মেট্রোরেলের ২৭ বিয়ারিং প্যাড ‘ক্রিটিক্যাল’, ৪৬ পিয়ারে ফাটল চিহ্নিত: সংসদে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী
উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল রুটে ৭৩০টি ত্রুটিপূর্ণ বিয়ারিং প্যাডের মধ্যে ২৭টিকে 'ক্রিটিক্যাল' হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাধীন সেফটি অডিট কমিটি। এসব বিয়ারিং প্যাড আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। এ ছাড়াও রুটের ৪৬টি পিয়ারে বিভিন্ন মাত্রায় ক্র্যাক বা ফাটল শনাক্ত হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়।
একটি স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটি ৭৩০টি বিয়ারিং প্যাডে ত্রুটি এবং ৪৬টি পিলারে বিভিন্ন মাত্রার ফাটল শনাক্ত করেছে। বিয়ারিং প্যাডগুলোর মধ্যে ১৪৭টিতে সামান্য ত্রুটি এবং ২৯৭টিতে মূলত স্থাপনের কাজের মানসংক্রান্ত ত্রুটি পাওয়া গেছে। ২৭টি প্যাডকে 'ক্রিটিক্যাল' (ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিরীক্ষা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে ১৬ জুলাই একটি কমিটি গঠন করেছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। স্থানচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ১০টি বিয়ারিং প্যাডের জায়গায় স্টিলের ব্র্যাকেট বসানো হয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি প্যাডের ওপর নজর রাখতে বসানো হয়েছে বসে যাওয়ার মাত্রা পরিমাপের মার্কার।
এ ছাড়া ১০২টি স্থানে কাঠামোগত ফাটল পর্যবেক্ষণের জন্য গেজ বসানোর কাজ চলছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
মেট্রোরেল সম্প্রসারণের গতি বাড়ছে
মন্ত্রী জানান, এমআরটি লাইন-৬-এর মতিঝিল-কামালাপুর অংশের ৭৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী বছরের শুরুতে এ অংশে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরুর লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের জুনে।
ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মোট ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১-এর সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ লাইনের বাকি ১১টি প্যাকেজের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। আর লাইন-৫-এর উত্তরাংশের সংশোধিত ডিপিপি বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় রয়েছে।
এদিকে লাইন-৫-এর ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ দক্ষিণাংশ গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। এ অংশের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা ও দরপত্রের নথি তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। এখন ডিপিপি একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এমআরটি লাইন-২-এর প্রস্তাব বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। আর ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ কামালাপুর-মাদানপুর লাইন-৪-এর সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক নকশার কাজও শেষ পর্যায়ে।
যানজট কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ
যানজট কমাতে সোনারগাঁও গোলচত্বর থেকে উত্তরমুখী একটি র্যাম্প নির্মাণ করছে সরকার। র্যাম্পটি চালু হলে বনানী, কুড়িল ও বিমানবন্দরমুখী যানবাহন তেজগাঁও টোল প্লাজা এড়িয়ে চলাচল করতে পারবে। এতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের তেজগাঁও টোল প্লাজার ওপর চাপ কমবে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে যুক্ত করার সম্ভাব্যতা যাচাইও চলছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পটি ২০২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার আশা করা হচ্ছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে এ প্রকল্পের জন্য শতভাগ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে সিলেট প্রান্ত থেকে প্রথম সাত কিলোমিটারে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটায় সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে।
রেলওয়ের লোকসান কমেছে, আরও ১০ জেলা যুক্ত করার পরিকল্পনা
মন্ত্রী জানান, গত ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় ২২৫ কোটি টাকা বেড়েছে। এতে সংস্থাটির বার্ষিক লোকসান কমে ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
রেল যোগাযোগের বাইরে থাকা ১৫ জেলার মধ্যে ১০ জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জসহ পাঁচ জেলায় সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
বিশেষ করে পুরোনো মিটারগেজ রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব রেলপথের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
লাভজনক ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চাহিদা থাকলেও ইঞ্জিন ও কোচের সংকটের কারণে ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে পারছে না রেলওয়ে। এ বিষয়ে দুটি ক্রয় প্রকল্পের কাজ চলছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেন পরিচালনার প্রস্তাবও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
রেল যোগাযোগ বাড়াতে তিনটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এগুলো হলো কামারখালী হয়ে মধুখালী-মাগুরা রেললাইন, ডুয়েলগেজ বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন এবং শেরপুর ও রৌমারীকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার সম্ভাব্যতা যাচাই। সাতক্ষীরা হয়ে নাভারণ-ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। এর ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে।
এ ছাড়া চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর, জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর, সিলেট থেকে জাফলং এবং ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণসহ আরও চারটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে ২০০টি ব্রডগেজ কোচ সংগ্রহ করছে। এর মধ্যে প্রথম ১৯টি কোচ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ২০০টি মিটারগেজ কোচ কেনার জন্য ডিপিপি তৈরির কাজ চলছে।
এ ছাড়া ৬০টি মিটারগেজ ও ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের কাজ চলছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনা হচ্ছে। এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়নে আরও ৩০টি লোকোমোটিভ কেনার ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আর কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের (ইডিসিএফ) অর্থায়নে ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ কেনার প্রাথমিক ডিপিপি প্রক্রিয়াধীন।
চাহিদার তুলনায় আসন কম থাকায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণবিহীন আন্তঃনগর ট্রেনের মোট আসনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যান্ডিং টিকিট দিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
সড়ক নিরাপত্তায় নতুন প্রকল্প
জাতীয় মহাসড়কে যান চলাচল তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং অতিরিক্ত গতি, অবৈধ পার্কিং, যানজট ও দুর্ঘটনা শনাক্ত করতে কোরিয়ান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (কোইকা) সহায়তায় পরীক্ষামূলকভাবে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম চালু করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ৩৬ কোটি ডলারের অর্থায়নে বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় সড়ক নিরাপত্তা সেল, দুর্ঘটনার তথ্যকেন্দ্র, ডিজিটাল আইন প্রয়োগ, দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা, জনসচেতনতা, যানবাহন পরীক্ষা এবং চালকদের প্রশিক্ষণে সহায়তা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া চারটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও মাগুরায় চারটি আধুনিক বিশ্রামকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। পণ্যবাহী যানবাহনের অতিরিক্ত ওজন ঠেকাতে অ্যাক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রও স্থাপন করা হচ্ছে।
কর্ণফুলী টানেল ও ভারতীয় যাত্রীবাহী ট্রেনে নতুন উদ্যোগ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। রাজশাহী-কলকাতা-রাজশাহী রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে যোগাযোগ ও বিনিয়োগ বাড়াতে কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নও রয়েছে। টানেল নির্মাণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
