ব্রিটিশ আমলের যেসব বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো আঁকড়ে আছে বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশ করতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিটিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন), বিজনেস আইডেন্টিটিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন), ভ্যাট, কাস্টমস নিবন্ধনসহ ধাপে ধাপে নানা প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা পার হতে হয়।
এত সব কাগজপত্রের ঝামেলাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আলাদাভাবে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি) নিতে হচ্ছে। এসবই মূলত ব্রিটিশ আমলের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান অর্থনীতিতে এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই।
এই ব্যবস্থার শেকড় প্রোথিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে। বিশ্বযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ায় যুদ্ধ সরঞ্জাম ও জরুরি পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ১৯৩৯ সালে ডিফেন্স অভ ইন্ডিয়া রুলস বা ভারত প্রতিরক্ষা বিধি জারি করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার।
দেশভাগের পর নবগঠিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বৈদেশিক মুদ্রার মারাত্মক অভাব দেখা দিলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে ব্রিটিশদের জারি করা বিধি আরও বিস্তৃত করে ১৯৫০ সালে আমদানি-রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করে পাকিস্তান সরকার।
প্রায় আট দশক পরও সেই পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোরই বড় একটি অংশ বহন করছে বাংলাদেশ।
ওই আইনের আওতায় এখনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশ করতে ব্যবসায়ীদের আলাদাভাবে আইআরসি ও ইআরসি নিতে হচ্ছে। আগে এই সনদ প্রতিবছর নবায়ন করতে হতো, এখন পাঁচ বছর মেয়াদে নবায়ন করা যায়। এ সনদ ইস্যু ও নবায়নের জন্য ঢাকায় আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়সহ সারা দেশে মোট ১৪টি আঞ্চলিক দপ্তর রয়েছে।
মজার বিষয় হলো, যে পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ সালে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আইন প্রণয়ন করেছিল, তারাই ২০০২ সালে আইনটি বাতিল করে দিয়েছে। ফলে পাকিস্তানে আমদানি-রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের আইআরসি-ইআরসির মতো আলাদা সনদ নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। দেশটির ব্যবসায়ীদের কাস্টমসের ওয়েবভিত্তিক ট্রেডার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হয়।
এ অবস্থায় আইআরসি ও ইআরসি সনদ গ্রহণ ও তা নবায়নের প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান এ সনদগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'যে আইনের আওতায় বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানি সনদ ইস্যু করা হয়, সেই আইন দুই যুগ আগে পাকিস্তান বাতিল করেছে। শ্রীলঙ্কায় এ ধরনের কোনো সনদ নিতে হয় না। ভারতে স্থায়ীভাবে একবার সনদ নিতে হয়, তা আর নবায়ন করতে হয় না।
'বাংলাদেশে ডি-রেগুলেশনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাই ইআরসি ও আইআরসি সনদ নেওয়া ও তা নবায়নের বদলে বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নাম্বার ব্যবহারের মাধ্যমেই আমদানি-রপ্তানির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।'
আইআরসি ও ইআরসির খরচ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের এক গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে অন্তত ৪৯ ধরনের সনদ ও অনুমতিপত্র নিতে হয়।
আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য আমদানির জন্য আইআরসি ফি শুরু হয় ৫ হাজার টাকা থেকে, এর নবায়ন ফি ৩ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ ক্যাটাগরিতে এই আইআরসি ফি বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ হাজার টাকা, নবায়ন ফি হয় ৩২ হাজার টাকা।
রপ্তানিকারকদের জন্য রয়েছে ছয় ধরনের নিবন্ধন সনদ। এর প্রতিটির প্রাথমিক ফি শুরু হয় ১০ হাজার টাকা থেকে, নবায়ন ফি ৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে ইনডেনটিং সেবার ইআরসি নেওয়ার ফি ৫০ হাজার টাকা, নবায়ন ফি ২৫ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই ঝামেলা কেবল সনদ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, নির্ধারিত ফি দিয়ে এসব সনদ নবায়নের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ফলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সময় ও পরিচালন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।
