এমআরটি-১-এর পর এবার এমআরটি-৫ নর্দার্ন রুটের ব্যয় ১২৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব
মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় প্রায় ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাবের পর এবার জাপানের অর্থায়নে চলমান আরেক মেট্রো প্রকল্প এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের ব্যয় ১২৫.৯৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৯৩ হাজার ১৯০.৯৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) প্রস্তুত করেছে। চলতি সপ্তাহে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশন ও ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা।
২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় এমআরটি-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮.৫৪ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত সংশোধনের ফলে প্রকল্পটিতে বাড়তি ৫১,৯৫২.৪২ কোটি টাকা যুক্ত হতে যাচ্ছে।
মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হচ্ছে
সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের অংশ ১২ হাজার ১২১.৫০ কোটি টাকা থেকে ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে ২৪ হাজার ২৫৯.৭২ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রকল্প সহায়তা বা বিদেশি ঋণের অংশ ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা থেকে ১৩৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৮ হাজার ৯৩১.২৪ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রথমে প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। তবে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০৩৪ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এক বছর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড থাকবে।
২০৩৩ সালের জানুয়ারিতে এই রুটে মেট্রোরেল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে ডিএমটিসিএলের।
পরিকল্পনা কমিশন ও ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলেন, বিভিন্ন কাজের প্যাকেজে ঠিকাদারদের অনেক বেশি দরপ্রস্তাব, দেশীয় ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন ও অন্যান্য বাজার পরিস্থিতির কারণে ব্যয় সংশোধন করতে হয়েছে।
ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা আরও জানান, ঠিকাদাররা আগের প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় প্রস্তাব করায় বেশ কয়েকটি বড় প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায় দেড় বছর স্থগিত ছিল।
আগের প্রাক্কলনের চেয়ে ঠিকাদারদের ব্যয় প্রস্তাব অনেক বেশি
ভূগর্ভস্থ দুটি প্রধান নির্মাণ প্যাকেজে (সিপি) ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির চিত্র ফুটে উঠেছে।
সিপি-০৫ প্যাকেজের আওতায় রয়েছে মিরপুর-১ স্টেশনের পূর্ব পাশ থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ স্টেশন ও মূল রেলপথ নির্মাণ। মূল ডিপিপিতে এই প্যাকেজের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৪৪২.৭১ কোটি টাকা।
পরে প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এ প্যাকেজের সম্ভাব্য ব্যয় প্রাক্কলন করে ৫ হাজার ২১২.৬০ কোটি টাকা। দরপত্র আহ্বান করা হলে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসাবে জাপানের এসএলটিএম ১১ হাজার ১৭৭.৬৭ কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব করে—যা মূল প্রাক্কলনের তিনগুণেরও বেশি।
একইভাবে ব্যয় বেড়েছে সিপি-০৬-এর। এ প্যাকেজের আওতায় রয়েছে কচুক্ষেত স্টেশনের পূর্ব পাশ থেকে ভাটারা ট্রানজিশন সেকশন পর্যন্ত পাতাল অংশের স্টেশন ও মূল লাইন নির্মাণ।
মূল ডিপিপিতে এর ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল ৪ হাজার ৩৬৪.৭৫ কোটি টাকা। পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্যয় প্রাক্কলন করে ৬ হাজার ১২৬.৩০ কোটি টাকা। দরপত্রে তাইসেই-স্যামসাং জয়েন্ট ভেঞ্চার (জেভি) সর্বনিম্ন ব্যয় প্রস্তাব করে ১৫ হাজার ৫২৭.০২ কোটি টাকা।
এভাবে অন্যান্য নির্মাণ প্যাকেজেও ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করতে হচ্ছে বলে জানান ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা।
প্রস্তাবিত ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প পরিচালক আবদুল মতিন চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
টাকার অবমূল্যায়নেও বাড়ছে ব্যয়
ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনকে উল্লেখ করেছে ডিএমটিসিএল।
মূল ডিপিপিতে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮৪.৫০ টাকা। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিময় হারের ভিত্তিতে সর্বশেষ আরডিপিপি ওয়ার্কবুকে প্রতি ডলারের দর ধরা হয়েছে ১২৩.৮২ টাকা।
