চার মাস পরেও ২০,০০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের অর্থছাড় মাত্র ১১০ কোটি টাকা
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো ফের চালু করতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চরম ধীরগতির মুখে পড়েছে। আর্থিক সংকটে থাকা ব্যবসাগুলোর ওপর নতুন করে ঝুঁকি নিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দ্বিধাদ্বন্দ্বে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত জুনে এই স্কিম ঘোষণার চার মাস অতিবাহিত হলেও, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মাত্র ৮০০ কোটি টাকার ঋণের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মাত্র ১১০ কোটি টাকা ছাড় করা গেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে উঠে এসেছে।
ঋণ বিতরণের এই ধীরগতি মূলত এক কাঠামোগত বাধা বা সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। আর সেটি হলো: কেন্দ্রীয় ব্যাংক কম সুদে তারল্য সুবিধা দিলেও, ঋণের পুরো ক্রেডিট ঝুঁকি বহন করতে হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেই। কারণ ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও টিকে থাকার সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের দায়িত্ব শুধু ব্যাংকগুলোর ওপরই দেওয়া হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার অধীনে, ঋণগ্রহীতারা আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আবেদন করেন। এরপর ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব মূল্যায়নে অনুমোদিত আবেদনগুলো অর্থায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠায়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন–বিজিএমইএ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করায় অডিট শেষে—তারা এই স্কিমের জন্য প্রায় ২০০টি পোশাক কারখানাকে প্রত্যয়নপত্র (সার্টিফিকেট) দিয়েছিল। তবে সংগঠনটির মতে, এপর্যন্ত এর একটি কারখানাও কোনো তহবিল পায়নি।
"আমাদের জানা মতে, এই স্কিমের অধীনে এপর্যন্ত একটি কারখানাও ফান্ড পায়নি," বলেন বিজিএমইএ-এর সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী। টিবিএস-এর সাথে আলাপকালে চারজন কারখানা মালিকও নিশ্চিত করেন যে, তারা এখনো তহবিল ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এই স্থবিরতার চিত্র মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার ১৫টি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সামগ্রিক ধীরগতিরই প্রতিফলন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব তহবিলে মোট ৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকার জন্য আবেদন জমা পড়েছে। এরমধ্যে বিভিন্ন স্কিমের অধীনে বিতরণকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।
গত ২৩ মে উন্মোচিত এই ৬০ হাজার কোটি টাকার সামগ্রিক প্রণোদনা প্যাকেজের মূল লক্ষ্য ছিল—বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা, স্থবির হয়ে পড়া রপ্তানি পুনরুজ্জীবিত করা এবং সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মতো সুলভ সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
প্যাকেজ চালুর সময় গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান উল্লেখ করেছিলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। মোট বরাদ্দের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়নের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯,০০০ কোটি টাকা জোগান দেবে।
ঝুঁকি এড়িয়ে চলা ও উদ্বৃত্ত তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য
বাণিজ্যিক ব্যাংকারদের যুক্তি হলো, কেবল সস্তা অর্থায়নের সুবিধা পেলেই ঝুঁকি মূল্যায়নের বিচক্ষণতাকে উপেক্ষা করা যায় না। শীর্ষস্থানীয় একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "ঋণের ঝুঁকি যদি বেশি হয়, তবে চূড়ান্ত দায়ভার আমাদের ব্যালেন্স শিটের ওপরই এসে পড়ে। বন্ধ কারখানাগুলো মূলত অকার্যকর বা ব্যর্থ প্রকল্প। ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তবসম্মত রূপরেখা ছাড়া ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না।"
অপর এক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার উল্লেখ করেন যে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে অর্থায়নের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে ব্যাংকগুলো প্রণোদনা সুবিধার আওতায়—নিশ্চিত রিটার্ন বা মুনাফা পেতে, তাদের উদ্বৃত্ত তারল্য সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতেই বেশি পছন্দ করছে।
গত ৫ জুন গঠিত তিন বছর মেয়াদী এই ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলটি—বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে তারল্য সহায়তা দিয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে অর্থ নিয়ে, চূড়ান্ত ঋণগ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারে। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার আগে স্কিমটি ছয় মাসের সুদের ছাড় (গ্রেড পিরিয়ড) প্রদান করে। এ ছাড়া তহবিল প্রাপ্যতা ও পারফরম্যান্স সাপেক্ষে—নবায়নযোগ্য এই ঋণের মেয়াদ এক বছর। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের জন্য সর্বোচ্চ ঋণের সীমা ২০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে তহবিল থেকে বিতরণ কম হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টিবিএসকে জানান, এই সতর্কতা ইচ্ছাকৃত এবং প্রয়োজনীয়।
