৯,৭০০ কোটি টাকা কমিয়েও এমআরটি লাইন-১ ও ৫-এর ব্যয় ২ লাখ কোটি টাকার বেশি
সর্বশেষ পুনর্গঠনে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ৯ হাজার ৭৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা কমানো হলেও দুই প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় ২ লাখ কোটি টাকার বেশিই থাকছে।
গত ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে প্রকল্পের ব্যয় কমানো হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে আগস্টের শুরুতে প্রকল্প দুটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) ব্যয় বাড়িয়ে মোট ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
২০১৯ সালে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া প্রকল্প দুটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্প দুটির সম্মিলিত ব্যয় এখন ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কামালাপুর) প্রকল্পের ব্যয় এখন ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। আগস্টে এ প্রকল্পের ব্যয় ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব ছিল।
অন্যদিকে, জাইকার অর্থায়নে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা করা হয়েছে।
কোন কোন খাতে কমল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা
পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্টের পিইসি সভার পর কারিগরি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকল্প দুটির বিভিন্ন খাতের ব্যয় পর্যালোচনা করে কমানো হয়েছে।
এর মধ্যে মূল রেলপথ নির্মাণ, ভূমি উন্নয়ন ও ভবন নির্মাণ এবং বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো বড় খাত রয়েছে।
এ ছাড়া ইউটিলিটি স্থানান্তর, ডিপোজিট ওয়ার্কস, অফিস সরঞ্জাম ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যয়ও পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন ও যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় বাড়ছে ১১৭.৬৪%
পুনর্গঠিত ব্যয় প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কামালাপুর) প্রকল্পের ব্যয় মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বাড়ছে। নতুন প্রস্তাবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ২০৩৩ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। মূল ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ থেকে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল।
পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুযায়ী, সরকারি তহবিলের বরাদ্দ ১৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৫৫২ কোটি ২৬ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আর জাইকার ঋণের অংশ ১১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
পুনর্গঠিত ডিপিপিতে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবে নকশা ও দরপত্র দলিল চূড়ান্ত করতে বিলম্ব এবং দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প হওয়ায় প্রক্রিয়াগত জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগায় বিভিন্ন প্যাকেজের আর্থিক দরপত্র খুলতেও বিলম্ব হয়। ফলে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রক্ষেপণও পিছিয়ে যায়।
বাস্তব পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্পের বিভিন্ন স্টেশনের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে সব স্টেশনের দৈর্ঘ্য ২৫০ মিটার ধরা হলেও যাত্রীসুবিধা ও পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে কয়েকটি স্টেশন বড় করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর মধ্যে নতুনবাজার স্টেশনের দৈর্ঘ্য ৬৭০ মিটার, কমলাপুরের ৪২০ মিটার, বিমানবন্দরের ৩৮০ মিটার এবং নর্থ বাড্ডার ২৭১ মিটার করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং ভেন্টিলেশন শ্যাফটের অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। রাজারবাগ স্টেশন দুইতলার পরিবর্তে তিনতলা করার প্রস্তাব রয়েছে।
নির্মাণকাজের সময় যানজট নিয়ন্ত্রণে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও প্রকল্পে যুক্ত করা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্নের ব্যয় বাড়ছে ১১৭.৮৭%
অন্যদিকে, পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুযায়ী এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের ব্যয় মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ১১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ বাড়ছে।
২০১৯ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। নতুন প্রস্তাবে তা বেড়ে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-১-এর মতো এ প্রকল্পেও ক্রয় প্রক্রিয়ায় জাপানি ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত উচ্চ ব্যয়ের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্রয়সহ বাস্তবায়ন কার্যক্রম প্রায় দেড় বছর থেমে ছিল।
পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুযায়ী, সরকারি তহবিলের বরাদ্দ ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ বাড়িয়ে ২২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা এবং জাইকার ঋণের অংশ ১৩১ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল করিডোর নির্মাণ ও চালু করা। এর মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত অংশ এলিভেটেড এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় আমিনবাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত অংশ পাতাল মেট্রোরেল হিসেবে নির্মাণ করা হবে।
সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এ মেট্রোরেল রুট ২০২৮ সালের মধ্যে পুরোপুরি চালুর লক্ষ্য ছিল। তবে নতুন প্রস্তাবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ২০৩২ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্নে ব্যয় হবে ৪৫,৫০৩ কোটি টাকা
এদিকে ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়া ঋণ হিসেবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা দেবে। বাকি ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে।
এ মেট্রোরেল রুটটি গাবতলী থেকে পাতাল ও উড়ালপথের সমন্বয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে।
