নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলার পর বন্ধ ব্রাউনফিশ স্টুডিও, নির্মাণশ্রমিকদের টাকা-ফোন লুট
রাজধানীর মিরপুরের ইসিবি চত্বরের পাশে নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলার পর বন্ধ রয়েছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও। স্টুডিওটির দরজা ও শাটার বাইরে থেকে বন্ধ। ভেতরে প্রবেশের অনুমতি না থাকলেও বাইরে থেকে ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা গেছে। বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কয়েকটি দরজার কাচ ভেঙে মেঝেতে পড়ে আছে।
স্টুডিওটির কর্মীদের দাবি, হামলার সময় ক্যামেরা, লেন্স, লাইট, সফটবক্স ও সিসিটিভির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়েছে। হামলার সময় স্টুডিওতে থাকা দুজন কর্মীও নিজেদের রক্ষা করতে ওয়াশরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে নিউ গিনি প্রপার্টিজে গিয়ে এই চিত্র দেখা যায়।
ইসিবি চত্বর থেকে কালশীর দিকে কিছুদূর এগিয়ে ডান পাশের একটি গলির ভেতরে নিউ গিনি প্রপার্টিজের সাইনবোর্ড লাগানো ফটক। ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন ও স্থাপনা দেখা যায়। এরমধ্যে একতলা টিনশেডের একটি স্থাপনার এক পাশে ভাড়া নিয়ে ব্রাউনফিশ স্টুডিও পরিচালনা করতেন সালমান মুক্তাদির।
স্টুডিওটিতে মোট সাতটি রুম ও দুটি মেকআপ রুম রয়েছে। প্রতিটি রুমেই বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দরজা ও জানালার কাচ ভেঙে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। রেকর্ডিং ও কনটেন্ট তৈরির কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামও এলোমেলো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
হামলার সময় ওয়াশরুমে আশ্রয়
ব্রাউনফিশ স্টুডিওর কর্মী ইলা বলেন, 'ঘটনার রাতে স্টুডিওতে দুজন ছিলেন। প্রথমে পাশের নির্মাণকাজ থেকে শব্দ আসছে মনে করে তারা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলেন। পরে হামলাকারীরা স্টুডিওতে ঢুকেছে বুঝতে পেরে তারা ওয়াশরুমে গিয়ে আশ্রয় নেন।'
ইলা বলেন, 'সেখান থেকে ফোন করে তাকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে আবার ফোন করা হলে তাদের আর পাওয়া যায়নি। ততক্ষণে হামলাকারীরা তাদের মুঠোফোন নিয়ে নিয়েছিল।'
তিনি বলেন, 'মাস্ক পরা দুই ব্যক্তি স্টুডিওতে ঢুকে ফোনসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যায়। স্টুডিও থেকে একটি ক্যামেরা, তিনটি লেন্স, চারটি লাইট, চারটি সফটবক্স এবং সিসিটিভির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী লুট হয়েছে। আমাদের পুরো স্টুডিওই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।'
ভবনের ফ্ল্যাটে ঢোকার চেষ্টা
স্টুডিওর পাশেই নিউ গিনি প্রপার্টিজের একটি নয়তলা নির্মাণাধীন ভবন। ভবনটির দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ওই তলার একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকতেন এক চিকিৎসক দম্পতি।
হামলার সময় চিকিৎসক দম্পতি বাসায় ছিলেন না। তবে তাদের বোন ও দুই ভাগিনা-ভাগনি ঘরের ভেতরে ছিলেন।
ওই ভবনে ফ্ল্যাট আছে এমন এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'হামলাকারীরা ভবনে ঢুকে ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশের চেষ্টা করে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় তারা ঢুকতে পারেনি। পরে দরজায় ভাঙচুর চালায়।'
তিনি বলেন, 'ওই চিকিৎসক দম্পতি ও তাদের মা-বাবা সেখানে থাকতেন। ঘটনার সময় তারা কেউই ছিলেন না। ঘরের ভেতরে ছিলেন চিকিৎসক দম্পতির বোন ও দুই ভাগিনা-ভাগনি।'
ওই ব্যক্তি আরও বলেন, 'ভবনের নিচে ইঞ্জিনিয়ারের একটি কক্ষ রয়েছে। সেখানে ভাঙচুর করা হয় এবং ইঞ্জিনিয়ার পারভেজকে মারধর করা হয়। তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়া হয়।'
ব্যবস্থাপকের কক্ষেও ভাঙচুর
ওই ভবনের সামনে টিন দিয়ে ঘেরা একটি খালি জায়গা। পাশে রয়েছে আরেকটি নির্মাণাধীন ভবন। এর সামনে মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থান। কবরস্থানের পাশ দিয়ে প্রকল্পের ভেতরের দিকে রাস্তা চলে গেছে।
কবরস্থানের ঠিক উল্টো পাশে একতলা টিনশেডের একটি স্থাপনা। এর একটি কক্ষে থাকতেন নিউ গিনি প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপক জামাল উদ্দিন।
