দুবার প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন দেয়ার পরও বাঁচলেন ক্রিস্টা পাইক: মৃত্যুদণ্ড কি স্থগিত, নাকি বাস্তবায়ন করবে টেনেসি?
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ১৯৯৫ সালে সংঘটিত এক হত্যাকাণ্ডের দায়ে দণ্ডিত ক্রিস্টা গেইল পাইকের শরীরে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন প্রয়োগের পরও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়নি। কারণ পর পর দুই ডোজ প্রয়োগের পরও তিনি বেঁচে যান।
মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেই এক 'নজিরবিহীন ব্যর্থতা' বলে উল্লেখ করেছেন। ইঞ্জেকশন ব্যর্থ হওয়ার পরপরই ৫০ বছর বয়সী পাইককে চিকিৎসার জন্য আশঙ্কাজনক অবস্থায় কারাগারের বাইরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এই বিপর্যয়ের পর প্রশ্ন উঠেছে—পাইকের মৃত্যুদণ্ড কি স্থগিত হতে যাচ্ছে, নাকি টেনেসি রাজ্য কর্তৃপক্ষ শীঘ্রই তা বাস্তবায়নের নতুন কোনো উদ্যোগ নেবে?
মৃত্যুদণ্ড কি স্থগিত হচ্ছে, নাকি বাস্তবায়ন কেরতে যাচ্ছে টেনেসি?
দুই ডোজ প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন প্রয়োগের পরও ক্রিস্টা পাইকের বেঁচে যাওয়ার পরও তার অপরাধের সাজা বা রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হচ্ছে না। তবে টেনেসির বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে শীঘ্রই এই মৃত্যুদণ্ড পুনর্বাস্তবায়নেরও সম্ভাবনা কম।
টেনেসির আইন অনুযায়ী, পূর্বনির্ধারিত তারিখে মৃত্যুদণ্ড অসম্পূর্ণ থেকে গেলে সাজা বাতিল হয় না, তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বরের মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ায় পুরোনো পরোয়ানায় পাইককে আর মৃত্যুদণ্ড কক্ষে ফেরানো যাবে না। নতুন কোনো তারিখ নির্ধারণ করতে হলে তা টেনেসি সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমেই হতে হবে।
তবে মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা তৈরি করেছেন টেনেসির গভর্নর বিল লি। এই ব্যর্থতার পর তিনি ২০২৬ সালের জন্য টেনেসির অবশিষ্ট সমস্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্থগিত ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি পাইকের ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল তা খতিয়ে দেখতে একটি বিস্তৃত ও স্বাধীন তৃতীয়-পক্ষ (স্বতন্ত্র) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে ব্যবহৃত পেন্টোবার্বিটাল ওষুধ, আইভি লাইন এবং চিকিৎসা তদারকির সার্বিক পদ্ধতি খতিয়ে দেখা হবে।
গভর্নর লি স্পষ্ট জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ডকে কেবল আইনি ও সাংবিধানিক হলেই হবে না, তা কার্যকর করার প্রক্রিয়াকেও নিরাপদ ও নির্ভুল হতে হবে। ফলে রাজ্য সুপ্রিম কোর্ট নতুন তারিখ দিতে পারলেও, গভর্নরের তদন্ত প্রতিবেদন ও চলমান আইনি আপিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত টেনেসি কর্তৃপক্ষের পক্ষে শীঘ্রই এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব।
ক্রিস্টা পাইকের বর্তমান অবস্থান ও আইনি জটিলতা
স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার রাতে ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে দুটি আলাদা সিরিঞ্জে পেন্টোবার্বিটাল প্রয়োগের পরও পাইক অবিকল শ্বাস নিতে থাকেন এবং বেশ কিছুক্ষণ জোরে নাক ডাকতে থাকেন। অনুমোদিত প্রোটোকলে দুই ডোজের বেশি ইনজেকশন দেওয়ার সুযোগ না থাকায় রাত ৮টা ৫৩ মিনিটে মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করে তাকে 'জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা' দেওয়া শুরু হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পর্যন্ত পাইকের সঠিক শারীরিক অবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি কারাকর্তৃপক্ষ। তবে ঘটনার পরপরই তার আইনজীবীরা মার্কিন সুপ্রিম কোর্টসহ সিক্সথ সার্কিট আদালতে জরুরি আবেদন দাখিল করেন।
তাদের দাবি, অপরীক্ষিত বা ঝুঁকিপূর্ণভাবে দুই ডোজ প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন প্রয়োগের ফলে পাইক চরম শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মুখে পড়েছেন, যা মার্কিন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে বর্ণিত 'ক্রুয়েল এন্ড আনইয়োজোয়াল পানিশসেন্ট' বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
এর আগে ১৯৪৭ সালের 'লুইসিয়ানা বনাম রেসওয়েবার' মামলায় যন্ত্রপাতির ত্রুটির কারণে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বাঁচা আসামিকে দ্বিতীয়বার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু পাইকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার আইনজীবীরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, উচ্চ প্লাটিলেটজনিত রোগ 'থ্রম্বোসাইটোসিস' ও শিরা না পাওয়ার জটিলতার কারণে পাইকের ক্ষেত্রে এই ইঞ্জেকশন প্রয়োগ অস্বাভাবিক ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগের পর বেঁচে যাওয়ার এই ঘটনা তাদের আইনি দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। আদালতকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, দ্বিতীয়বার পাইককে মৃত্যুদণ্ড কক্ষে পাঠানো সাংবিধানিক ঝুঁকির সৃষ্টি করে কি না।
দুই ডোজ ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর পাইকের ঠিক কী ঘটেছিল?
