যেসব কারণে ভারতীয় কৃষি পণ্য রপ্তানিতে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ জারি করেছে কিছু দেশ
ফলমূল ও শাকসবজি জীবাণুমুক্ত করার কাজে ব্যবহৃত 'ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট' (ভিএইচটি) প্ল্যান্টটি ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনৌ শহরের রেহমানপুর গ্রামে অবস্থিত। বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুমকে সামনে রেখে যখন কেন্দ্রটিতে জোর প্রস্তুতি চলছিল, তখনই গত মার্চে হঠাৎ হাজির হন জাপানের কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক দল।
রপ্তানিসংক্রান্ত কাগজপত্রের ছাড়পত্র মিলেছিল কেন্দ্রটির, পণ্য পাঠানোর সময়সূচিও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এমনকি দেশটির মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যের আমচাষিরা এশিয়ার অন্যতম লাভজনক বাজার জাপানে পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাদের সেরা আলফানসো ও কেশর জাতের আম সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন।
আম পাঠানোর মৌসুম শুরুর সমস্ত প্রস্তুতি যখন সম্পূর্ণ, ঠিক তখনই থমকে দাঁড়ায় এর উৎপাদন কার্যক্রম। বাষ্পীয় শোধন, জীবাণুমুক্তকরণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ সনদের পুরো প্রক্রিয়াটি পরীক্ষার পর জাপানি পরিদর্শকরা গুরুতর অনিয়মের প্রশ্ন তোলেন; যার প্রেক্ষিতে জাপান ভারত থেকে আম আমদানি স্থগিত করে দেয়।
এরপর গত ৩১ মার্চ ইয়োকোহামার প্ল্যান্ট প্রটেকশন অথরিটি একটি অফিশিয়াল চিঠি পাঠায়। চিঠিতে জানানো হয়, মার্চ মাসের ২৫ তারিখ বা তার পর ইস্যু করা সনদপ্রাপ্ত সব ভারতীয় আমের চালান প্রবেশ বন্ধ থাকবে—যতক্ষণ না পরিদর্শকরা দেখে নিশ্চিত হচ্ছেন যে কাজের মান উন্নত হয়েছে।
ভারত ও জাপানের মধ্যকার আম বাণিজ্যে প্রায় দুই দশকের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ১৯৮৬ সালেও ফলখেকো ক্ষতিকর পোকার আশঙ্কায় ভারত থেকে আম আমদানি বন্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভিএইচটি সুবিধা তৈরি, পোকা দমন পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং প্রতিবছর পরিদর্শনে সম্মত হওয়ার পর ২০০৬ সালে দীর্ঘ ২০ বছরের সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
জাপান 'আমাদের গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল'
২০২৬ সালের এই বাণিজ্য স্থগিতাদেশের ফলে বর্তমানে ভারত থেকে রপ্তানিযোগ্য ছয়টি অনুমোদিত আমের জাতই সংকটে পড়েছে—যার মধ্যে রয়েছে আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বেগুনফুলি, চৌসা ও মল্লিকা। এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্তই এসব আম রপ্তানির প্রধান মৌসুম।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার সমমূল্যের তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আম আমদানি করে জাপান। টাকার অঙ্কে এটি খুব বড় মনে না হলেও বিশ্ব বাণিজ্যে জাপানের বাজারের আলাদা ওজন রয়েছে। কারণ জাপানি ক্রেতারা আমের জন্য সবচেয়ে চড়া দাম পরিশোধ করে, আর দেশটিতে প্রবেশের ছাড়পত্র পাওয়া মানে হলো বিশ্ববাজারে পণ্যের মানের স্বীকৃতি লাভ করা।
এমন এক সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা এল, যখন ভারতের আমচাষিরা এমনিতেই বেসামাল অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন। কঙ্কান অঞ্চলজুড়ে টানা তাপপ্রবাহের কারণে মহারাষ্ট্রের একটি বড় অংশের আলফানসো আমের ক্ষতি হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় সমুদ্র বা আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে । এর ওপর যেসব রপ্তানিকারক বছরের পর বছর কষ্ট করে জাপানের সাথে বাণিজ্যের ভিত তৈরি করেছিলেন, হঠাৎ সব অর্ডার বাতিল হওয়ায় তাদের গুদামজাত আম পচে নষ্ট হতে চলেছে।
মুম্বাইয়ের ব্যবসায়ী বিক্রম শাহ (২০২৫ সালে জাপানে প্রায় আড়াই টন আম পাঠিয়েছিলেন) তিনি দেশটির বাজারের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বিক্রম বলেন, 'বিক্রির পরিমাণের দিক থেকে জাপান হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার ছিল না, কিন্তু এটি আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম এনে দিয়েছিল। জাপানি ক্রেতাদের সাথে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমাদের দীর্ঘ ছয় বছর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমি নিজে দু'বার ওসাকায় গিয়েছি, সেখানকার আমদানিকারকদের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছি, তাদের কোল্ড স্টোরেজ সুবিধাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি এবং তারা আমাদের কাছ থেকে ঠিক কোন মানের আম চায় তা ভালোভাবে অনুধাবন করেছি। বছরের পর বছর সাধনা করে গড়ে তোলা এই ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্রেফ একটি মৌসুমের জটিলতায় নিমেষেই ভেস্তে যেতে পারে।'
