেষ পরিভাষাও আছে: কনসার্ভি , যার বাংলা অর্থ "টিনজাত বা কৌটাবন্দী খাবার"।
ক্রেমলিন অবশ্য এর আগেও পুতিনের অবস্থান নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
অ্যান্টন ত্রয়ানোভস্কি বলেন, 'নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর মস্কো প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সময় ২০২১ সালে আমি যখন 'লেক ভালদাই'-এ পুতিনের বাসভবন পরিদর্শনে যাই, তখনই বুঝতে পারি তিনি নিজের চলাচল গোপন রাখতে কতটা চরম পথ অবলম্বন করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা আমাকে একটি নতুন ও রহস্যময় রেললাইনের কথা জানান, যা পুতিনের কমপাউন্ডের দিকে তৈরি করা হয়েছে। উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে হেলিপ্যাডসহ একটি নতুন রেল স্টেশন দেখা যায়, যার উল্লেখ সময়সূচি বা ট্রেনের মানচিত্রে ছিল না।
২০২৩ সালে রাশিয়ার সিক্রেট সার্ভিস বা নিরাপত্তা সংস্থা এফএসও থেকে পালিয়ে আসা এক প্রাক্তন কর্মকর্তা দাবি করেন যে, ট্র্যাকিং বা নজরদারি এড়াতেই মূলত প্রেসিডেন্ট পুতিন বিমানে না চড়ে ট্রেনে যাতায়াত করছেন।
ফাঁস হওয়া নথিপত্র থেকে জানা যায়, সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো দেখতে হলেও একটি বিশেষ ও গোপন সাঁজোয়া ট্রেন পুতিনের প্রেসিডেন্সিয়াল অফিসের জন্য সাজানো হয়েছিল। জিম, স্পা এবং বিশেষ যোগাযোগ যন্ত্রপাতিতে সুসজ্জিত এই ট্রেনটি পুতিন নিজেই ব্যবহার করতেন।
করোনার সময় প্রেসিডেন্ট পুতিনের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়ে আতিশয্য আরও বেড়ে যায় বলে মনে হয়। সে সময় তার সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি কর্মকর্তাদের দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনে থাকতে বাধ্য করতেন এবং তার এই একা থাকার সুযোগে তার অবস্থান গোপন রাখা আরও সহজ হয়ে ওঠে।
আর ২০২২ সালে ইউক্রেনে তার আক্রমণের পর থেকে এই গোপনীয়তা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে—বিশেষ করে ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো রাশিয়ার ভেতরে বহু দূর পর্যন্ত উড়ে আসার পর, যা মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করতে ভূমিকা রাখে এবং খবরে বলা অনুযায়ী তার যাতায়াত ও ভ্রমণকে আরও সীমিত করে ফেলে।
সাংবাদিক ফারিদা রুস্তামোভা এমনটাই জানিয়েছেন, মস্কোতে এখন এমনই গুঞ্জন রয়েছে যে, শহরের রাস্তা দিয়ে সাইরেন বাজিয়ে ট্রাফিকের মধ্যে দিয়ে ছুটে যাওয়া বিশালাকার যে কনভয় বা গাড়িবহরকে পুতিনের বহনকারী মনে করা হয়, সেগুলোর কিছু কিছু আসলে বিভ্রান্ত করার ছল মাত্র। মস্কোতে ক্রেমলিনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা অ্যান্টনের এক পরিচিত ব্যক্তিও তাকে ঠিক একই কথা বলেছেন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিন ২০২০ সালে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যে, পুতিন মস্কোর উপশহর এবং কৃষ্ণসাগর তীরের রিসোর্ট শহর সোচিতে থাকা তার দুটি আলাদা বাসভবনে হুবহু একই দেখতে দুটি কার্যালয় থেকে কাজ করতেন। এতে করে ক্রেমলিন তার অবস্থান সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলার সুযোগ পেত। গত বছর 'রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি'-র একটি প্রতিবেদনে এই প্রতারণামূলক চেষ্টার আরও বিস্তারিত তথ্য উন্মোচন করা হয়, যেখানে হুবহু একই রকম দেখতে এই দুটি অফিসের দরজার হাতল এবং দেয়ালের জোড়ার মতো অতি ক্ষুদ্র পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হয়—যা প্রমাণ করে যে স্থান দুটি আসলে আলাদা ছিল।
মিখাইল রুবিন যিনি বর্তমানে উত্তর ক্যারোলিনায় থাকেন এবং অনুসন্ধানী সংবাদ মাধ্যম 'প্রোয়েক্ট'-এর ডেপুটি এডিটর হিসেবে কাজ করছেন—তিনি প্রায় এক দশক আগে রাশিয়ার একটি ব্যবসা বিষয়ক পত্রিকায় ক্রেমলিনের খবর সংগ্রহের সময় প্রথম পুতিনের এই চরম গোপনীয়তার বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিলেন।
রুবিন একবার দুর্ঘটনাবশত পুতিনের সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্যদের একটি বৈঠকের জন্য হাজির হতে দেখেছিলেন, কিন্তু প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে সেই বৈঠকের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল তার বেশ কয়েক দিন পর। তিনি জানান, তখন তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে "পুতিনের জনসমক্ষে থাকা ইমেজ বা ভাবমূর্তি পুরোপুরি সাজানো। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার।"
পুতিনের ক্ষেত্রে এই চাতুরি বা প্রতারণা কেবল নিরাপত্তার স্বার্থে নয়, বরং তিনি যে সর্বদা ব্যস্ত এবং পরিস্থিতি তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে—জনসমক্ষে এমন একটি ভাবমূর্তি বা বার্তা দেওয়ার জন্যও করা হয়।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ঘিরে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের যে ব্যাপক নজরদারি ও প্রতিবেদন তৈরির তীব্রতা দেখা যায়, তা ইউক্রেন যুদ্ধ বা মহামারীর আগের রাশিয়াতেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল।
তবে গণমাধ্যমের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের নানা বিধিনিষেধ এবং গত মাসে প্রেসিডেন্টের ফ্লাইট সংক্রান্ত তথ্যের বিভ্রান্তি—রাশিয়ার অনেকের কাছেই বেশ পরিচিত দৃশ্য বলে মনে হচ্ছে।
মিখাইল রুবিন বলেন, 'এই দিক থেকে পুতিন এমন এক চরম রূপ, যিনি তার চারপাশের সবকিছুকেই হাস্যকর বা অস্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আর আমার মনে হয়, ট্রাম্প কেবল সেই একই দিকে এগোতে শুরু করেছেন।'
