৩ হাজার কোটি টাকার এলইডি বাল্বের বাজারের অর্ধেকই মান-সনদহীন, চাপে নিয়ম মেনে চলা উৎপাদকরা
রাজধানীর মগবাজারে ফুটপাতের দোকান থেকে ১২০ টাকায় কেনা একটি এলইডি বাল্ব নষ্ট হয়ে গেল এক মাসের মধ্যেই। তবে বাল্বটির কোনো ওয়ারেন্টি, মান সনদ বা মুদ্রিত মূল্য না থাকায় প্রতিকার পাওয়ার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না ক্রেতার।
নষ্ট হয়ে যাওয়া ২০ ওয়াটের বাল্বটি বদলে নেওয়ার আশায় দোকানে ফিরে যান ক্রেতা সজীব আহমেদ। তবে দোকানের এক কর্মচারী তাকে জানান, এ ধরনের ব্র্যান্ডবিহীন পণ্যে কোনো গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি দেওয়া হয় না।
'কেটি' ব্র্যান্ডের ওই বাল্বে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) অনুমোদনের কোনো চিহ্নও ছিল না। ছিল না সার্টিফিকেশন মার্ক (সিএম) লাইসেন্স নম্বর, ওয়ারেন্টির তথ্য, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও।
এই ঘটনা দেশে লাইটিং পণ্যের বাজারের বড় সমস্যার চিত্র তুলে ধরে। কম দামের অনুমোদনহীন ও মান-সনদবিহীন এলইডি বাল্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে নিয়ম মেনে ও মান বজায় রেখে পণ্য উৎপাদন বা বাজারজাত করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে বাল্বের বাজারের আকার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। এর ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশই অনুমোদনহীন বা মান-সনদবিহীন নিম্নমানের পণ্যের দখলে।
এ ধরনের বাল্বের বিস্তারে ভোক্তার নিরাপত্তা, পণ্যের স্থায়িত্ব ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম মেনে ও পণ্যের মান নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ করা স্থানীয় উৎপাদকদের ওপরও চাপ বাড়ছে।
মগবাজারের ওই দোকানে ভি গ্রিন, লাক্সারি, জাদরু, কসকো, আরলি ও ওয়েলটনসহ আরও কয়েকটি কম দামের ব্র্যান্ডের বাল্ব বিক্রি হতে দেখা গেল।
দোকানের কর্মচারী সোহাগ বললেন, প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের তুলনায় দাম অনেক কম হওয়ায় ক্রেতারা প্রায়ই এসব পণ্য বেছে নেন।
তিনি বলেন, "একই ওয়াটের একটি ব্র্যান্ডেড ও বিএসটিআই অনুমোদিত বাল্বের দাম ২০০ টাকার বেশি। যারা কম দামে বাল্ব কিনতে চান, তারা প্রায়ই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ছোট ব্র্যান্ডের এসব বাল্ব কেনেন।"
ওয়ালটন, সুপার স্টার, আরএফএল, ট্রান্সটেক, আকিজ রিসোর্স (ইনোভার), ওসাকা ও এমইপিসহ বিভিন্ন কোম্পানি বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড মেনে এলইডি বাল্ব ও অন্যান্য লাইটিং পণ্য বাজারজাত করে। ওয়াট, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সুবিধার ওপর নির্ভর করে এসব পণ্যের দাম সাধারণত ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে।
কারওয়ান বাজারের হাবিব সুপার শপের ক্রেতা খায়রুল বলেন, কোনো পণ্যের প্রয়োজনীয় মানসনদ বা অনুমোদন আছে কি না, তা যাচাই করার সুযোগ বা আগ্রহ সব সময় ক্রেতাদের থাকে না।
তিনি বলেন, "শুধু বিএসটিআইয়ের লোগো দেখেই সবাই পণ্য কেনেন না। আবার বাজারে এত ধরনের পণ্য রয়েছে যে কোনটি অনুমোদিত আর কোনটি নয়, তা বোঝাও ক্রেতাদের জন্য সব সময় সহজ নয়।"
"মানুষ কম দামে পণ্য কিনতে চায়। একই সঙ্গে কোন পণ্য আসল আর কোনটি নয়, সেটি আলাদা করাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে," বলেন তিনি।
কম দামের বাল্বে বাড়তে পারে বিদ্যুৎ বিল
এলইডি বাল্ব এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ খরচ করেও প্রয়োজনীয় আলো পাওয়া যায়। তবে এটি নির্ভর করে এলইডি চিপ, ড্রাইভার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের মানের ওপর।
নিম্নমানের বাল্বে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সক্ষমতা কম হতে পারে। ফলে কম বা অস্থিতিশীল আলো পাওয়ার পাশাপাশি ক্রেতার বিদ্যুৎ খরচও বেড়ে যেতে পারে।
ওয়ালটন হাই-টেক পার্কের চিফ বিজনেস অফিসার (ইলেকট্রিক্যালস) সোহেল রানা বলেন, লাইটিং পণ্যের বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পণ্যই ব্র্যান্ডবিহীন এবং বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেই।
