ন্যাটো সম্মেলন শেষে বিমান বদলের কথা স্বীকার করলেন ট্রাম্প; বললেন, ‘এ রকম হুমকি অনেক পাই’
গত মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় একটি সম্ভাব্য জীবননাশের হুমকির কারণে গোপনে বিমান বদল করেছিলেন বলে স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি সিক্রেট সার্ভিস এবং সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলি। তারা আমাকে একটি ভিন্ন ফ্লাইট এবং ভিন্ন বিমানে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। তারা যা বলে আমাকে কেবল সেটিই করতে হয়।'
গত ৮ জুলাই টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে ট্রাম্প প্রথমে 'এয়ার ফোর্স ওয়ান'-এ চড়েছিলেন এবং পরে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের সাহায্যে তাকে গোপনে একটি সামরিক বিমানে স্থানান্তর করা হয়েছিল—এমন সংবাদ প্রকাশের পরই প্রেসিডেন্টের এই স্বীকারোক্তি এলো।
শেষ মুহূর্তের এই নাটকীয় বিমান বদলের ফলে ছদ্মবেশী বা ডিকয় বিমানে থাকা অন্যান্য আরোহী ও সাংবাদিকেরা ঝুঁকির মুখে পড়েছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ট্রাম্প গত মঙ্গলবার দাবি করেছেন যে, তিনি যে সামরিক বিমানটিতে চড়েছিলেন সেটিই আসলে 'আরও বড় ঝুঁকিতে' ছিল।
কর্মকর্তারা বিবিসির মার্কিন সহযোগী গণমাধ্যম সিবিএস নিউজ-কে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বিমান লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য হুমকি শনাক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
বিমানে থাকা সাংবাদিক এবং হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা জানতেনই না যে, সম্ভাব্য ইরানি হুমকির মুখে একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে গোপনে বিমান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন যে, আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনের সময় তিনি ইরানের 'এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু' ছিলেন।
গত মঙ্গলবার ওহায়োতে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য এয়ার ফোর্স ওয়ানে যাওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট বলেন, 'আমি অনুমান করছি সেখানে একটি হুমকি ছিল। আমি এ নিয়ে খুব একটা বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করিনি। আমি এ রকম অনেক হুমকি পাই।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'আমি এমন অনেক হুমকির মুখোমুখি হই যা আপনারা জানেন না।'
গত মাসের এই গোপন কসরতটি এমন এক সময়ে করা হয়েছিল, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলা শুরু করেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী।
ট্রাম্প কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া একটি নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে চড়ে তুরস্কে এসেছিলেন। তবে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে 'পুরোনো দিনের স্মৃতির খাতিরে' তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে ফিরে যাবেন। গত ৮ জুলাই আঙ্কারা বিমানবন্দরে তাকে প্রেসিডেন্ট জেটে চড়তে দেখা গিয়েছিল।
তবে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি এয়ার ফোর্স ওয়ানের যে পাশে চড়েছিলেন, তার ঠিক উল্টো পাশে বিমানের সমান্তরালে উঁচু করা একটি ক্যাটারিং ট্রাকে চড়ে তিনি বিমান থেকে নিচে নেমে যান। সেখান থেকে তাকে গোপনে একটি ছোট 'সি-৩২এ' সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়—যা মূলত ভাইস প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত একটি পরিবর্তিত বোয়িং ৭৫৭ বিমান।
পত্রিকাটি জানিয়েছে, ফ্লাইটটিকে স্বাভাবিক দেখানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আলাদাভাবে বাইরের সিঁড়ি ব্যবহার করে সি-৩২এ বিমানে চড়েছিলেন।
এদিকে সাংবাদিক এবং হোয়াইট হাউসের কর্মীরা এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়ার পর তাদের জানালার পর্দা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তারা জানতেনই না যে প্রেসিডেন্ট আর বিমানে নেই।
বিমানে থাকা মিডিয়া পুলের একজন প্রযোজক জানিয়েছেন, যখন তাদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, তখন বিষয়ট তাদের কাছে বেশ অস্বাভাবিক লেগেছিল। একজন ফটোগ্রাফার ক্ষণিকের জন্য পর্দা খুললে তাকে দ্রুত তা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিবেদনে ওই প্রযোজকের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তারা আরও উল্লেখ করেছেন, গণমাধ্যমকর্মীরা যখন এসেছিলেন তখন বিমানের সামনে ও পেছনে দুটি ক্যাটারিং ট্রাক দাঁড়ানো ছিল এবং বিমানবন্দরে মোটরকেডের অনেক পেছনে মিডিয়া ভ্যান থাকায় রাষ্ট্রপতির বিমানে চড়ার ছবি তোলা সম্ভব হয়নি।
তবে এই চক্রান্ত সফল রাখতে ট্রাম্পের সি-৩২এ বিমানটি 'রিচ ১৮' কল সাইন ব্যবহার করেছিল, আর সাংবাদিকদের বহনকারী বিমানটি যথারীতি 'এএফ১' কল সাইন ব্যবহার করা করা অব্যাহত রেখেছিল।
ট্রাম্প এরপর আমেরিকার পথে যুক্তরাজ্যে অবতরণ করেন এবং সেখানে আরএএফ মাইল্ডেনহলে বিমান অবতরণের পর তাঁকে আবার সেই পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নামতে দেখা যায়। তিনি কীভাবে সি-৩২এ থেকে আবার পুরোনো জেটে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সবশেষে রাষ্ট্রপতি ওয়াশিংটনে ফিরে যাওয়ার জন্য কাতার থেকে পাওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে স্থানান্তরিত হন।
সেই ফ্লাইটের সময় ট্রাম্প বিমানে থাকা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন। সেখানে তিনি ইরানের হুমকির কথা উল্লেখ করলেও পূর্ববর্তী বিমান বদলের বিষয়টি গোপন রাখেন।
তুরস্ক থেকে আসার সময় কেন সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল—জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প সে সময় বলেছিলেন, 'কারণ কিছু লজ্জাজনক লোকদের সাথে আমাদের ডিল করতে হয়, যার ফলে আপনারা হয়তো একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে ছিলেন।'
তিনি বলেন, তার জীবনের ওপর 'সবসময় হুমকি থাকে' এবং তিনি ইরানের 'তালিকায়' 'এক নম্বর' স্থানে রয়েছেন।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস-এর আমেরিকা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হোসে জামোরা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের 'প্রেসিডেন্টের কভারেজে নিয়োজিত সাংবাদিকদের
অহেতুক বিপদের মুখে না ফেলার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'সাংবাদিকদের অবশ্যই এ ধরনের বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকির বিষয়ে অবহিত করা উচিত, যা তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।'
