আদমজী ইপিজেডের রপ্তানি ছাড়াল ১ বিলিয়ন ডলার, ঝুঁকছে উচ্চমূল্যের পণ্যে
নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলের পরিত্যক্ত শিল্পভূমিতে গড়ে ওঠা আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি ও কর্মসংস্থান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্ণ হওয়ার আগেই ইপিজেডটির বার্ষিক রপ্তানি ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা ৪৭টি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ।
এখানে ৪৭টি উৎপাদন ইউনিটে উৎপাদিত তৈরি পোশাক, ব্রাইডাল পোশাক, সেফটি ফুটওয়্যার, অটোমোটিভ যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, আদমজী ইপিজেডে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৮৪৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ১১ দশমিক ১১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইপিজেডটির বার্ষিক রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ১ দশমিক ১৭৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা মূল প্রকল্প প্রস্তাবে নির্ধারিত ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।
আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, টানা দ্বিতীয় অর্থবছরের মতো ইপিজেডটির রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, "প্রকল্প প্রস্তাবে ইপিজেডটি পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানির প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে এলে বার্ষিক রপ্তানি দেড় বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।"
তিনি আরও জানান, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখনো বেশ ভালো। তবে ইপিজেডের সব প্লট ইতোমধ্যে বরাদ্দ হয়ে গেছে।
"আমরা ইপিজেডটি আরও সম্প্রসারণের চেষ্টা করছি," বলেন তিনি।
৭৬ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান
বেপজার তথ্য অনুযায়ী, ২৯২ একর আয়তনের আদমজী ইপিজেডে বর্তমানে ৭৬ হাজার ২৭ জন কর্মরত আছেন। নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে এলে সরাসরি কর্মসংস্থান ১ লাখ ছাড়াতে পারে।
এখানকার কারখানাগুলো টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, মাইকেল করস ও ভ্যান হিউসেনের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক উৎপাদন করে। পাশাপাশি সেফটি ইকুইপমেন্ট, ফুটওয়্যার ও অটোমোটিভ পণ্যও তৈরি হচ্ছে, যা প্রচলিত পোশাকের বাইরে বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনছে।
রোমানিয়া-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগের ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড ৪৫ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং সেখানে ৮ হাজার ১৯৪ জন কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে ৮ হাজার ১৬০ জন বাংলাদেশি এবং ৩৪ জন বিদেশি কর্মী।
প্রতিষ্ঠানটি পুরুষদের টেইলর্ড স্যুট, ব্লেজার ও ফরমাল ট্রাউজার উৎপাদন করে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
ইউক্রেনের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত সুপার প্রোটেকটিভ শুজ (প্রা.) লিমিটেড ১৩ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং এতে প্রায় ১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারের সেফটি শু, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত জুতা, সামরিক বুট ও অন্যান্য বিশেষায়িত ফুটওয়্যার পণ্য রপ্তানি করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক লাভরিক আন্দ্রিতি বলেন, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত জুতা উৎপাদনের জন্য তারা বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি সংযোজন করছে। এসব যন্ত্রপাতির কিছু ইউরোপ এবং কিছু তাইওয়ান ও চীন থেকে আনা হচ্ছে।
জাপানি কোম্পানি টিএস টেক বাংলাদেশ লিমিটেড ৪ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং সেখানে ৫১২ জন কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে ৫০৮ জন বাংলাদেশি ও চারজন জাপানি কর্মী।
প্রতিষ্ঠানটি গত অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। মূলত জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের জন্য অটোমোটিভ সিট-ট্রিম কভার উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
এর অধিকাংশ কাঁচামাল জাপান ও চীন থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশে সিট-ট্রিম কভার প্রক্রিয়াজাত করার পর সেগুলো জাপানের উৎপাদন কারখানায় পাঠানো হয়ে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাতোরু ওনিশি বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও অটোমেশনের ওপর তারা ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকাজে থ্রিডি প্রিন্টিংও ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
