ঢাকার কল সেন্টার: গভীর রাতের শিফটের আড়ালে থাকা কঠোর বাস্তবতা ও তরুণদের অভিজ্ঞতা
কলাবাগানকে দেখে মোটেও এমন কোনো জায়গা মনে হয় না, যেখানে আমেরিকান বা ব্রিটিশ সময়সূচি মেনে কাজ চলে। রাত ১০টা বাজতে না বাজতেই চায়ের দোকানগুলো বন্ধ হতে শুরু করে, রিকশার চলাচল কমে আসে, আর একমাত্র চোখে পড়ার মতো আলো আসে কয়েকটি অফিস ভবন থেকে, যেখানে তখন কেবল কর্মদিবস শুরু হয়েছে।
প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ নিজেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য আউটসোর্স করা গ্রাহকসেবার পরবর্তী বড় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে—এমন একটি দেশ হিসেবে, যেখানে বিশ্বের কোনো মানুষের ইন্টারনেট সংযোগ নষ্ট হলে বা তার ফ্লাইট বিলম্বিত হলে ফোন আসে।
এখন এমন চাকরির বিজ্ঞাপন সর্বত্র দেখা যায়—ফেসবুকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের কাছের বৈদ্যুতিক খুঁটির পোস্টারে—যেখানে এমন বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা সদ্য স্নাতক হওয়া একজন তরুণের চোখ বড় করে দেওয়ার মতো। তবে বিজ্ঞাপনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার কতটা মিল রয়েছে, তা নির্ভর করে আপনি কাকে জিজ্ঞেস করছেন এবং সত্যিই দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে কাজটি করেছেন কি না, তার ওপর।
২২ বছর বয়সী ইবনুল রাহাত ইউনিভার্সটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) বিবিএর শিক্ষার্থী এবং তিনি সেই দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকেছিলেন।
কলাবাগানের একটি সরু গলিগুলোর পাশে একটি গ্রাহকসেবা কেন্দ্র বা কল সেন্টারে তিনি ছয় মাস কাজ করেছেন। একটি টাকাও উপার্জনের আগে তাকে ১৫ দিন প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল। সেই প্রশিক্ষণের জন্য কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, 'তারা আপনাকে কাজের নিয়মকানুন দেখাবে, আর আপনাকে কেবল মেনে নিতে হবে যে প্রথম দুই সপ্তাহ হলো বিনামূল্যে শ্রম।' তার কথায় তেমন কোনো ক্ষোভ ছিল না, যেন এটিই এমন এক প্রবেশমূল্য, যা সবাইকে দিতে হয়।
প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর শুরু হয় প্রকৃত পালার কাজ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কাজ শুরু হয়ে চলত ভোর ৬টা বা ৭টা পর্যন্ত। বেতন ছিল ঘণ্টা ভিত্তিক কোনো নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নয়। অধিকাংশ কর্মী ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে পেতেন। রাহাত পেতেন ৮৫ টাকা।
স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং তুলনামূলক বেশি পরিশীলিত উচ্চারণে কথা বলতে পারা পুরুষেরা ঘণ্টায় ১০০ টাকার বেশি আয় করতে পারতেন। কীভাবে কথা বললে মনে হবে, আপনি যেন ওহাইও বা ম্যানচেস্টারের অপর প্রান্তের ফোনে থাকা মানুষের মতোই সেখানকার মানুষ—এই দক্ষতার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল এক ধরনের ছোটখাটো অলিখিত বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা।
প্রকৃত কাজটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় ফোনে পণ্য বা সেবা বিক্রির কাজ। রাহাতের দলকে কোম্পানি যে ভাষায় 'কার্যাদেশ' বলত, সেটি ছিল একটি নির্দিষ্ট আউটসোর্স করা পণ্য বা সেবার কাজ। তার ক্ষেত্রে সেটি ছিল 'এয়ারডাক্ট' নামের একটি কার্যাদেশ, যা একটি মার্কিন জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য করা হতো। তিনি এবং তার সঙ্গে কাজ করা আরও অনেক তরুণ রাতের পর রাত অন্য মহাদেশের বাড়ির মালিকদের বোঝানোর চেষ্টা করতেন, যাতে তারা ঘরের বায়ু চলাচলের পাইপলাইন পরিষ্কার করার সেবা বুক করেন—যে সেবার বিষয়ে তারা নিজেরা জানতে চাননি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিতে চাননি।
