সুদের খরচ বাদ দিয়ে এমআরটি লাইন-৫-এর ব্যয় কমল ২,২১৭ কোটি টাকা
দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৫ (গাবতলী-দাশেরকান্দি) সাউদার্ন রুটের প্রস্তাবিত ব্যয় আরও ২ হাজার ২১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কমানো হয়েছে। মূলত প্রকল্প ব্যয় থেকে পরিশোধযোগ্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার সুদ বাদ দেওয়ায় এ ব্যয় কমেছে।
কর্মকর্তারা জানান, জমির প্রয়োজনীয়তা ও প্রশাসনিক ব্যয় সংশোধনের ফলেও গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পটির ব্যয় কমে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর গত ১৬ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ ব্যয় কমানো হয়েছে। সোমবার ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুল ওহাব বলেন, সর্বশেষ ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে মূলত প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস এবং সুদের হিসাব সংশোধন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "প্রকল্পে আগে অন্তর্ভুক্ত কিছু প্রশাসনিক ব্যয় কমানো হয়েছে। ঋণের মোরাটোরিয়াম শেষ হওয়ার পর যে সুদ পরিশোধ করতে হবে, সেটি এখন আলাদা করা হয়েছে।"
"এসব পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কমেছে। বাকি অর্থ কয়েকটি খাতে অল্প অল্প করে ব্যয় কমিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে," যোগ করেন তিনি।
ওহাব বলেন, ব্যয় কমানোর কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো প্রভাব পড়বে না। "সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে যেতে পারবে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, নথিপত্র ও ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।"
মূল প্রস্তাব থেকে ব্যয় কমেছে ৯,১১৫ কোটি টাকা
সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করেছিল ডিএমটিসিএল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির ব্যয় পর্যালোচনা করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্থাটির নিজস্ব পর্যালোচনায় ব্যয় কমিয়ে ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা করা হয়। বর্তমান সরকারের সময়ে প্রকল্পটির ব্যয় আরও এক দফা কমানো হয়েছে।
ফলে মূল প্রস্তাবের তুলনায় প্রকল্পটির ব্যয় এখন ৯ হাজার ১১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা কমেছে।
প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়। তিনি প্রস্তাবিত ব্যয় আরও কমিয়ে যৌক্তিক করার নির্দেশ দেন।
প্রকল্প পরিচালক ওহাব বলেন, "বর্তমান সরকার প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে আগ্রহী এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘদিন আটকে থাকা প্রকল্পটি এখন আবার সক্রিয় হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।"
সুদ ও ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় কমেছে
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, বাস্তবায়নে প্রভাব না ফেলে কোথায় ব্যয় কমানো সম্ভব, তা চিহ্নিত করতে প্রকল্পের বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ব্যয় কমানো হয়েছে 'রিজার্ভ ফর কমিটমেন্ট চার্জ অন লোন' এবং 'ইন্টারেস্ট অন ফরেন ডেট' খাতে। এ দুই খাত থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, "আমরা বলেছি, আপাতত প্রকল্পের বাজেটে এটি রাখার প্রয়োজন নেই। অর্থ বিভাগ তাদের নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী এটি পরিশোধ করবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে ডিপিপি থেকে সুদের মতো বড় অঙ্কের একটি খাত বাদ পড়েছে, যা ব্যয় কমার প্রধান কারণ।"
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, টিওডি (ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট) বা ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ ২৩ দশমিক ০৯ হেক্টর থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ১০৪ হেক্টর করায় শুধু এ খাতেই প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। এ ছাড়া গাড়ি কেনা, পরামর্শক ব্যয়, সম্মানিসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক খাতেও ব্যয় কমানো হয়েছে।
এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণ ৩০,৩০৬ কোটি টাকা
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা ঋণ দিতে প্রাথমিক সম্মতি জানিয়েছে। এর আগে দুই পক্ষের ঋণ ধরা হয়েছিল ৩২ হাজার ৩৩২ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি তহবিল থেকে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে, যা আগে ছিল ১৫ হাজার ৩৮৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মেট্রোরেল রুটের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং বাকি ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ।
লাইন-৫ (সাউদার্ন) রুট হবে— গাবতলী-টেকনিক্যাল-কল্যাণপুর-শ্যামলী-কলেজ গেট-আসাদ গেট-রাসেল স্কয়ার-কারওয়ান বাজার-হাতিরঝিল-তেজগাঁও-আফতাবনগর-আফতাবনগর সেন্টার-আফতাবনগর পূর্ব-নাসিরাবাদ-দাশেরকান্দি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এমআরটি লাইন-৫
ডিএমটিসিএল জানায়, প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় (পিএফএস) প্রাথমিক জরিপের তথ্য ও লজিট মডেল ব্যবহার করে যাত্রীদের বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যম—মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, ক্যাব, থ্রি-হুইলার ও বাসসহ অন্যান্য মাধ্যমের—মোড শেয়ার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এতে দেখা যায়, মোট যাত্রীর প্রায় ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ সড়কভিত্তিক পরিবহন থেকে মেট্রোরেলে স্থানান্তরিত হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ যাত্রী বিদ্যমান মিডিয়াম বাস থেকে মেট্রোরেলে আসবে। অন্যান্য পরিবহন মাধ্যম থেকে যাত্রী স্থানান্তরের হার তুলনামূলকভাবে কম, যা শূন্য দশমিক ০২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৭১ শতাংশের মধ্যে।
মূল পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) এটি ঢাকার প্রথম পূর্ব-পশ্চিমমুখী ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একক 'লাইন-৫' হিসেবে চিহ্নিত ছিল। পরে জাপানের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমইটিআই) সুপারিশে লাইনটিকে 'নর্দার্ন' ও 'সাউদার্ন'—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নর্দার্ন রুটটি জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) এবং সাউদার্ন রুটটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