উচ্চমূল্যের ব্রাইডাল পোশাক
বিশেষায়িত ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনেও আদমজী ইপিজেডের বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। জার্মান বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড প্রিমিয়াম ওয়েডিং ও ইভনিং পোশাক উৎপাদন করে। এর মধ্যে রয়েছে ড্রেস, স্যুট, জ্যাকেট, বোলেরো, ভেইল, পেটিকোট ও জুয়েলারি।
৩ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে ২০২২ সালের এপ্রিলে উৎপাদন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে সেখানে ৩৫৭ জন স্থানীয় কর্মী কাজ করছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির সেলাই কর্মী হিসেবে কাজ করছেন খাদিজা আক্তার ও রানি আক্তার। প্রায় পাঁচ বছর ধরে সেখানে কাজ করা রানি বলেন, ইপিজেডের বাইরের কারখানার তুলনায় ভালো কর্মপরিবেশ ও বেশি মজুরি পাওয়াই এখানে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ইউবিএফ ব্রাইডালের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. রবিউল হক সিদ্দিকী বলেন, শুরুতে বাংলাদেশে এ ধরনের বিশেষায়িত পোশাক তৈরিতে অভিজ্ঞ শ্রমিকের অভাব ছিল।
"আমাদের নিজেদেরই শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে," বলেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৩০ জন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ব্যবস্থাপনার তথ্যমতে, অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইউবিএফ নিজস্বভাবে ডিজাইন, উৎপাদন, অলংকরণ ও ফিনিশিংয়ের কাজ করে। তাদের পণ্য জার্মানিতে রপ্তানি করা হয় এবং সেখান থেকে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ প্রায় ৩৭টি দেশে পাঠানো হয়। এসব পণ্য 'মেড ইন বাংলাদেশ' পরিচয় বহন করে।
প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে এমব্রয়ডারি ও লেইস উৎপাদনের ব্যবস্থাও গড়ে তুলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেই ফুটওয়্যার উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাটকল থেকে রপ্তানি কেন্দ্রে
১৯৫০ সালে আদমজী পরিবার সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী জুট মিলস প্রতিষ্ঠা করে। এটি পরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাটকল হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রায় ১ হাজার একর জমিজুড়ে গড়ে ওঠা মিলটি শ্রমিক আবাসন, বাজার ও স্কুলসহ একটি বড় শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর মিলটি জাতীয়করণ করে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে নেওয়া হয়। আর্থিক লোকসান, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ধীরে ধীরে মিলটি সংকটে পড়ে।
২০০২ সালের ৩০ জুন মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় সেখানে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।
পরে সরকার পরিত্যক্ত শিল্পভূমিটি নতুনভাবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর জমিটি বেপজার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয় এবং ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে আদমজী ইপিজেড উদ্বোধন করা হয়।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে আদমজী ইপিজেডে বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৪ মিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ছিল শূন্য দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার।
দুই দশকের ব্যবধানে পাটকলের জায়গা নিয়েছে আধুনিক কারখানা। একই জমিতে বর্তমানে চালু থাকা ৪৭টি কারখানায় ৭৬ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
আরও সম্প্রসারণের সুযোগ
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝামাঝি কৌশলগত অবস্থান, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আদমজী ইপিজেডের দিকে আকৃষ্ট করেছে।
বেপজার প্রত্যাশা, নির্মাণাধীন ১০টি কারখানা উৎপাদনে এলে ইপিজেডটির বার্ষিক রপ্তানি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং কর্মসংস্থান ১ লাখের বেশি হবে।
ইপিজেডটির প্রভাব শ্রমিকদের পরিবারিক জীবনেও পড়ছে। টিবিএসের পরিদর্শনের সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পাঁচ বছরের আবদুল্লাহকে নিয়ে বের হচ্ছিলেন তার মা শান্তা। তিনি জানান, ইপিজেডের ডে-কেয়ার সেন্টারে সন্তানকে রেখে তিনি কাজ করতে পারেন, যা তার জন্য খুবই সহায়ক হয়েছে।
একসময় বাংলাদেশের শিল্পায়নের প্রতীক হয়ে ওঠা পাটকল থেকে উচ্চমূল্যের পোশাক, বিশেষায়িত ফুটওয়্যার ও অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী আধুনিক রপ্তানি কেন্দ্রে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আদমজীর শিল্পচিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে।