একবার বিষয়টি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কল্পনা করুন। ওহাইওর কোথাও একটি ফোন বেজে উঠছে, যখন ফোনধারীর জন্য তখন দুপুরের মাঝামাঝি সময়। আর কলাবাগানের কোথাও ২২ বছর বয়সী এক ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী তখন রাতের পালায় তিন ঘণ্টা পার করে ফেলেছেন। দুই সপ্তাহ আগে মুখস্থ করা একটি কথার ধারা তিনি বারবার বলে যাচ্ছেন। তাকে এমনভাবে কথা বলতে হচ্ছে, যাতে তাকে ক্লান্ত না শোনায়। কারণ ক্লান্ত শোনালে সম্ভাব্য গ্রাহক হারিয়ে যায়, আর সম্ভাব্য গ্রাহকই হলো সেই একমাত্র বিষয়, যার ওপর তার চাকরি টিকে আছে।
মানুষ যে ভাষায় তুলনামূলক আকর্ষণীয়ভাবে দেশের আউটসোর্সিং খাতের বিকাশের কথা বলে, এর প্রকৃত কার্যপ্রণালি আসলে এটাই। ওহাইওর তুলনায় ঢাকায় বসে ফোনে পণ্য বা সেবা বিক্রির কাজ পরিচালনা করা কম খরচের। আর সবচেয়ে কম খরচে ফোনের অপর প্রান্তের কণ্ঠস্বর সরবরাহ করার সুযোগের জন্য বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান এবং ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠা ফিলিপাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
অন্য দেশের কর্মকর্তারা সভাকক্ষে একে শ্রম ব্যয়ের পার্থক্য কাজে লাগানো বলে থাকেন এবং রাত ৩টায় এর বাস্তব শব্দ কেমন হয়, তা তাদের শুনতে হয় না। সেই শব্দ মূলত একই ধরনের ১১টি বাক্যের নানা রূপ ৪০টি হেডফোনে বসে ৪০ জন মানুষের মুখে উচ্চারিত হওয়ার মৃদু গুঞ্জন।
প্রশিক্ষণের দিন
একজন দলনেতা কর্মীদের ওপর নজর রাখতেন, আর পুরো ব্যবস্থাটি ছিল পরামর্শ দেওয়ার চেয়ে লক্ষ্যমাত্রা আদায় করানোর কাছাকাছি।
মাসে কমপক্ষে পাঁচজন সম্ভাব্য গ্রাহক সংগ্রহ করতে হতো।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে চাকরি চলে যেত; দীর্ঘ সময় ধরে সতর্ক করা, আপিল করার সুযোগ বা এ ধরনের কোনো প্রক্রিয়া ছিল না।
আর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারলে শুরু হতো বাড়তি সুবিধা। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার পর প্রতিটি অতিরিক্ত সম্ভাব্য গ্রাহকের জন্য দেওয়া হতো ৫০০ টাকা। অর্থাৎ, এক মাসে ষষ্ঠ সম্ভাব্য গ্রাহক সংগ্রহ করলে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা, সপ্তমটি সংগ্রহ করলে অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা।
কাগজে-কলমে এটি বেশ গোছানো একটি ব্যবস্থা।
কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ ছিল, প্রতিটি পালার সঙ্গে একটি চাপা উৎকণ্ঠা জড়িয়ে থাকত—মাথার ভেতর একটি সংখ্যা ঘুরত, যা বাথরুমে যাওয়ার সময় কিংবা পাঁচ মিনিটের জন্য বাইরে গিয়ে একটু বাতাস নেওয়ার সময়ও মাথা থেকে সরত না।
অফিসটির চেহারাও খাতটির বিজ্ঞাপনগুলোতে দেখানো ছবির মতো ছিল না।
শারীরিকভাবে এটি ছিল সাধারণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক অফিসের মতো—প্রত্যেকের জন্য আলাদা বসার জায়গা, প্রতিটি আসনে একটি হেডফোন ও কথোপকথনের লিখিত ধারা, আর সাপ্তাহিক অগ্রগতির প্রতিবেদন, যা দেখে দলনেতা ঠিক বুঝতে পারতেন কে পিছিয়ে পড়ছে।
তবে সেখানে যে বিষয়টির অভাব ছিল, তা হলো পারস্পরিক বন্ধুত্ব বা সহকর্মীদের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার অনুভূতি।
রাহাত বলেন, 'সবাই নিজের সম্ভাব্য গ্রাহক নিয়ে ব্যস্ত থাকত। সবাই শুধু নিজের চিন্তাই করতো।'
তার অধিকাংশ সহকর্মী ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা সাত কলেজের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তারা মূলত টাকার জন্য সেখানে কাজ করতেন এবং পাশের আসনে বসা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। কারণ মাস শেষে একই অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার জন্য তাদের সবার মধ্যেই প্রতিযোগিতা চলত।
