‘একটি টুইট, বিমানবাহী রণতরি বা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ দখল করা যাবে না’: ইরান
হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির এক শীর্ষ কূটনীতিক জোর দিয়ে বলেছেন, এই প্রণালিটি এককভাবে ইরানের এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে নিজেদের পরাজয় স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি শুক্রবার মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, 'একটি টুইট, একটি বিমানবাহী রণতরী, একটি নির্দেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা যাবে না।' তিনি আরও যোগ করেন, 'ইরান কোনো হুমকিতে ভয় পায় না এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তেহরানকে স্তব্ধ করা যাবে না।'
ঘারিবাবাদি তার পোস্টে লিখেছেন, 'হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে। এই প্রণালি বন্ধ এবং উন্মুক্ত করার বিষয়টি কেবল ইরানের নির্দেশেই ঘটবে। যতক্ষণ না আপনারা আপনাদের পরাজয়ের বাস্তবতা স্বীকার করছেন এবং অলীক কল্পনা পরিহার করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ বলবৎ থাকবে।'
এর আগে শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে সম্পূর্ণ অবরোধ কার্যকর করছে। তিনি দাবি করেন, 'ইরানকে পুরোপুরি পরাজিত করার পর আমি খুব শীঘ্রই হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব।' ট্রাম্প একই সঙ্গে আমেরিকানদের আহ্বান জানান, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালীন পেট্রোলের সামান্য বর্ধিত মূল্য যেন তারা মেনে নেন।
ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি সেখানে তার হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখে, নৌ-অবরোধ বজায় রাখে এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গত জুনের ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির শর্তগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে এই প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে না।
ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ লিখেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের 'পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ' রয়েছে এবং তিনি বিশ্বাস করেন তারা এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবেন।
অন্যদিকে, ইরানের যুদ্ধ সমন্বয়কারী সর্বোচ্চ সামরিক সংস্থা খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি শুক্রবার বলেছেন, 'ইরানের অনুমতি এবং তদারকি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজকে যাতায়াত করতে দেওয়া হবে না।'
জাহাজ ট্র্যাকিং ফার্ম 'কেপলার'-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলমান উত্তেজনার মধ্যে শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র দুটি জাহাজ পারাপার হয়েছে। এর মধ্যে একটি শস্যবাহী জাহাজ ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করেছে এবং অন্য একটি খালি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ বিপরীত দিকে গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, তরল পেট্রোলিয়াম পণ্যবাহী আরেকটি খালি ট্যাঙ্কার প্রণালি দিয়ে উপসাগরের দিকে যাচ্ছিল। তবে কোনো অপরিশোধিত তেলের চালান দেখা যায়নি।
কিছু জাহাজ হয়তো ট্র্যান্সপন্ডার বন্ধ রেখে ট্র্যাকিং এড়িয়ে প্রণালি পার হতে পারে, তবে এই সংখ্যাটি যুদ্ধের আগে প্রতিদিন যাতায়াত করা ১৩০টিরও বেশি জাহাজের সংখ্যার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের 'আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি' জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রণালি পার হওয়ার সময় তাদের দুটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। পরবর্তীতে আমিরাতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ডব্লিউএএম জানায়, শুক্রবারও আরেকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
ইরান এই প্রণালিতে তাদের কঠোর অবস্থানকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে চিহ্নিত করছে, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলো থেকে জাহাজ বের হওয়ার বিরুদ্ধে তাদের হুমকিকে অবরোধ হিসেবে বর্ণনা করছে।
যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে জুনে নেওয়া একটি সাময়িক চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার কোনো পরিকল্পনা করছে বলে মনে হচ্ছে না।
শনিবার 'ইরানিয়ান স্টুডেন্ট নিউজ এজেন্সি'র প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
আরাগচি বলেন, মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার এবং পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ও বার্তা আদান-প্রদান করছে, তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার পর্যায়ে পড়ে না।