আরিফ হোসেন খান বলেন, "বন্ধ কারখানায় ঋণ দেওয়া আমাদের জন্য একটি আনটেস্টেড (অপরীক্ষিত) মডেল। যেহেতু এখানে জনগণের আমানতের টাকা জড়িত, তাই আবেদনকারীদের পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করতে সময় লাগছে। আমরা ইচ্ছেকৃত খেলাপি বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি—এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধা দেব না। শুরুতে অগ্রগতি কিছুটা ধীরগতির হলেও, যোগ্য আবেদনগুলো অনুমোদিত হলে এর গতি বাড়বে।"
নতুন মূলধনের পূর্বশর্ত হিসেবে পুনর্গঠন
এই অচলাবস্থা কাটানোর জন্য কিছু ব্যাংক নতুন ঋণ দেওয়ার আগে, সংকটাপন্ন গ্রাহকদের সম্পদ বিক্রি এবং নতুন মূলধন বা ইকুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠন করার শর্ত আরোপ করছে।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন ব্যাখ্যা করে বলেন যে, তাদের ব্যাংক কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণপ্রস্তাব তৈরি করেছে—তবে শর্ত হলো, বিদ্যমান দায় বা বকেয়া সমন্বয় করতে আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে অতিরিক্ত জামানত জমা দিতে হবে, অথবা নিজস্ব সম্পদ বিক্রি করতে হবে।
তিনি আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের উদাহরণ দিয়ে জানান, প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক এশিয়ার দায় মেটাতে আবুল খায়ের গ্রুপের কাছে নিজেদের সম্পদ বিক্রি করেছিল। পরবর্তীতে নতুন ইকুইটি যুক্ত হওয়ায়– চিনি শোধনাগারটি এখন পুনরায় চালুর অবস্থায় পৌঁছেছে। একইভাবে, বেঙ্গল প্লাস্টিক তাদের নির্মাণাধীন সুইস টাওয়ার বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেছে, এতে তাদের ব্যালেন্স শিটের উন্নতি হওয়ায়, তার বিপরীতে ব্যাংক এশিয়া কম খরচের পুনঃঅর্থায়ন অনুমোদন করতে পেরেছে।
নতুন অর্থায়ন দেওয়ার আগে অন্যান্য সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ব্যাংক এশিয়া।
"এটি উভয় পক্ষের জন্যই একটি উইন-উইন পজিশন তৈরি করেছে," বলেন সোহেল। তিনি আরও জানান, এই প্রক্রিয়া ব্যাংককে খেলাপি ঋণ কমাতে সাহায্য করার পাশাপাশি, নতুন মূলধন জোগান দেওয়ার মাধ্যমে সংকটাপন্ন কোম্পানিগুলোকেও টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে।
সিটি গ্রুপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "কোম্পানিটিকে আগে সম্পদ বিক্রি করে নিজস্ব মূলধন বা ইকুইটি আনতে হবে। শুধু ব্যাংকের ঋণে তাদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।"
চূড়ান্তভাবে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা পোশাক শিল্প মালিকদের
ব্যাংকিং খাতের এই সতর্ক অবস্থান– এমন এক চরম সংকটময় সময়ে আসছে, যখন আংশিকভাবে চালু থাকা কারখানাগুলো ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ধাক্কা, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অব্যাহত সংকট এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে, টিকে থাকার লড়াই করছে।
ঢাকার নওফস গার্মেন্টস লিমিটেড দুই মাস আগে উত্তরা ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা শাখার মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করেছিল, কিন্তু এখনো তা অনুমোদিত হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর ইসলাম বলেন, "যদি এই লোন ছাড় না হয়, তাহলে আমাদের শ্রমিকদের বেতন দিতে না পারার মতো ঝুঁকি তৈরি হবে এবং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে।"
বার্ষিক ১২০ কোটি টাকার রপ্তানি এবং ৮৫০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান করা এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ওপর লেনদেন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং রপ্তানি আয় প্রক্রিয়াকরণে ছয় সপ্তাহের বিলম্বের কারণে তাদের সাপ্লাই চেইনে স্থবিরতা তৈরি হয়। এই অবস্থাতেও বায়ারদের ধরে রাখতে পারে তারা। এখন নতুন রপ্তানি আদেশ ফিরে আসা সত্ত্বেও—নগদ মূলধনের অভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির।
একইভাবে, চট্টগ্রামের ক্লাসিক্যাল ফ্যাশন লিমিটেড উত্তরা ব্যাংকের লালদীঘি শাখার মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়নের জন্য আবেদন করেছিল। শতভাগ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠানটির কর্মীর সংখ্যা ৬৫০ জন থেকে কমে বর্তমানে ১৫০ জনে নেমে এসেছে। কারখানার ৪৫০টি সেলাই মেশিনের মধ্যে চালু রয়েছে মাত্র ১২০টি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, "ব্যাংক কর্মকর্তারা আমাদের জানিয়েছেন, তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এখনো কোনো তহবিল বা নির্দেশনা পাননি।" তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বাতিল হওয়া রপ্তানি আদেশ এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্কের ফলে, তাদের নগদ অর্থপ্রবাহের ব্যাপক ক্ষয় করেছে। তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া গেলে, তাদের বিদ্যমান অবকাঠামোর দিয়েই কারখানাটিকে আবারো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা যাবে।