রাহাতের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মীদের মধ্যে নারীরা ছিলেন সংখ্যালঘু—সর্বোচ্চ দুই বা তিনজন। তাদের অনেকেই ওই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন অথবা স্বামীর সঙ্গে কাজ করতেন। এটিও এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত।
তবে যে বিজ্ঞাপন দেখে সবাই চাকরির জন্য আবেদন করেন, তা সবাই গ্রহণ করেন না। এমন একজনের অভিজ্ঞতাও জানা দরকার, যিনি সুযোগটির খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত সরে এসেছিলেন।
২৪ বছর বয়সী ফাইয়াজ করিম জাহিন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর শিক্ষার্থী। তিনি ফেসবুকে একই ধরনের একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে অন্তত সাক্ষাৎকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, 'বেতনটা আশাব্যঞ্জক মনে হয়েছিল। তারা এমন কাউকে চেয়েছিল, যে ন্যূনতম ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। তাই আমি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট যোগ্য ছিলাম।'
এবার কোনো জুনিয়র নিয়োগকর্তা কম্পিউটারের পর্দা দেখে প্রশ্ন করছিলেন না। তিনি সরাসরি মহাব্যবস্থাপক এবং মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাক্ষাৎকারটি অনেকটা অভিনয়ের পরীক্ষার মতো হয়ে উঠেছিল—যেমন 'দ্য উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট' চলচ্চিত্রে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর সেই দৃশ্য, যেখানে তাকে কলম বিক্রি করতে বলা হয়েছিল।
তাকে মোটামুটি এই কথাই বলা হয়েছিল—আমাদের বোঝান। আর তাকেও চেষ্টা করতে হয়েছিল, সামনে যে পণ্যই দেওয়া হোক না কেন, সেটিতে তিনি সত্যিই বিশ্বাস করেন—এমন একজন মানুষের অভিনয় করতে।
এরপর যে চাকরির প্রস্তাব তিনি পান, তার কাঠামো রাহাতের অভিজ্ঞতার মতোই ছিল, তবে কিছুটা ভালোভাবে সাজানো। সাত দিনের প্রশিক্ষণের পর ঘণ্টাভিত্তিক কাজের বদলে নির্দিষ্ট বেতন দেওয়া হতো। সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা, আর প্রশিক্ষণ চলাকালে তার কর্মদক্ষতা কেমন তার ওপর ভিত্তি করে তা বেড়ে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারত।
কাগজে-কলমে এগুলো রাহাতের প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভালো সংখ্যা।
তবে চুক্তির পরের অংশে ছিল মূল শর্তটি।
তাদের সঙ্গে দুই বছরের জন্য কাজ করার বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার করতে হতো।
জাহিন সেখানে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, 'আমি ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারিনি, কারণ তাদের কর্মপরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি সম্পর্কে আমি জানতাম না।'
এটি ছিল অনেকটা কূটনৈতিকভাবে বলা—মাত্র ৪৫ মিনিট ধরে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তিনি নিজের জীবনের দুই বছর তুলে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।
রাহাত যে হিসাবটি করার কথা এখন বুঝতে পারছেন, জাহিন কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করার আগেই সেটি করেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার সঙ্গে রাতের পালার চাকরি দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে নেওয়া কঠিন—অন্তত দীর্ঘ সময়ের জন্য তো নয়ই।
আর বেতন যতই মোটামুটি ভালো মনে হোক না কেন, এমন একটি সময়সূচির সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলার জন্য সেটি যথেষ্ট ছিল না, যে সময়সূচি একই সঙ্গে তার ঘুম এবং একটি সেমিস্টারের পড়াশোনাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
তিনি বলেন, 'সুবিধার তুলনায় অসুবিধা অনেক বেশি ছিল।'
