বড়দিনের আগে জুমে ৯০০ কর্মীকে ছাঁটাই করা সিইও এবার নিজেই চাকরি হারালেন, তুললেন প্রতারণার অভিযোগ
নিজেকে প্রতারিত মনে করছেন বিশাল গর্গ।
'লোকটা আমার চোখে ধুলো দিয়েছে!' এভাবেই ড্যানিয়েল লুইসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেন বেটার হোম অ্যান্ড ফাইন্যান্স-এর এই সদ্য অপসারিত সিইও। গত সপ্তাহেই লুইস তাকে সরিয়ে সিইওর চেয়ারে বসেছেন।
বিশালের ভাষ্যমতে, 'তিনি বলেছিলেন কোম্পানির ব্যবসায়িক কৌশল তার পছন্দ হয়েছে। এক্সে রীতিমতো আমাদের প্রশংসা করতেন। সেই প্রশংসাকে হাতিয়ার করেই তিনি কোম্পানির বোর্ডে ঢুকে আমাদের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন।'
২০২১ সালে ছুটির মৌসুমের ঠিক আগে এক জুম কলেই একধাক্কায় ৯০০ কর্মীকে ছাঁটাই করে খব্রএর শিরোনাম হয়েছিলেন বিশাল।
বিশাল বলছেন, গত ৩ আগস্ট ঠিক যে মুহূর্তে তিনি কোম্পানিকে অভাবনীয় সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন, ঠিক তখনই তাকে আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে বিশালের নেতৃত্বে বেটার উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে গেছে। মহামারিকালে যখন মর্টগেজ রেট ৩ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তখন রিফাইন্যান্সিংয়ের বিশাল জোয়ার আসে। সে সময় কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় ৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এখন রিফাইন্যান্সিং ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়েছে, মর্টগেজ রেট ছুঁইছুঁই করছে ৭ শতাংশে। ফলে এআই-ভিত্তিক এই মর্টগেজ কোম্পানির বর্তমান বাজারমূল্য নেমে এসেছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলারে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেই জুম-ছাঁটাইকাণ্ডের পর বাধ্যতামূলক ছুটি, হুইসেলব্লোয়ারের মামলা (পরে খারিজ হয়ে যায়), সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তদন্ত (যদিও তা থেকে কিছুই বেরোয়নি), ২০২৩ সালে এসপিএসি মার্জারের ব্যর্থতায় কোম্পানির শেয়ারের দাম ৯৩ শতাংশ কমে যাওয়া, এবং বছরের পর বছর ধরে পুঞ্জীভূত লোকসান। এতকিছুর পরও বিশাল যে এতদিন সিইওর চেয়ার টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন, সেটাই এক ছোটখাটো অলৌকিক ঘটনা!
কিন্তু এই খাদের কিনারা থেকে কোম্পানিটির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রায় অসম্ভব গল্প লিখে ফেলার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন বলে দাবি বিশালের।
মূল রিফাইন্যান্সিং ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ার পর বেটারের বার্ষিক বিক্রি ২০২১ সালের ১.৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালে মাত্র ৭০ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বিশাল বলেন, এ বছর কোম্পানিটি ফের ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিক্রির পথে এগোচ্ছিল।
দ্রুত মর্টগেজ প্রসেস করার জন্য এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কোম্পানিটি ঘুরে দাঁড়িছে। যে কাজ করতে সাধারণত ডজনখানেক মানুষের কয়েক দিন লেগে যেত, এআই তা চোখের পলকে করে দিচ্ছিল। বিশাল জানান, তারা নিও হোম লোনস-এর সঙ্গে চুক্তি করেন। এর জেরে ফলে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ হয় ও ঋণ দেওয়ার প্রাথমিক ব্যয় ৫০ শতাংশ কমে যায়। এই ফলাফলে মুগ্ধ হয়ে ইনটুইট, কয়েনবেস ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মর্টগেজ সেবাকে শক্তিশালী করতে এ বছর বেটারের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে। পাশাপাশি কোম্পানিটি হোম ইক্যুইটি লাইন অভ ক্রেডিটের শক্তিশালী ব্যবসাও দাঁড় করিয়ে ফেলেছিল।