ঘটনার পরদিন ওই কক্ষে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী এবং ফ্রিজ, আলমারি, টেবিল, চেয়ারসহ অন্যান্য আসবাবপত্র ভাঙাচোরা অবস্থায় দেখা গেলেও আজকে তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জামাল উদ্দিন টিবিএসকে বলেন, 'ঘটনার সময় আমি মসজিদে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। শব্দ শুনে পরে এসে দেখি কয়েকশ লোক গুলি চালিয়ে সব ভাঙচুর করে গেছে। মসজিদে থাকায় প্রাণে বেঁচে গেছি। না হলে হয়তো মারা যেতাম।'
নিউ গিনি প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপক জানান, প্রকল্পের মধ্যে মোট ১২টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি নিউ গিনি প্রপার্টিজের এবং বাকিগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
নির্মাণশ্রমিকদের টাকা ও মুঠোফোন লুট
হামলার সময় নিউ গিনি প্রপার্টিজে থাকা নির্মাণশ্রমিকদেরও মারধর ও লুটপাটের শিকার হতে হয়েছে বলে তারা জানান।
প্রকল্পে রাজমিস্ত্রির কাজ করা মো. নয়ন টিবিএসকে বলেন, 'আমরা এখানে কাজ করি, এখানেই থাকি। প্রতিদিনের মতো গত পরশুদিন রাতে আমরা কাজ শেষ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এর মধ্যে ১৫-২০ জনের একটি দল আমাদের এখানে এসে কয়েকজনকে মারধর করে। তাদের হাতে পিস্তল, রামদা, লাঠি, চাপাতি ছিল। তারা অনেকগুলো গুলিও করে। তখন আমরা ভয়ে লুকিয়ে ছিলাম।'
তিনি বলেন, 'আমরা এখানে ৫০ জনের মতন ছিলাম। প্রত্যেকের কাছে টাকা ছিল। তারা রুমে এসে আমাদের সবাইকে বের করে দেয়। কয়েকজনকে মারধরও করে। পরে আমরা ভয়ে বের হয়ে গেলে ভেতরে আমাদের টাকা-পয়সা যা ছিল সব নিয়ে চলে যায়। পরে আমরা রুমে ঢুকে আমাদের ব্যাগগুলোও ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পাই। আমাদের অন্তত ৫০ জন শ্রমিকের জমানো টাকা ও ১৬টি মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে।'
নিরাপত্তাকর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউ গিনি প্রপার্টিজের এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, হামলাকারীরা সন্ধ্যা থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে পারে। কারণ, একসঙ্গে এত মানুষ হামলা চালিয়েছে।
তিনি বলেন, 'হামলাকারীরা স্টুডিও ভাঙচুর করার সময় তিনি সেখানে গেলে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। পরে তিনি দৌড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের ওপর উঠে যান। হামলাকারীরাও ভবনটির দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত উঠে, এরপর আর ওপরে যায়নি।'
অফিস থেকে ল্যাপটপ-কম্পিউটার লুট
নিউ গিনি প্রপার্টিজের এডমিন বিভাগে কাজ করেন মো. পল্লব। তিনি বলেন, 'ওরা কয়েকশ মানুষ হঠাৎ এসে ভাঙচুর করে। স্টাফদের মারধর করে তাদের মোবাইল, টাকা-পয়সা নিয়ে যায়। আমাদের অফিস রুম ভাঙচুর করে। এখানে একটি স্টুডিও রয়েছে, সেটিও ভাঙচুর করে। পরে ৩-৪টি পিকআপ নিয়ে ভেতরে ঢুকে ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়।'
৩৫ কাঠা জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ
পুলিশ বলছে, নিউ গিনি প্রপার্টিজের ভেতরে ৩৫ কাঠা জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, 'একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে নিউ গিনি প্রপার্টিজের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এই হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।'
তবে পুলিশের এই বক্তব্যের বিষয়ে নিউ গিনি প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি।
মামলায় ১৩ জনের নাম, আসামি আরও ১৫০-২০০
হামলার ঘটনায় গত রোববার দুপুরে ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার ভাই।
মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে ভাঙচুরে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি এবং ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার সরঞ্জাম লুটের অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি গুলি, ভাঙচুর ও কয়েকজনকে আহত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনকে ডিবি এবং চারজনকে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
সর্বশেষ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাতে পশ্চিম মাটিকাটা এলাকা থেকে মামলার ৯ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তিনি কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল গফুরের জামাতা।
