দ্রুততম সময়ে মিলবে মার্কিন তুলা, নভেম্বরে খুলছে প্রথম বেসরকারি ওয়্যারহাউজ
আগামী নভেম্বর থেকে দেশেই সরাসরি পাওয়া যাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলা। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সরকারি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের (ফ্রি ট্রেড জোন) কাছে দেশের প্রথম বেসরকারি মার্কিন তুলার ওয়্যারহাউজ (গুদাম) স্থাপনের ফলে দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলো স্থানীয়ভাবেই চাহিদা অনুযায়ী সরাসরি তুলা কিনতে পারবে। এর ফলে প্রতি চালান আমদানিতে মাস কয়েকের যে সময় লাগে তা হ্রাস পাবে। অর্থাৎ, রপ্তানির লিড টাইম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
এর আগে নেওয়া একটি সরকারি উদ্যোগের ধীরগতির প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশি-আমেরিকান তুলা ব্যবসায়ী আশওয়ার রহমানের নেতৃত্বাধীন 'আমেরিবাংলা করপোরেশন' স্থানীয় এক অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে এই ওয়্যারহাউজটি স্থাপন করছে।
আমেরিবাংলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আশওয়ার রহমান জানান, "আমরা আগামী ১৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করছি। ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ টন তুলার একটি চালানের জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।" বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে ওয়্যারহাউজে তুলার মজুত আরও বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, "এই উদ্যোগের ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক দামে দ্রুত তুলা সংগ্রহ করতে পারবেন, এতে লিড টাইম হ্রাস পাবে, যা বিশেষ করে তুলনামূলক কম মূলধনের স্পিনিং মিল ও কারখানাগুলোর জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে।"
দেশীয় টেক্সটাইল খাতের জন্য বড় সুযোগ
বাংলাদেশে তুলার প্রধান ব্যবহারকারী হলো স্থানীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলো। নতুন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।
তিনি বলেন, "সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার দেওয়ার পর দেশে তুলা পৌঁছাতে প্রায় ৯০ দিন সময় লাগে। স্থানীয়ভাবে এই ওয়্যারহাউজ চালু হলে অপেক্ষার এই দীর্ঘ সময় দূর হবে, যা আমাদের লিড টাইমে বড় ধরনের সুবিধা দেবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামাজনিত ঝুঁকি কমাবে।"
তিনি আরও জানান, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে একটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বিটিএমএ আগে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছিল। তবে বেসরকারি উদ্যোগে এটি বাস্তবায়িত হওয়ায় দ্রুত সমাধান আসছে। রাসেল বলেন, "বেসরকারিভাবে কেউ এটি স্থাপন করলে বিটিএমএ তাদের পূর্ণ সমর্থনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।"
যদিও অন্যান্য দেশের তুলনায় মার্কিন তুলার দাম কিছুটা বেশি, তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন—এর উচ্চ গুণমান, কম অপচয় এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে কম ক্ষতির কারণে সার্বিক উৎপাদন খরচ পুষিয়ে যায়।
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৪ কোটি ৬০ লাখ (৩৪৬ মিলিয়ন) ডলারের মার্কিন তুলা আমদানি করেছে, যা তার আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ২৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। বর্তমানে দেশের মোট তুলা আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের ধারণা, কৌশলগত বাণিজ্য সুবিধা পাওয়া গেলে এই আমদানির পরিমাণ ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে।
সরাসরি ক্রয়ে কমবে দর
আশওয়ার রহমান জানান, প্রচলিত আমদানির তুলনায় ওয়্যারহাউজ থেকে সরাসরি তুলা কেনা তুলনামূলক সাশ্রয়ী হবে। সরাসরি আমেরিকার কৃষক ও জিনিং মিলগুলোর কাছ থেকে তুলা সংগ্রহ করে স্পট মার্কেটের চেয়ে কম দামে তুলা সরবরাহ করার লক্ষ্য নিয়েছে আমেরিবাংলা।
বর্তমানে প্রচলিত উপায়ে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতি পাউন্ড মার্কিন তুলার খরচ পড়ে প্রায় ৮৫ সেন্ট, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত সাধারণ তুলার চেয়ে গড়ে ১৬ সেন্ট বেশি। ওয়্যারহাউজ মডেলের আওতায়, প্রচলিত এই দরের চেয়ে পাউন্ডপ্রতি প্রায় ১০ সেন্ট কমে তুলা সরবরাহের পরিকল্পনা করছে আমেরিবাংলা।
শীর্ষস্থানীয় তুলা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এনভয় টেক্সটাইলের এক কর্মকর্তা জানান, তারা ইতোমধ্যেই আমেরিবাংলার মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে অল্প পরিমাণ তুলা এনেছেন। তিনি বলেন, "সরাসরি সোর্সিংয়ের ফলে প্রতিযোগিতামূলক দাম নিশ্চিত করা যায়। তারা যদি নিয়মিতভাবে বড় চালান নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে আমাদের প্রধান তুলা সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারবে।"
শুল্ক ছাড়ের সম্ভাবনায় তৈরি পোশাক খাত
ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। যার আওতায়, মার্কিন সুতা বা তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ শুল্ক সুবিধা পেতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্দেশিকা বা গাইডলাইনের জন্য পোশাক রপ্তানিকারকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
তিনি বলেন, "মার্কিন দূতাবাস থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে দেশটির তুলা দিয়ে তৈরি পোশাকের শুল্ক সুবিধা সংক্রান্ত বিষয়গুলো সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্পষ্ট করা হবে।" এ বিষয়ে ঢাকায় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিজিএমইএ যোগাযোগ রাখছে বলে জানান তিনি।
আমেরিবাংলার প্রধান নির্বাহী আশওয়ার ক্রেতাদের সম্ভাব্য সুবিধার বিষয় ব্যাখ্যা করে বলেন, "মার্কিন তুলায় ফিনিশড গার্মেন্টস আমদানির ক্ষেত্রে ক্রেতারা ১০ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক ছাড় পেতে পারেন। এর পাশাপাশি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত মার্কিন তুলার মূল্যের ওপর ১৮ শতাংশ হস্তান্তরযোগ্য ট্যাক্স ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ থাকবে।"
এই সুবিধার অপব্যবহার রোধ ও সত্যতা যাচাই নিশ্চিত করতে পোশাক শিল্প মালিকদের স্ব-প্রতিবেদন (সেলফ-রিপোর্টিং), নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের ভৌত অডিট এবং মার্কিন স্টেট ইউনিভার্সিটিগুলোর মাধ্যমে আইসোটোপিক টেস্ট পরিচালনা করার প্রস্তাবিত কাঠামো রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৮৬৯ কোটি ডলারের রপ্তানি করে বাংলাদেশ। এরমধ্যে ওভেন পোশাক থেকে ৪৯৫ কোটি ডলার এবং নিটওয়্যার থেকে ২৬০ কোটি ডলার এসেছে। পোশাক রপ্তানিকারকদের আশা, স্থানীয়ভাবে মার্কিন তুলা ও সুতার সহজলভ্যতা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই রপ্তানি বাজারে তাঁদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাড়তি শক্তি জোগাবে। অর্থাৎ, প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়বে।