বিশাল বলেন, 'আমরা জিতছিলাম। ঋণের পরিমাণ তিনগুণ বাড়িয়েছিলাম। লাভের মুখ দেখার ঠিক কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম আমরা।'
বিশাল স্বীকার করেন, তিনি বেশ 'কঠোর'। সেই বিখ্যাত জুম-ছাঁটাই কোম্পানির সুনামে মারাত্মক দাগ ফেলেছিল। এ ভুল তাকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে। কোম্পানি ও কর্মীদের ওপর প্রায় অসম্ভব চাপ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য বিশালকে বিস্তর সমালোচনা সইতে হয়েছে। কিন্তু লুইস বোর্ডকে বুঝিয়েছিলেন, বিশাল যথেষ্ট চাপ দেননি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে বেটার ও লুইসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে ৪ আগস্ট এক্সে লুইস লিখেছিলেন, বিশাল ছাড়া 'বেটারের অস্তিত্ব ছিল না। এ কাজের জন্য সম্মান প্রাপ্য।'
লুইস পেশায় হেজ ফান্ড ম্যানেজার। বিশাল বলেন, খরচ কমানো ও লাভের মুখ দেখা বেশ ভালো কিছু আইডিয়া নিয়ে মাস ছয়েক আগে লুইস তার কাছে আসেন।
বিশাল বলেন, 'খরচ বাঁচানোর ব্যাপারে লুইসের ভাবনাগুলো বেশ ভালো ছিল ঠিকই। কিন্তু উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তার ধারণা ছিল জঘন্য। আমরা যখন সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসে "আমি আরও ভালো করতে পারতাম" বলাটা খুব সোজা।'
গত ২৭ জুলাই লুইসকে কোম্পানির বোর্ডে আনা হয়। এর এক সপ্তাহের মাথায় তিনি বোর্ডের অন্য পরিচালকদের রাজি করিয়ে বিশালকে সিইওর পদ থেকে সরিয়ে দেন। আর সিইওর চেয়ারে বসেন লুইস নিজে।
বিশাল বলেন, 'বিষয়টা শুধু আমার নয়। আমি মানুষের টাকা বাঁচাতে চাই, তাদের আমেরিকান ড্রিম পূরণে সাহায্য করতে চাই। তাই শেয়ারহোল্ডাররা যখন বললেন, "আপনাকে পেছনের সারিতে বসতে হবে", আমি হাসিমুখেই মেনে নিয়েছিলাম।'
কিন্তু বিশালের বিশ্বাস, গত কয়েক মাস ধরে লুইস তার আসল উদ্দেশ্য সুকৌশলে লুকিয়ে রেখেছিলেন। নানা পরামর্শ দেওয়ার আড়ালে লুইস আসলে তাকে রাজি করাচ্ছিলেন, যাতে তিনি বোর্ডে জায়গা পান।
'আমার সন্দেহ, শুরু থেকেই তিনি সিইও হতে চেয়েছিলেন। বোর্ড ভুল করেছে,' বলেন বিশাল।
বিনিয়োগকারীরাও সম্ভবত বিশালের সঙ্গে একমত। লুইস সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কোম্পানির শেয়ারদর ৪৫ শতাংশ পড়ে গেছে। (অবশ্য বিশালের বিদায়ের ঘোষণার আগেই এ বছর শেয়ারদর ১৬ শতাংশের বেশি পড়ে গিয়েছিল)।
বিশাল পদত্যাগ করার এক সপ্তাহের মধ্যে (তবে তিনি এখনও বোর্ডে আছেন) আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের অনেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। অনুরোধ করেছেন, বিশাল তার সিইও পদটি ফিরিয়ে নেন। বিশালের হাতে এখন বিশেষ ভোটিং ক্ষমতাযুক্ত ক্লাস বি শেয়ার রয়েছে—নিজেরগুলো তো বটেই, সঙ্গে আছে বিশ্বস্ত পুরোনো বিনিয়োগকারীদের শেয়ারও। বিশাল বলছেন, জিতে আসার মতো পর্যাপ্ত ভোট তার পকেটে রয়েছে।
আইনি লড়াইয়ের জন্য তিনি বিখ্যাত আইনজীবী অ্যালেক্স স্পিরোকে নিয়োগ করেছেন। সিইও পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে গত সোমবার তিনি বোর্ডকে চিঠিও দিয়েছেন। বিশাল বলেন, কোম্পানি ফের লাভের মুখ না দেখা পর্যন্ত তিনি বছরে মাত্র ১ ডলার বেতনে কাজ করবেন, তারপর নিজেই সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন।
বিশাল বলেন, 'স্বীকার করছি যে গত ১০ বছর ধরে এই কাজ করলেও আমার কাজ সবসময় নিখুঁত ছিল না। আশা করি এই সমস্যার সমাধান হবে। আমার মনে হয় বেটারের ভবিষ্যৎ এখনও বেশ উজ্জ্বল।'