তারা বলছেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই চাপ আরও বেশি। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে নিজস্ব কমপ্লায়েন্স ও প্রশাসনিক টিম রাখতে পারে, সেখানে ছোট ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষেত্রেই তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিতে হয়। এতে আমদানি-রপ্তানির প্রকৃত খরচের বাইরে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় তৈরি হয়।
সনদ নেওয়া যেখানে বাধ্যতামূলক, সেখানে এগুলো ইস্যু ও নবায়নের জন্য সারা দেশে প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের আঞ্চলিক দপ্তর আছে মাত্র ১৪টি। ফলে বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের সনদ-সংক্রান্ত কাজের প্রয়োজনে অন্য এলাকায় ছুটতে হয়, যা তাদের বাড়তি সময় ও ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় ভিন্ন চিত্র
এশিয়ার বৃহৎ ও উন্নত দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে সাধারণত এ ধরনের সনদ নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক চীনেও বাংলাদেশের আইআরসি ও ইআরসির মতো সনদের ব্যবস্থা নেই। কেবল কাস্টমস নিবন্ধনের মাধ্যমেই দেশটির ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ভিয়েতনামেও সাধারণ পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো পৃথক সনদের বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতেও বাংলাদেশের মতো পৃথক আইআরসি-ইআরসি নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
ফেডারেশন অভ বাংলাদেশ চেম্বারস অভ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, এখনকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় আইআরসি ও ইআরসি সনদের কোনো প্রয়োজন নেই।
ব্যবসা-বিনিয়োগ ও দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের ডি-রেগুলেশনে জোর দিতে হবে এবং পৃথিবীর বেস্ট প্র্যাকটিসগুলোকে অনুসরণ করতে হবে। সেটা না পারলেও অন্তত এই অঞ্চলের বেস্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করা জরুরি,' টিবিএসকে বলেন তিনি।
ফজলুল হক জানান, বাংলাদেশে কোন কোন পণ্য আমদানি করা যাবে না এবং কোন পণ্য আমদানি করতে হলে সরকারের কোন দপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হবে, তা আমদানি নীতি আদেশে উল্লেখ আছে। 'কাস্টমস প্রসিডিউর অনুসরণ করেই আমদানি করতে হয়। তাই আমদানি করার জন্য পৃথক আমদানি সনদ গ্রহণের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।'
'একইভাবে, যেসব পণ্য রপ্তানি করা নিষিদ্ধ, তার তালিকা রপ্তানি নীতি আদেশে রয়েছে এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এক্ষেত্রে পুরো দায়িত্ব পালন করতে পারে। তাই পৃথকভাবে রপ্তানি সনদ নেওয়া বা আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রয়োজন নেই,' বলেন তিনি।
ব্যয়বহুল বোঝা
আইআরসি ও ইআরসি ব্যবস্থা এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছিল, যখন বৈদেশিক বাণিজ্য ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিষয়। কিন্তু বর্তমানের ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস প্রক্রিয়া, ব্যাংকিং নজরদারি এবং কর ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীর পরিচয় ও লেনদেন সম্পর্কে সরকারের কাছে তথ্য সংগ্রহের অনেক বেশি কার্যকর উপায় রয়েছে।
এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, আইআরসি ও ইআরসি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তুলে দিলে ব্যবসায়ী ও সরকার—উভয়েরই সুবিধা হবে। 'ব্যবসায়ীরা হয়রানি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে রক্ষা পাবেন, অন্যদিকে এই সনদ ইস্যু ও নবায়নের জন্য সরকার যে বিরাট দপ্তর পরিচালনা করছে, তারও প্রয়োজন হবে না।'
অপ্রয়োজনীয় বিধিবিধান পর্যালোচনা করছে সরকার
বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান টিবিএসকে জানান, ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুবিধার্থে সরকার ডিরেগুলেশনের উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি পর্যালোচনা করছে কোন কোন ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সহজ করা যায়।
তিনি বলেন, '১৯৫০ সালের আমদানি-রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইনও আইনও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে একটি বৈঠক করেছি। প্রথম ধাপে আমরা খতিয়ে দেখব এই আইনের অধীনে যেসব সনদ নিতে হয়, সেগুলোর কোনগুলোর এখন আর প্রয়োজন নেই। সেই বাধ্যবাধকতাগুলো তুলে দেওয়া হবে।'
বাণিজ্য সচিব আরও বলেন, 'যদি দেখা যায়, এই আইনেরই কোনো প্রয়োজন নেই, তবে সরকার অবশ্যই বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করবে। আর যদি আইনটি রাখা প্রয়োজনীয় মনে হয়, তবে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি সংশোধন ও সহজ করা হবে।
