মাদুরোকে তুলে নেয়ার আগে মাস্কের এআই ‘গ্রক’-এর পরামর্শ নিয়েছিলেন ট্রাম্প
ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটকের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রযুক্তি ধনকুবের ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চ্যাটবট 'গ্রক'-এর পরামর্শ নিয়েছিলেন বলে এক প্রতিবেদনে জানা গেছে।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক সামরিক অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে বন্দি করে তুলে নিয়ে আসে মার্কিন সামরিক বাহিনী। নাটকীয় সেই অভিযানের আগে ভেনিজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে বিভিন্ন জাহাজে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
মাদুরোকে বন্দি করার এক মাস আগে মাস্কের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প। ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তার বরাতে মার্কিন সাময়িকী 'টাইম' জানিয়েছে, ট্রাম্প সেখানে নিজের প্রেসিডেন্সি ও ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার নিয়ে গ্রককে নানা প্রশ্ন করে 'ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করেছিলেন'। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্টের অন্যতম একটি প্রশ্ন ছিল—মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে ভেনিজুয়েলার জনগণ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এআই চ্যাটবটটি প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছিল যে ভেনিজুয়েলার জনগণ সম্ভবত মাদুরোর পতনে আনন্দ উদযাপন করবে, কারণ তিনি একজন অজনপ্রিয় স্বৈরশাসক ছিলেন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।
'অ্যাবসলিউট রিজলভ' ছদ্মনামের একটি অভিযানের জন্য কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করার পর গত ২ জানুয়ারি ভেনিজুয়েলায় বিমান হামলার চূড়ান্ত অনুমোদন দেন ট্রাম্প। মাদুরোকে তুলে আনার আড়াই ঘণ্টার এই বড় অভিযানে বোমারু বিমান, যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। কিউবা জানিয়েছে, এই অভিযানের সময় তাদের ৩২ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন; যারা 'তীব্র প্রতিরোধের পর আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে অথবা স্থাপনায় বোমাবর্ষণের ফলে' প্রাণ হারান।
গত ৩ জানুয়ারি রাজধানী কারাকাস থেকে মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে ক্যারিবীয় সাগরে থাকা একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে গুয়ান্তানামো বে হয়ে বিমানে তাঁদের নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হয়।
মাদুরোকে আটকের পর বিদেশে অবস্থানরত ভেনিজুয়েলার প্রবাসী জনগোষ্ঠীর কিছু অংশে বাস্তবেও আনন্দ উদযাপন করতে দেখা যায়।
ক্ষমতাচ্যুত এই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বর্তমানে মাদক-সন্ত্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের ষড়যন্ত্রসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মাদুরো তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আগামী জুনে তাঁর বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখে গ্রক চ্যাটবটের ওপর ট্রাম্প অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন, কারণ সপ্তাহখানেক আগেই এআই টুলটি এমন পূর্বাভাস দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে মাস্ক ও ট্রাম্পের মধ্যে বিরোধের খবর এলেও ট্রাম্পের প্রশাসনে গ্রকের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন নাগরিকদের কেন্দ্রীয় সরকার সম্পর্কে তথ্য দিতে নতুন চালু হওয়া 'আমেরিকা ডট গভ' চ্যাটবটটি আংশিকভাবে গ্রক এবং গুগলের জেমিনাই দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমাগত বিকাশের পক্ষে তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছেন। এমনকি তিনি এআই-এর নাম পরিবর্তন করে 'সুপার ইন্টেলিজেন্স' বা অতি-বুদ্ধিমত্তা করার একটি নির্বাহী আদেশেও স্বাক্ষর করেছেন।
উপদেষ্টারা টাইমকে জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তি নিয়ে যেকোনো উদ্বেগকে ট্রাম্প সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছেন। জনমত জরিপকারী টনি ফ্যাব্রিজিওর এক জরিপে যখন দেখা যায় যে আমেরিকানরা অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে শঙ্কিত, তখন 'ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে আসলেই কোনো তোয়াক্কা করেননি' বলে সাময়িকীটিকে জানিয়েছেন এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সহযোগী।
ওই সহযোগী বলেন, 'তিনি যা করতে চান, তা-ই করেন। তিনি ক্ষোভের জন্ম দিতে অভ্যস্ত এবং শেষ পর্যন্ত সবাই যে তাঁর কাছে ফিরে আসে তা দেখতে পছন্দ করেন। এই মুহূর্তে তাঁকে কোনো বিষয়ে বোঝানো খুবই কঠিন।'
তা সত্ত্বেও বিকাশমান এই প্রযুক্তিটি ভোটারদের কাছে খুব একটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। পলিটিকোর এক জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন যে এআই মানবজাতিকে ধ্বংস করার অন্তত কিছু ঝুঁকি রয়েছে। প্রায় ১৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে এমনটি ঘটার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত।
তবে ট্রাম্প নিজের অবস্থানে অবিচল রয়েছেন। সম্প্রতি ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'যে এআই জয় করবে, সে-ই বিজয়ী হবে! আমরা চীনসহ অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছি এবং ভবিষ্যতেও এগিয়ে থাকব।'