বুধবার সকাল ১০টায় পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রাথমিক সূচি ছিল। তবে শৈশবে মারাত্মক যৌন নিপীড়ন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য জুরি বোর্ডের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখতে মার্কিন সিক্সথ সার্কিট কোর্ট অব আপিলস শেষ মুহূর্তে ১ ঘণ্টার স্থগিতাদেশ দেয়। পরবর্তীতে রাজ্য সরকারের আপিলে রাতারাতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ বাতিল করলে রাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মেডিকেল ও সংবাদক্ষেত্রের প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, রাত ৭টা ২৭ মিনিটে পর্দা খোলার পর পাইককে একটি ট্রলিতে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। সে সময় তিনি পূর্ণ সচেতন ছিলেন এবং হাত ও বাহুর অস্বাভাবিক অনুভূতির বিষয়ে কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান।
রাত ৮টা ২৬ মিনিটের মধ্যে পেন্টোবার্বিটালের দ্বিতীয় সিরিঞ্জ খালি করা হলেও পাইক অচেতন হননি। বন্ধ পর্দার পেছন থেকে দীর্ঘক্ষণ তার শ্বাসপ্রশ্বাস ও নাক ডাকার শব্দ শুনতে পান প্রত্যক্ষদর্শীরা। ডেক্সট্রোজ বা অন্য বিষাক্ত রাসায়নিকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরপরই রাত ৮টা ৫৩ মিনিটে সম্প্রচার মাইক্রোফোন বিচ্ছিন্ন করা হয়।
সচরাচর ইঞ্জেকশন শিরায় প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে বন্দি বেঁচে যাওয়ার নজির থাকলেও, বিষাক্ত ওষুধ পুরো শরীরে প্রবেশের পরও কারও বেঁচে থাকার ঘটনাকে ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টার (ডিপিইসি) 'সম্পূর্ণ নজিরবিহীন' বলে উল্লেখ করেছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ক্রিস্টা পাইক হতেন গত ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে টেনেসির ইতিহাসে প্রথম এবং ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় মৃত্যুদণ্ড চালুর পর থেকে দেশজুড়ে দণ্ডপ্রাপ্ত মাত্র ১৯তম নারী।
কেন মৃত্যুদণ্ড পেলেন ক্রিস্টা পাইক?
এই মামলার পটভূমি ১৯৯৫ সালের। তৎকালীন ১৮ বছর বয়সী পাইক ও তার ১৭ বছর বয়সী প্রেমিক বিলি রে শিপ নক্সভিলের একটি কাজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পড়াশোনা করতেন। পাইকের সন্দেহ ছিল, তার সহপাঠী ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমার তার প্রেমিককে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই অমূল্যের বশবর্তী হয়ে ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি স্লেমারকে ফুসলিয়ে একটি নির্জন বনাঞ্চলে নিয়ে যান তারা।
সেখানে স্লেমারকে চরম নির্মমতায় বক্স কাটার দিয়ে ক্ষতবশত করা হয় এবং ভারী পিচঢালা পাথরের খণ্ড দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। স্লেমারের শরীরে শয়তানের প্রতীক হিসেবে তারা আকৃতির (পেন্টাগ্রাম) চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে জুরি বোর্ড পাইককে ফার্স্ট-ডিগ্রি মার্ডারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার প্রেমিক শিপকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
কারাগারে দীর্ঘ তিন দশক কাটানোর সময় পাইকের শরীরে বাইপোলার ডিজঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) শনাক্ত হয়। তিনি বহুবার নিজের অপরাধ স্বীকার করে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন এবং জানিয়েছেন, মানসিকভাবে চরম অসুস্থ থাকা অবস্থায় ক্ষোভের বশে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ অবশ্য দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে পাইকের চূড়ান্ত সাজা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
তবে পাইকের অল্প বয়স, শৈশবের ভয়ঙ্কর নির্যাতনের ইতিহাস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ বিচার না করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে বিতর্ক দেখা যায়। তারা ক্রিস্টা পাইকের এ কর্মের জন্য তার মাকে দায়ী করেন। তারা যুক্তি দেখান, তার মা ক্রিস্টা গর্ভে থাকাকালীন অনিয়ন্ত্রিত মদ্যপান করতেন। আর তা ক্রিস্টার অপরিণত বয়সে মানসিক ও শারীরিকভাবে ব্যাপকভাবে খারাপ প্রভাব ফেলে।