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু বকর আকান সম্ভবত চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জাহিনকে বলতেন যে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'মানুষের শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ কল সেন্টারের জন্য তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন রাতে কাজ করলে মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং এর সঙ্গে বিপাকীয় সমস্যার সমষ্টি, হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ ও মেজাজজনিত সমস্যার হার বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।'
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা পালাভিত্তিক কাজের কারণে শরীরের জৈবিক ছন্দে ব্যাঘাতকে সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী কারণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে—এমন একটি তথ্য, যা চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞাপনে খুব কমই দেখা যায়।
তবে ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গি, স্বাভাবিকভাবেই, ভিন্ন।
ইঅ্যান্ডএম আউটসোর্সিংয়ের প্রধান নির্বাহী সাদমান নাভিদ ইসলাম এমন একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন, যেটি একেবারেই রাতের সময়ে কাজ করে। সেখানে নির্দিষ্ট আট ঘণ্টার পালা রয়েছে, নারী-পুরুষ সবাই একসঙ্গে কাজ করেন এবং প্রতিষ্ঠানটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাজ করে থাকে, যার মধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যকার সেবাও রয়েছে।
তাদের বেতন কাঠামো রাহাত বা জাহিনের প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় কিছুটা সংকীর্ণ ও পরিমিত—অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে ১৭ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা।
আর চাকরিতে প্রবেশের শর্তও দুই বছরের চুক্তি বা বিক্রয়-দক্ষতার পরীক্ষার মতো কঠিন নয়।
মূলত ভালো ইংরেজিতে কথা বলতে পারাই যথেষ্ট।
নাভিদ ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কর্মীদের জন্য আসল সমস্যা কাজটি নয়, বরং সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।
নতুন কর্মীরা প্রথম কয়েক সপ্তাহে কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'দেরি করে জেগে থাকাটাই আসল বিষয়।'
নাভিদ ইসলাম বলেন, 'আমরা কর্মীদের ওপর খুব বেশি চাপ দিই না। আমরা বুঝি, বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় বিষয়টি আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না।'
রাহাতের বর্ণনায় যে কঠোর মাসিক লক্ষ্যমাত্রা এবং বাথরুমে যাওয়ার সময়ও মাথায় ঘুরতে থাকা সেই হিসাবের কথা এসেছে, নাভিদ ইসলামের বক্তব্য তার থেকে বেশ দূরে।
নাভিদ ইসলামের ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত সময় কাজ করারও সুযোগ নেই। তিনি বলেন, 'প্রতিদিন একই আট ঘণ্টা।'
একজন অতিরিক্ত সম্ভাব্য গ্রাহক সংগ্রহের জন্য রাতকে আরও দীর্ঘ করার মতো কোনো অতিরিক্ত সুবিধার কাঠামোও সেখানে নেই।
নাভিদ ইসলাম বলেন, 'পালা শেষ হওয়ার পর নারী কর্মীদের জন্য কোনো পরিবহন ব্যবস্থা নেই। তারা বের হওয়ার সময় নিজেদের যাতায়াতের দায়িত্ব নিজেরাই নেন। তবে আমরা তাদের পালা শেষ হওয়ার পরও ভোর সাড়ে ৬টা বা ৭টা পর্যন্ত অফিসে থাকতে দিই। যখন বাইরে আলো হয়, তখন তারা চলে যেতে পারেন।'
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের সভাপতি তানভীর ইব্রাহিম নাভিদ ইসলামের এ ব্যবস্থাপনাকে একটি শিল্প খাত যাকে আকস্মিক না বলে কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করে, তার একটি একক উত্তর হিসেবে দেখেন।