এর আগে চীনের কাস্টমস বিভাগ ভারতীয় চালের চালানে জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম (জিএমও)-এর অস্তিত্ব রয়েছে বলে অভিযোগ আনে এবং সেই চালানগুলো ফিরিয়ে দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৭ এপ্রিল তিন ভারতীয় চাল রপ্তানিকারকের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়।
এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখ করে, পণ্য জাহাজে তোলার আগেই সেগুলো জিএমও-মুক্ত সনদ লাভ করেছিল। তা ছাড়া, ভারত সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, তাদের দেশীয় কোনো ধান বা চালের ক্ষেতেই কোনো জিনগত পরিবর্তন আনা হয়নি।
ভারতের মোট কৃষি রপ্তানির ২০ শতাংশের বেশিই চাল থেকে আসে। গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) দেশটি রেকর্ড ১২.৫ বিলিয়ন ডলারের চাল বিদেশে পাঠিয়েছে।
তবে চীনে পণ্য পাঠানোর সুযোগ স্থগিত হওয়ায়, বিপদে পড়েছেন সেখানকার নিবন্ধিত ৩ জন চাল রপ্তানিকারক। আর এ ঘটনা পুরো চাল ব্যবসায়ী মহলের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা 'অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড প্রসেসড ফুড প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি' সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দেয়। গত ৮ জুন চীনে চাল পাঠানোর আগে জিএমও পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত ল্যাবগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে।
নয়াদিল্লির কৃষিবিজ্ঞানী এস কে সিং আল জাজিরাকে জানান, এই বিতর্ক বা সমস্যার কারণে ভারতের পরীক্ষাপদ্ধতির দুর্বলতাগুলো প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
তিনি বলেন, 'আমাদের ল্যাবগুলো মূলত কীটনাশক ও অ্যাফলাটক্সিন পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছিল। কারণ বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলোর চাহিদাই বেশি ছিল। কিন্তু চীনে চাল পাঠাতে যে জিএমও পরীক্ষার দরকার হয়, সেটির জন্য যে ধরনের প্রযুক্তি ও প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা আমাদের পর্যাপ্ত নেই।'
তিনি আরও জানান, দেশে ল্যাবের সুযোগ-সুবিধা সব জায়গায় সমান না থাকলেও রফতানিকারকরা কিন্তু সরকার অনুমোদিত ল্যাব থেকেই সনদ নিয়েছিলেন।
সমস্যা হলো, চালের প্রোটিন পরীক্ষা করার মতো প্রযুক্তি হাতেগোনা কয়েকটি ল্যাবেই আছে—যা মূলত দিল্লি আর তেলেঙ্গানার হায়দ্রাবাদে অবস্থিত। এর ফলে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো উত্তরের রাজ্যগুলোর রফতানিকারকদের নমুনা পরীক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে শত শত কিলোমিটার দূরে চালের স্যাম্পল পাঠাতে হচ্ছে।
অসংগঠিত সরবরাহ ব্যবস্থা
আম এবং চালের এই সংকট তৈরির আগেই কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়ার কারণে হংকং ভারতের বেশ কিছু মশলাজাতীয় পণ্যের বিক্রি বন্ধ করে দেয়। পরীক্ষায় প্রায় ১২ শতাংশ নমুনায় মানের ঘাটতি ধরা পড়ে।
এছাড়া, ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'র্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেমে' ভারতীয় মশলা নিয়ে ৩১২টি সতর্কবার্তা জারি করার পর, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে তারা ভারতীয় জিরার ওপর পরীক্ষার হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার কোচির খাদ্য নিরাপত্তা বিজ্ঞানী অনন্যা বসু এ সমস্যার মূল কারণ হিসেবে সরবরাহ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতাকে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি বলেন, 'একজন কৃষক তার ফসল বিক্রি করেন মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে, তিনি বিক্রি করেন ব্যবসায়ীর কাছে, আর সেই ব্যবসায়ী আবার তা জোগান দেন প্রক্রিয়াজাতকারী সংস্থাকে। এই হাতবদল হতে হতেই ফসলে কী ধরনের কীটনাশক দেওয়া হয়েছিল, তার হিসাব হারিয়ে যায়। অর্থাৎ প্রথম বিক্রির পর থেকে হিসাবপত্রের যে যোগসূত্র থাকার কথা, তা একপ্রকার শেষ হয়ে যায়।'
ভারতের এমন অবস্থার মধ্যে দেশটির প্রতিযোগী দেশগুলো বেশ দ্রুত এগিয়ে গেছে। থাইল্যান্ড পুরো দেশজুড়ে খাদ্যের মূল উৎস ট্র্যাক করার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভিয়েতনাম কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে বিনিয়োগ করছে, আর ব্রাজিল ও চিলি বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে আধুনিক কোল্ড-চেইন (শীতল পরিবহন ও সংরক্ষণ) ব্যবস্থার উন্নয়নে।
বিশ্বে কৃষিপণ্য উৎপাদনে ভারত দ্বিতীয় স্থানে থাকা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্য রফতানিতে ভারতের অংশ মাত্র ২.৪ শতাংশ। এছাড়া, তাদের মোট রফতানিতে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের পরিমাণ প্রায় ১৭ শতাংশেই আটকে আছে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তা ২৫ শতাংশ এবং চীনে ৫০ শতাংশ।
আর এ পরিস্থিতির জেরে ভুগতে হচ্ছে ভারতের কৃষকদের।