এর অর্থ হলো মূল ডিপিপির বিনিময় হারের তুলনায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৪৬.৫৩ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, প্রকল্পে আমদানিকৃত রোলিং স্টক, রেলওয়ে ও ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল সিস্টেম, পরামর্শক সেবা এবং অন্যান্য খাতে বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যয়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে টাকায় এসব খাতের ব্যয় বেড়ে গেছে।
সীমিত প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, জাপানি অর্থায়নের শর্ত অনুযায়ী এই প্রকল্পে জাপানি পরামর্শক নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক।
তারা আরও বলেন, কিছু প্যাকেজের ক্ষেত্রে এমন সব কারিগরি বৈশিষ্ট্য ও নির্মাণ পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে যে এতে অংশগ্রহণের যোগ্য ঠিকাদারদের তালিকা অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে দরপত্র উন্মুক্ত থাকলেও প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, বেশি দরপ্রস্তাব নিয়ে ডিএমটিসিএল ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) মধ্যে কয়েক মাস ধরে মতবিরোধ চলছিল।
বাংলাদেশ পক্ষ বিদ্যমান দরপত্রগুলো বাতিল করে নতুন করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের পক্ষে ছিল। অন্যদিকে জাইকার দাবি ছিল, দরপত্র মূল্যায়নে তাদের নিজস্ব ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও ভূগর্ভস্থ নির্মাণের ঝুঁকির কারণেই ব্যয়ের পরিমাণ বেশি এসেছে।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, মেট্রোরেলের দরপত্র প্রক্রিয়া ক্রমেই সীমিত টেন্ডারিংয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। কারণ, প্রকল্পের ডিজাইন এমনভাবে করা হচ্ছে এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট ধরনের কনস্ট্রাকশন পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে, যা মূলত জাপানি পেটেন্ট বা বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর।
ফলে এ ধরনের পদ্ধতিতে কাজ করার সক্ষমতা জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যয় তুলনার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের
অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ঢাকায় বিভিন্ন অর্থায়ন চুক্তির অধীনে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে তুলনা করা জরুরি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্নের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একই শহরের নিচ দিয়ে এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন ও এমআরটি লাইন-১ নির্মিত হবে। ফলে এসব প্রকল্পের পাতালপথ নির্মাণের ব্যয় ও ঠিকাদার বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্যে তুলনা করলে প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।
অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, 'এই ধরনের তুলনা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে, ঢাকায় ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয় যৌক্তিক কি না এবং অর্থায়ন ও ক্রয় প্রক্রিয়া এই মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না।'
শুধু নির্মাণকাজের মাধ্যমেই এই বিশাল আর্থিক বোঝার শেষ হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন। হাদিউজ্জামান বলেন, 'পাতাল মেট্রোরেল চালু হলে এর পরিচালন ব্যয় অত্যন্ত বেশি হবে। কারণ পাতাল রেল ব্যবস্থায় সার্বক্ষণিক কৃত্রিম আলো, বায়ু চলাচল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রাখতে হয়।'
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আরেক অধ্যাপক শামসুল হকও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতাহীন প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত এই ধরনের ব্যয় ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দেবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে ব্যয় নির্ধারণ করা হচ্ছে তা-ও মূলত প্রাক্কলন, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্কিংয়ের সঙ্গে এই ব্যয়ের সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে না।
অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, উচ্চ নির্মাণ ব্যয় দীর্ঘমেয়াদেও চাপ সৃষ্টি করবে, কারণ শেষপর্যন্ত সরকারকেই এই অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল ব্যয় বহন করতে হবে।
১৪টি স্টেশন নিয়ে ২০ কিলোমিটারের রুট
এমআরটি-৫ নর্দার্ন রুটটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এর মধ্যে ১৩.৫ কিলোমিটার থাকবে ভূগর্ভস্থ, আর ৬.৫ কিলোমিটার হবে এলিভেটেড।
এই রুটে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে নয়টি ভূগর্ভস্থ ও পাঁচটি উড়ালপথে নির্মাণ করা হবে।
পুরো প্রকল্প সিপি-০১ থেকে সিপি-১০ পর্যন্ত মোট ১০টি চুক্তি প্যাকেজে বিভক্ত। হেমায়েতপুর ডিপোর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে; এখন ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। অন্যান্য প্যাকেজের নির্মাণকাজ, দরপত্র মূল্যায়ন ও আলোচনা বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