তিনি বলেন, 'দেশের অভ্যন্তরীণ কল সেন্টারগুলোতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কম হওয়ার পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক পরিস্থিতি দায়ী। সমাজ যেভাবে এসব কাজকে দেখে, তার কারণে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে নারীরা যেতে পারেন না। পরিবারগুলোর কাছে কল সেন্টারে কাজ করাকে যদি আরও ইতিবাচক বিষয় হিসেবে তুলে ধরা যায়, তাহলে আরও বেশি নারী এ খাতে যোগ দিতে পারবেন।'
এদিকে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দেওয়া পরামর্শে আপাতত দুটি সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইব্রাহিম বলেন, 'আমরা নারী কর্মীদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করে এবং এসব বাধা কাটিয়ে ওঠার বিভিন্ন উপায় বের করে নিশ্চিত করার চেষ্টা করি, যাতে নারী কর্মী থাকেন।'
নাভিদ ইসলাম বলেন, 'আমরা কাছাকাছি এলাকার মানুষদের নিয়োগের ওপরও গুরুত্ব দিই, কারণ কর্মীদের জন্য কর্মস্থলের দূরত্ব সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।'
নাভিদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম কয়েকটি কঠিন সপ্তাহ পার হওয়ার পর কর্মীদের ধরে রাখে শুধু বেতন নয়, বরং কর্মস্থলের পরিবেশ।
প্রতি ছয় মাসে কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন, বেতন বাড়ার সম্ভাবনা এবং এমন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যার সঙ্গে প্রয়োজনে যোগাযোগ করা যায়—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, 'আপনাকে কর্মীদের কাছে পৌঁছানো যায়—এমন মানুষ হতে হবে। কর্মীদের এমন মনে হওয়া উচিত নয় যে তারা ব্যবস্থাপকের কাছে যেতে পারবে না বা বসের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না।'
কর্মীদের বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
এখন যে প্রযুক্তি ধীরে ধীরে এই খাতে ঢুকে পড়ছে, আপাতত সেটি মূল ফোনকলের ভেতরে খুব বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে না।
ইব্রাহিম স্বীকার করেন, 'এই খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো খুব বেশি জনপ্রিয় নয়। তবে ভোক্তাদের আচরণ পরিবর্তিত হওয়ায় এটি আরও সাধারণ হয়ে উঠবে। মানুষ এখনো মানব কর্মীর সঙ্গে কথা বলতে চায়, কারণ এতে তারা বেশি সন্তুষ্টি পায়। তারা যান্ত্রিক উত্তর চায় না। তারা এমন কাউকে চায়, যে তাদের আবেগ বুঝতে পারে। তবে ধীরে ধীরে এই খাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে এগিয়ে যাবে।'
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেখানে ইতোমধ্যে কার্যকর হয়ে উঠেছে, তা হলো কর্মীদের ব্যবহারের পেছনের প্রযুক্তিতে—যে সফটওয়্যার দিয়ে কর্মীরা ফোনকল পরিচালনা করেন এবং নতুন কর্মীদের সেটি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
ইব্রাহিম বলেন, 'প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু বদলেছে, একই সঙ্গে আমরা যে সফটওয়্যার ব্যবহার করে সেবা দিই, সেটিও বদলেছে।'
তিনি বলেন, 'এখন একটি মাত্র ব্যবস্থা একসঙ্গে অনেক কাজ সামলাতে পারে এবং বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমস্যাটি শনাক্ত করতে পারে এবং এমনকি আমাকে বলে দিতে পারে, কী ধরনের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন।'
সংস্থাটির দৃষ্টিকোণ থেকে এর মূল আকর্ষণ হলো এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সুযোগ তৈরি হওয়া।
ইব্রাহিম বলেন, 'দেশ হিসেবে আমরা আমাদের প্রতিযোগী ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দক্ষ নই। তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে এবং ভালো অবস্থানে আছে।'
তিনি আরও বলেন, 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সেই ব্যবধান কমানোর একটি সুযোগ দিচ্ছে। সেবার মান উন্নত করে এটি আমাদের ভারতীয় পর্যায়ের দক্ষতায় পৌঁছাতে এবং আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে।'
