অবসায়ন হতে যাওয়া ৪ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীরা ফেরত পাবেন ৫০ লাখ টাকা
অবসায়নের (বিলুপ্তি) প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকবহির্ভূত চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ব্যক্তি আমানতকারীদের জমানো অর্থ ফেরত দিতে একটি নতুন স্কিম তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে প্রতিটি ব্যক্তি আমানতকারী তাদের মূল টাকার সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। তবে আমানতের পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে নির্ধারিত হারে অর্থ কেটে রেখে বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
পূর্বে আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন এই স্কিম প্রণয়ন করে আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠান চারটি হলো—আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, চার প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল আমানত ফেরত দেওয়া হবে। তবে ৫০ লাখ টাকার বেশি যাদের জমা আছে, তাদের মূল টাকা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কেটে রেখে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
আমানত ফেরতের নতুন স্কিম অনুযায়ী কেটে রাখার হিসাব:
৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত: আমানতকারীরা পাবেন সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা।
১ কোটি থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত: প্রথম ১ কোটি টাকার জন্য ৮০ লাখ টাকা এবং ১ কোটি টাকার অতিরিক্ত অংশের ৫০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে।
১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত: প্রথম দেড় কোটি টাকার বিপরীতে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং দেড় কোটির অতিরিক্ত অংশের ৪০ শতাংশ পাবেন গ্রাহক।
২ কোটি টাকা বা তার বেশি: প্রথম ২ কোটি টাকার জন্য ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং ২ কোটি টাকার অতিরিক্ত অংশের ৩০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে।
প্রতিষ্ঠানের বর্তমান চিত্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
চলতি বছরের ৯ আগস্ট এই চারটি এনবিএফআইয়ের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদ শূন্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রশাসকদের কাজের সহায়তার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত দুজন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়েছে।
জানা গেছে, বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা এই চার প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এই ঋণ পরিস্থিতির কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে এই চার প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ ১২ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সে ৫ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৩ হাজার ১২ কোটি টাকা, এফএএস ফাইন্যান্সে ১ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৪৪৯ কোটি টাকা আমানত রয়েছে।
অন্যান্য দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি
গত বছরের মে মাসে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০টি এনবিএফআইয়ের লাইসেন্স বা নিবন্ধনের সনদ কেন বাতিল করা হবে না—তা জানতে চেয়ে নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় প্রথম ধাপে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে বন্ধের জন্য বেছে নেওয়া হয়। তবে চূড়ান্ত ধাপে ৫টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে পিপলস লিজিংকে ঘিরে আইনি ও মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা থাকায় সেটির বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারলে এগুলোকেও বন্ধের আওতায় আনা হবে। সময় পাওয়া প্রতিষ্ঠান চারটি হলো—প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি) এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড।