এর মধ্যে রয়েছে বাল্ব, ব্র্যাকেট/ডিটি টিউব লাইট, ডাউনলাইট, সারফেস-প্যানেল লাইট, রিচার্জেবল এসি/ডিসি বাল্ব, স্মার্ট এলইডি বাল্ব, ফ্লাডলাইট, স্পটলাইট ও ডেকোরেটিভ লাইট।
সোহেলের মতে, মূলত দুটি পথে এসব পণ্য বাজারে আসে।
এ ধরনের কিছু বাল্ব বা এর যন্ত্রাংশ আমদানিকারকরা চীন থেকে আমদানি করে এবং ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করা হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশ সম্পূর্ণ নকড-ডাউন (সিকেডি) অবস্থায় আমদানি করে বাংলাদেশে সংযোজন করা হয়।
সোহেল রানা বলেন, "এ ধরনের পণ্য ব্যবহারে সাধারণত বিদ্যুৎ বিল দেড় থেকে দুই গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।"
ফলে কম দামে বাল্ব কিনলেও শেষ পর্যন্ত ভোক্তার খরচ বেড়ে যেতে পারে। নিম্নমানের কারণে দ্রুত বাল্ব বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে, আবার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী না হওয়ায় বিলও আসতে পারে বেশি।
নিম্নমানের ড্রাইভার সার্কিটের কারণে আলো অতিরিক্ত ঝিলমিল করতে পারে বা আলোর মাত্রায় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘ সময় এমন অস্থিতিশীল আলোয় পড়াশোনা বা কাজ করলে চোখে চাপ ও অস্বস্তি কিংবা মাথাব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় আলো ব্যবহার করতে হয়—এমন ক্ষেত্রে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে বেশি।
বিএসটিআই সনদ কেন গুরুত্বপূর্ণ
যেসব পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক মান সনদ প্রয়োজন, সেসব পণ্যে বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশন মার্ক (সিএম) লাইসেন্স থাকার অর্থ হলো—নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্যটির মান যাচাই করা হয়েছে।
বিএসটিআইয়ের পরিচালক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন হোসেন বলেন, পণ্যের মোড়কে লেখা দাবি বা বিভিন্ন তথ্যের ওপরই শুধু নির্ভর করা উচিত নয়।
তিনি ক্রেতাদের অনুমোদিত ও নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কেনা, ক্রয় রসিদ সংরক্ষণ, ওয়াট ও লুমেনের তথ্য যাচাই এবং ওয়ারেন্টি কার্ড ছাড়া বাল্ব না কেনার পরামর্শ দেন।
পণ্য কেনার আগে সিএম লাইসেন্সের তথ্য যাচাই করলে মানসনদবিহীন পণ্য কেনার ঝুঁকি আরও কমানো সম্ভব বলে জানান তিনি।
অসম প্রতিযোগিতার মুখে স্থানীয় উৎপাদকরা
বাংলাদেশে লাইটিং পণ্য উৎপাদন ও সংযোজনের সক্ষমতা গড়ে উঠেছে। এ খাতের কোম্পানিগুলো উৎপাদন অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিপণন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার মানদণ্ড মেনে চলতে বিনিয়োগ করছে।
তবে একই ধরনের মান সনদ বা মান নিয়ন্ত্রণের শর্ত না মেনে কম দামে বাজারে আসা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাচ্ছেন এসব খরচ বহন করা স্থানীয় উৎপাদকরা।
আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরএন পাল বলেন, এই সমস্যার প্রভাব শুধু ভোক্তার ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, "ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন, একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ছেন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও। এসব পণ্যের কারণে নিয়ম মেনে উৎপাদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজারে জায়গা করে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে এই পুরো পণ্য বাজারের ওপরই ভোক্তার আস্থা নষ্ট হতে পারে। আমাদের বিনিয়োগেরও রিটার্ন প্রয়োজন।"
অনুমোদনহীন পণ্যের বিরুদ্ধে সরকারের আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান আরএন পাল।
ওয়ালটনের চিফ বিজনেস অফিসার সোহেল রানা বলেন, দেশজুড়ে বিদ্যুতায়নের প্রসারের সঙ্গে গত এক দশকে বাংলাদেশের এলইডি লাইটিং শিল্প আমদানিনির্ভর অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
তিনি বলেন, "গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি), উৎপাদন সক্ষমতা এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ওয়ালটন দেশে বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আইইসি মান অনুসরণ করে।"
সোহেল রানা বলেন, আবাসিক ও শিল্পখাতের লাইটিং পণ্যের মান নিশ্চিত করতে প্রতিটি পণ্যের নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়।
