এআই কি আপনার কাজ সহজ করবে, নাকি চাকরিই কেড়ে নেবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করছে, তাদের তৈরি বিভিন্ন টুল মানুষের করা অনেক কাজই করতে পারবে—এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের বিকল্পও হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু কাজ পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) হয়ে যাবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এআই মানুষের কাজকে আরও দক্ষ ও সহজ করে তুলবে। বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো এসব প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এর একটি বড় কারণ, কর্মীসংখ্যা কমিয়ে খরচ বাঁচানোর সম্ভাবনা।
প্রযুক্তি খাতে এখন একটি নতুন ধারণা আলোচনায় এসেছে—'ফ্ল্যাট ইজ দ্য নিউ আপ'। অর্থাৎ, কোম্পানির কর্মীসংখ্যা আর না বাড়িয়েও প্রবৃদ্ধি সম্ভব। নতুন কর্মী নিয়োগের বদলে নির্দিষ্ট কাজের জন্য 'এআই এজেন্ট' বা ভার্চুয়াল কর্মী ব্যবহার করা হতে পারে, যারা তুলনামূলক জটিল কাজও সামলাতে সক্ষম।
এআই নিয়ে করা এসব পূর্বাভাসের অর্ধেকও যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রায় সব খাতের কর্মসংস্থান ও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে এর প্রভাব পড়বে। অনেকের ধারণার চেয়েও দ্রুত সেই পরিবর্তন আসতে পারে।
সম্প্রতি নোবেলজয়ী কয়েকজন অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, এআই যেন ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকট সৃষ্টি না করে বরং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে—তা নিশ্চিত করতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, গত মাসে লন্ডনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, এআইয়ের প্রভাবে বদলে যাওয়া চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজে পেতে তারা হিমশিম খাচ্ছে।
যদিও এআই প্রযুক্তির যাত্রা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, তবু বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে এর প্রভাবের কিছু স্পষ্ট ধারা ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে প্রযুক্তি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক দিয়ে পরিমাপ করা হয়, বিভিন্ন 'লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল' (এলএলএম) আগে মানুষের করা কাজ কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে।
তিন বছর আগে এসব মডেল কেবল কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের কাজ নির্ভরযোগ্যভাবে সম্পন্ন করতে পারত। এখন তারা প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে—এমন তুলনামূলক জটিল কাজও করতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক কিছু এলএলএম এখন ক্রিপ্টোকারেন্সির 'স্মার্ট কনট্রাক্ট'-এ ত্রুটি শনাক্ত করতে পারে, এমনকি এমন সফটওয়্যার মডেলও তৈরি ও উন্নত করতে পারে, যা করতে একজন মানুষের কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী এক বছরের মধ্যেই সর্বাধুনিক এআই মডেলগুলো নিজেরাই নিজেদের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
এ পরিবর্তন শুধু সফটওয়্যার উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়। একই ধরনের প্রবণতা—যদিও এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে—দেখা যাচ্ছে আর্থিক বিশ্লেষণ, প্রাথমিক পর্যায়ের আইনি কাজ এবং সৃজনশীল শিল্পের কিছু এন্ট্রি-লেভেল চাকরিতেও।
চাকরির ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণাগুলোর একটি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে চার বছরের কর্মসংস্থান তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন পেশাগুলোর তুলনা করা হয়েছে, যেগুলো এআইয়ের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে (যেমন: সফটওয়্যার ডেভেলপার, কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধি) এবং যেগুলো তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে (যেমন: স্বাস্থ্যকর্মী, শিশুসেবা কর্মী ও হেয়ারড্রেসার)।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মজুরি ও কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করার পর ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের কর্মসংস্থান ২ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। আর অর্থনীতি, সফটওয়্যার ও সৃজনশীল শিল্পের মতো এআই-নির্ভর খাতে এই হার ১২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে সব অর্থনীতিবিদ এ বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, সুদের হার বৃদ্ধিসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণও কর্মসংস্থান কমার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
চ্যাটজিপিটি ও অন্যান্য 'লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল' চালুর পর অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপনেও পরিবর্তন দেখা গেছে।
অবশ্য এর পেছনেও সুদের হার, করনীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয় কাজ করছে। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এআইয়ের প্রভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ খাত (যেমন: টেলিমার্কেটিং ও আইনি সেবা) এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ খাত (যেমন: নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য প্রস্তুত)-এর চাকরির বিজ্ঞাপনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এই সূচকে যুক্তরাজ্যে প্রভাব ছিল তুলনামূলক বেশি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তখন দেশটিতে সুদের হার স্থিতিশীল ছিল বা কমানো হচ্ছিল এবং এটি গত বছরের 'ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স' বৃদ্ধির আগের সময়ের তথ্য। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী, সেবাখাতনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় যুক্তরাজ্য এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে বেশি।
এআই ব্যবহারের পরিমাণ পরিমাপ করা হয় 'টোকেন' দিয়ে। টোকেন হলো লেখার ছোট ছোট অংশ, যা ব্যবহার করে এআই ভাষা বুঝতে, বিশ্লেষণ করতে এবং নতুন লেখা তৈরি করতে পারে। গড়ে একটি টোকেন একটি ইংরেজি শব্দের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের সমান।
২০২৬ সালে এআই ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতি টোকেনের খরচ কমলেও মোট টোকেন ব্যবহারের পরিমাণ এত দ্রুত বেড়েছে যে সামগ্রিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে উৎসাহ দিতে 'টোকেন লিডারবোর্ড' চালু করেছে।
গত কয়েক মাসে ট্রিলিয়ন, এমনকি কোয়াড্রিলিয়ন (হাজার ট্রিলিয়ন) টোকেন ব্যবহার হয়েছে। এর বড় অংশই ছিল 'এজেন্টিক ইউজ', অর্থাৎ এমন এআই এজেন্টের মাধ্যমে যা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
তবে এতে কোম্পানিগুলোর ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন উন্নত এআই মডেলের ব্যবহার সীমিত করতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে সব ধরনের কাজ এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ কিছু ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল কর্মী মানুষের চেয়েও বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। বিষয়টি কাজের ধরনভেদে ভিন্ন হতে পারে।
তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো, পশ্চিমা অনেক প্রতিষ্ঠান এখন চীনের তৈরি তুলনামূলক কম খরচের উন্মুক্ত এআই মডেলের দিকে ঝুঁকছে।
সব মিলিয়ে এআইয়ের ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে চাকরির বাজারে পরিবর্তনের কয়েকটি স্পষ্ট প্রবণতা ইতোমধ্যেই সামনে আসছে।
