ইরান যুদ্ধে ৪৫টি রিপার ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, প্রতিটির খরচ ৫০ মিলিয়ন ডলার
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে অন্তত ৪৫টি 'এমকিউ-৯ রিপার' ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, এ সংখ্যা দেশটির মোট রিপার ড্রোনের প্রায় ২৫ শতাংশ।
রিপার ড্রোন মূলত নজরদারি ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সেন্সর ও অস্ত্রের ধরনভেদে প্রতিটি ড্রোনের দাম ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ডলার (প্রায় ৫০ মিলিয়ন)। ফলে সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতিতে শুধু এই ড্রোন ব্যবস্থাতেই মার্কিন করদাতাদের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলারের বেশি।
হরমুজ প্রণালির আশপাশে এসব ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি ইরান যুদ্ধের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে রিপার ড্রোন তুলনামূলক ধীরগতির এবং প্রায়ই নিচু উচ্চতায় উড়ে। ফলে ইরানের সামরিক বাহিনী এবং ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা দেশটির আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য এগুলো তুলনামূলক সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হারানো সব রিপার গুলি করে ভূপাতিত করা হয়নি। কিছু ড্রোনের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর সেগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনকে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার কারণেও দেশটির অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতের ওপর চাপ বাড়ছে।
যুদ্ধের প্রথম মাসেই মার্কিন বাহিনী ৮৫০টির বেশি 'টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র' এবং ১ হাজারের বেশি 'প্যাট্রিয়ট' ও 'টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স' বা 'থাড' ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এতে দীর্ঘপাল্লার হামলার সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অস্ত্রের এই ঘাটতি ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা চলার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক বিকল্পও সীমিত করেছে। কোনো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সম্ভাবনা কম মনে হলে সেটি প্রতিহত না করে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখছেন আঞ্চলিক মার্কিন কমান্ডাররা।
পেন্টাগন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবর তারা নিয়মিতই অস্বীকার করে আসছে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটানো এবং অস্ত্রের মজুত পূরণ করতে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে কয়েক হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত অর্থ চেয়েছে।
গত ৩১ জুলাই মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকের ফাঁকে ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে মার্কিন অস্ত্রের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন বলে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে।
অস্ত্রের ঘাটতি ইরানকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশটি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের নির্দেশে যুদ্ধ শুরুর পর হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি আরও জোরালো করেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে প্রায় ১৮৫টি রিপার ড্রোন ছিল। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর ১৬৫টি এবং মেরিন কোরের ২০টি। তবে এ হিসাবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যবহৃত রিপার ড্রোন ধরা হয়নি।
মেরিন কোরের কোনো রিপার এখনো হারায়নি বলে জানিয়েছেন বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোশুয়া বেনসন। এসব ড্রোন মূলত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়।
মে মাসে পেন্টাগনের বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেভিড ট্যাবর সিনেটে জানিয়েছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা রিপার ড্রোনের সংখ্যা কমে প্রায় ১৩৫টিতে দাঁড়িয়েছিল। তিনি এ ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, দ্রুত ড্রোনের বহর পুনর্গঠনের উপায় খুঁজছে বিমানবাহিনী।
পেন্টাগন ধীরে ধীরে জেনারেল অ্যাটমিকসের তৈরি 'রিপার' ড্রোন ব্যবহার বন্ধ করার পথে এগোচ্ছে। এর পরিবর্তে কম খরচের এমন সশস্ত্র নজরদারি ড্রোনের নতুন বহর তৈরির পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র, যেগুলো একসঙ্গে 'ঝাঁক' তৈরি করে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারবে।
এদিকে ইরান যুদ্ধের জন্য ৬৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বাজেট অনুমোদনে কংগ্রেসের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রশাসনের দাবি, পেন্টাগনের অস্ত্রভান্ডার দ্রুত পূরণ করতে এই অর্থ জরুরি। তবে অর্থ অনুমোদন হলেও ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত এবং ইউক্রেনকে পাঠানো অস্ত্রের কারণে কমে যাওয়া মজুত পুরোপুরি পূরণ করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
জুলাইয়ে সিনেটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, দ্রুত অতিরিক্ত অর্থ না পেলে ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সামলাতে সামরিক প্রশিক্ষণ কমাতে হবে। তার হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ যুদ্ধের ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে। তবে ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি পুনর্নির্মাণের খরচ এতে ধরা হয়নি।
যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত অর্থ জোগাড়ের কৌশল নিয়েও কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আগস্টের ছুটিতে এরই মধ্যে ওয়াশিংটন ছেড়েছেন তারা।
এ সপ্তাহে রক্ষণশীল থিংকট্যাংক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (এইআই) গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের উৎপাদন বাড়াতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নেওয়া উদ্যোগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে পেন্টাগনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিরক্ষা শিল্পের কারখানাগুলোর উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পূরণ করতেই কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন মিসাইল ডিফেন্স এজেন্সি বছরে সর্বোচ্চ ৯৬টি থাড ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে পারে। অথচ আগামী বছরের প্রতিরক্ষা বাজেটে পেন্টাগন ৮৫৭টি এবং আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি থাড চেয়েছে। বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকলে এই চাহিদা পূরণে প্রায় ২৭ বছর সময় লাগবে বলে এইআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির লেখক ও এইআইয়ের সিনিয়র ফেলো টড হ্যারিসন জানান, একটি থাড ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে প্রায় তিন বছর সময় লাগে।
তিনি বলেন, 'আজই এগুলোর অর্ডার দিলেও সরবরাহ পেতে পেতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।'
এইআইয়ের পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে বলে উঠে এসেছে।
হেগসেথ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র তৈরির দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। উৎপাদন বাড়াতে পেন্টাগন যেগুলোকে 'ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি' বলছে, সেগুলোও নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি বা অর্থায়ন করা হয়নি।
