১৪ বছরে মাত্র ২৭৪ মৌজায় জরিপ; ৫৮,৫৯০ মৌজায় ডিজিটাল ভূমি জরিপ শেষ হতে লাগতে পারে কয়েক শতাব্দী
যথাযথ পরিকল্পনার অভাব, কর্মকর্তাদের দক্ষতার ঘাটতি, প্রশাসনিক স্থবিরতা ও তীব্র জনবল সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে 'বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস)'।
ভূমি ব্যবস্থাপনা সহজ, স্বচ্ছ ও আধুনিক করতে ২০১২ সালে এই জরিপ কার্যক্রম শুরু করে সরকার। তবে কার্যক্রম শুরুর পর ১৪ বছরে মাত্র ২৭৪টি মৌজার জরিপ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে জরিপ হয়েছে ২০টিরও কম।
দেশে মোট মৌজার সংখ্যা ৫৮ হাজার ৫৯০টি। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর বলছে, বর্তমান গতিতে চললে দেশের সব মৌজাকে ডিজিটাল জরিপের আওতায় আনতে কয়েক শতাব্দী লেগে যাবে।
ডিজিটাল জরিপের হতাশাজনক অগ্রগতির এই চিত্র উঠে এসেছে অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে। জনবল সংকট কাটাতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
গত ১৮ আগস্ট এ বিষয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর। এতে ভূমিসচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভের বর্তমান অগ্রগতি ও বিভিন্ন সমস্যার চিত্র তুলে ধরা হয়।
এ বিষয়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক (ভূমি রেকর্ড) মো. মোমিনুর রশীদ ২১ সেপ্টেম্বর টিবিএসকে বলেন, "উন্নত ভূমি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য নিয়ে ডিজিটাল সার্ভের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কিন্তু জনবল ঘাটতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ডিজিটাল সার্ভে ঠিকমতো এগোয়নি। আমিন, সার্ভেয়ারদের নিয়োগ হয়নি। আবার কিছু নিয়োগ প্রক্রিয়া আদালতে মামলার কারণে আটকে গেছে।"
তিনি বলেন, "এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করা হবে। সার্ভের পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। এ জন্য নতুন করে প্রকল্প প্রণয়ন করা হচ্ছে।"
মোমিনুর রশীদ বলেন, বর্তমানে কোরিয়া সরকারের সহযোগিতায় ছয় জেলার ৩৪ উপজেলায় একটি পাইলট প্রকল্প চলছে। কোরিয়া সরকার এ কাজে আরও সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকও আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় আগ্রহ দেখিয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে দেশের ডিজিটাল ভূমি জরিপ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
কেন ডিজিটাল জরিপ
ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে প্রচলিত জরিপ পদ্ধতির পরিবর্তে কৃত্রিম উপগ্রহ, জিএনএসএস (গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম) রিসিভার, টোটাল স্টেশন (ইটিএস), ড্রোন ও এয়ারক্রাফট, ফটোগ্রামেট্রি প্রযুক্তি এবং জিও-রেফারেন্সিংভিত্তিক হাইব্রিড পদ্ধতিতে 'বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস)' চালু করে সরকার।
দেশের ৫৮ হাজার ৫৯০টি মৌজার ডিজিটাল জরিপ করতে ১ হাজার ২১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা ভূ-সম্পদ জরিপ শেষ করা। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে বারবার নতুন করে জরিপ করার প্রয়োজন কমিয়ে আনাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, একবার ডিজিটাল ও জিও-রেফারেন্সড ম্যাপ তৈরি হয়ে গেলে ভবিষ্যতে মাঠে গিয়ে বারবার জরিপ করার প্রয়োজন কমে যাবে। কোনো এলাকায় নদীভাঙন, ভূমিধস বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণে ভূমির বড় ধরনের পরিবর্তন না হলে ডিজিটাল ম্যাপ হালনাগাদ করেই কাজ চালানো যাবে। নতুন করে পূর্ণাঙ্গ রিভিশনাল সার্ভের প্রয়োজন হবে না।
এ ছাড়া ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সহজ, স্বচ্ছ, নির্ভুল ও আধুনিক করা; ভূমিসংক্রান্ত হয়রানি, বিরোধ ও মামলা কমানো; ভুয়া দলিল ও জালিয়াতি রোধ; মালিকানা যাচাই সহজ করা এবং ডিজিটাল খতিয়ান ও ম্যাপ অনলাইনে সহজলভ্য করাও প্রকল্পটির উদ্দেশ্য।
তীব্র জনবল সংকট
মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল জরিপ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে তীব্র জনবল সংকট ও প্রশাসনিক স্থবিরতাকে চিহ্নিত করেছে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর।
সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৭ হাজার ৬৩২টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ২ হাজার ৬৭৪ জন। অর্থাৎ ৪ হাজার ৯৫৮টি বা প্রায় ৬৫ শতাংশ পদই শূন্য।
বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে সার্ভেয়ার, ড্রাফটসম্যান, কানুনগো, উপসহকারী ও সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের বড় অংশই শূন্য। ফলে মাঠপর্যায়ের জরিপ কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর বলছে, দেশে আগে থেকেই ১০টি জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস ও সেগুলোর অধীনে উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস রয়েছে। পরে আরও নয়টি জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস এবং সেগুলোর অধীনে উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস স্থাপন করা হয়।
তবে নতুন জোনাল ও উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের প্রয়োজনীয় পদের বিপরীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এসব পদে জনবলও নিয়োগ দেওয়া যায়নি।
আরটিকে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব
ডিজিটাল জরিপ দ্রুত ও নির্ভুল করতে আধুনিক রিয়েল-টাইম কাইনেমেটিক (আরটিকে) জরিপ পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব এসেছে।
আরটিকে হলো স্যাটেলাইট বা জিপিএসভিত্তিক আধুনিক ভূমি জরিপ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে দ্রুত ও রিয়েল-টাইমে সেন্টিমিটার পর্যায়ের—প্রায় ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার—নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে ভূমি জরিপের ইতিহাস প্রায় আড়াইশ বছরের। ১৭৭৪ থেকে ১৭৮০ সালে মেজর জেমস রেনেলের জরিপের মাধ্যমে এ অঞ্চলে আধুনিক ভূমি ও মানচিত্র জরিপের সূচনা হয়। এরপর ১৮০২ সালে শুরু হয় ত্রিকোণমিতিক জরিপ।
১৮৪৬ থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত মৌজাভিত্তিক জরিপ পরিচালিত হয়। এরপর ১৮৮৮ সালে শুরু হয় ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস)।
জমিদারি প্রথা বিলোপের পর ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সালে স্টেট অ্যাকুইজিশন (এসএ) জরিপ করা হয়। এসএ জরিপে ব্যাপক ভুলত্রুটি থাকায় পরে সেগুলো সংশোধনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রিভিশনাল সার্ভে (বিআরএস) বা বিএস জরিপ শুরু হয়।
সবশেষে ২০১২ সালে সরকার বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস) চালু করে। এতে ড্রোন, জিএনএসএস, আরটিকে, ইটিএস ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমির ডিজিটাল জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
