অমুককে বোর্ড সদস্য-চেয়ারম্যান করতে হবে—এরকম অনেক চাপ আছে, তবে আমরা রাজনৈতিক নিয়োগ দেব না: অর্থমন্ত্রী
'অমুককে বোর্ডের সদস্য বা চেয়ারম্যান করতে হবে'—এমন নানা চাপ থাকলেও আর্থিক খাতে সরকার কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেবে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, 'কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না, দেওয়া হবে না। এটি সরকারের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত।'
আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাজধানীর পূর্বানী হোটেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'আমার ওপর অনেক চাপ আছে। আপনারা জানেন, ১৭ বছর পর একটি দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন আমার ওপর অনেক চাপ এসেছে। অমুককে বোর্ডের সদস্য করতে হবে, চেয়ারম্যান করতে হবে, এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে। কিন্তু নাথিং ডুয়িং। আমরা এখানে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেব না। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে পলিটিসাইজেশন করা যাবে না। আমরা কোনো পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছি না। কোনো ব্যাংক ও ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনে রাজনৈতিক নিয়োগ দিচ্ছি না, দেবও না।'
আইসিবির প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, 'ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার পর আইসিবি অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মূল ধারণা ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মার্কেট-বেসড, অর্থাৎ মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে নেওয়া এবং পুঁজিবাজারকে সেই অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা।'
আইসিবির পক্ষ থেকে বিশেষ সুবিধা ও কর ছাড়ের প্রস্তাবের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'কেবল কর ছাড় দিলেই তো চলবে না, আইসিবিকে প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। সরকারের অনুগ্রহ বা আশীর্বাদ দিয়ে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বাজারভিত্তিক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।'
উল্লেখ্য, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নতুন নতুন শিল্প উদ্যোগ গড়ে তুলতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান আইসিবি ১৯৭৬ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয়। ৫০ বছর পূর্তিতে এসে সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করলেও প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে কিছুটা আর্থিক সংকটে রয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও আর্থিক পরিকল্পনার বিবরণ দিতে গিয়ে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় ঘুরে দাঁড় করানোর বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি পূর্বে নেওয়া উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধে সরকারের কাছে স্বল্প সুদে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল সহায়তা, ক্যাপিটাল রিকনস্ট্রাকচারিং, পণ্য বৈচিত্র্যায়ন এবং কর ছাড়ের জোর দাবি জানান।
বর্তমান শেয়ারবাজারের চিত্র তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, 'প্রথমত, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখন অনেক বেশি রিটেল-বেসড হয়ে গেছে। অথচ সারা বিশ্বে ক্যাপিটাল মার্কেট মূলত ইনস্টিটিউশনাল ইনভেস্টমেন্টনির্ভর, রিটেল বিনিয়োগের অংশ তুলনামূলকভাবে খুবই ছোট। বাংলাদেশে চিত্রটা পুরোপুরি উল্টো। তাই রিটেল-বেসড বাজার থেকে একটি ইনস্টিটিউশনাল-বেসড মার্কেট তৈরি করার ক্ষেত্রে আইসিবির জন্য বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'আইসিবির অপারেশনও সেভাবেই পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় আইসিবির মাধ্যমে বিনিয়োগে যাবে, সেই বিনিয়োগ অর্থনীতিতে অবদান রাখবে—এটাই ছিল মূল ধারণা। এত বছর পর, নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইসিবিকে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'এর বাইরে, আমাদের বেসরকারি খাত থেকে যারা এসেছেন, তাদের অনেকে বলেছেন, তারা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে চান। আইসিবিকেও সেই জায়গায় যেতে হবে।'
সাম্প্রতিক জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে নিউ ইয়র্কের ওয়ালস্ট্রিটে আয়োজিত ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, 'বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো প্রধানমন্ত্রী ওয়ালস্ট্রিটে গিয়ে সেখানকার শীর্ষ বিনিয়োগকারী ও বড় তহবিল ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর আগে কখনো এমন বৈঠক হয়নি। বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় ফান্ড ম্যানেজাররা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।'
