ইরান যুদ্ধে পাশে না থাকায় দ.কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ দিলেন ট্রাম্প
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে 'অত্যন্ত ভালো সম্পর্কের' কথা উল্লেখ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া 'উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর' ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া সম্প্রতি ইরানের 'পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ' কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লিখেছেন, 'এই মহড়াগুলো কেবল ব্যয়বহুলই নয়—যার বেশিরভাগ খরচ যথারীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহন করে—বরং এটি এমন একটি বার্তা দেয় যা সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত এবং শত্রুতাপূর্ণ।'
অবশ্য সিউল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের পূর্বনির্ধারিত সামরিক মহড়া 'পরিকল্পনা অনুযায়ী' চলবে। পিয়ংইয়ং এখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। জাতিসংঘ কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা উত্তর কোরিয়া পুনরায় শুরু করার পরপরই ট্রাম্পের এই মন্তব্য এল।
রবিবার ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন, সোমবার থেকে এই বার্ষিক সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার কথা থাকায় এটি বাতিল করার জন্য 'অনেক দেরি হয়ে গেছে'। তিনি আরও যোগ করেন, 'কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও আমি সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তাঁরা ইরানের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ কার্যক্রমে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে চান কি না। তাঁরা উত্তর দিয়েছেন, ধন্যবাদ, আমরা আগ্রহী নই।'
ট্রাম্পের এই ঘোষণাটি এমন সময়ে এল, যার মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে তিনি ২০১৯ সালের কিম জং উনের সঙ্গে নিজের একটি পুরোনো ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন—'ছবিতে আমাদের মুখভঙ্গি বন্ধুত্বপূর্ণ না দেখালেও আমরা দুর্দান্ত বন্ধু।'
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক নেতারা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে 'উলচি ফ্রিডম শিল্ড' নামের বার্ষিক মহড়ার ঘোষণা দেন। তাঁরা জানান, ১১ দিনব্যাপী এই মহড়ার পরিধি আগের বছরগুলোর মতোই হবে এবং এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮,০০০ সেনা অংশ নেবে। সংবাদ সম্মেলনে সামরিক নেতারা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সহায়তায় উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
মার্কিন সামরিক মুখপাত্র রায়ান ডোনাল্ড বলেন, 'যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা উত্তর কোরিয়ার সেনাদের হুমকি মোকাবিলা করার বিষয়টি আমাদের প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।' বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮,৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
গত শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই যৌথ সামরিক মহড়ার নিন্দা জানিয়ে একে 'আগ্রাসী যুদ্ধের মহড়া' বলে অভিহিত করেছে। কয়েকদিন আগেই দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শনাক্ত করার পর এই মহড়ার ঘোষণা আসে।
২০১৯ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিম জং উনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে পিয়ংইয়ং তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বাড়াতে তৎপরতা জোরদার করেছে। ট্রাম্পই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাত বছর আগে উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রেখেছিলেন।
সিউলের জন্য ট্রাম্পের এই পোস্টটি মিশ্র বার্তা দিচ্ছে। একদিকে, তাঁরা পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে ট্রাম্পকে অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন, যা কিমকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার আশা জাগায়। কিন্তু অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে মার্কিন দ্বন্দ্বে দক্ষিণ কোরিয়ার সরাসরি সামরিক বা লজিস্টিক সহায়তা দিতে অনীহা প্রকাশের কারণে ট্রাম্পের অসন্তুষ্টির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি জাপান, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের মতো অন্যান্য মিত্র দেশের প্রতিও একই ধরনের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার পরিধি কমানোর ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত অবশ্য প্রথম নয়। ২০১৮ সালে কিমের সঙ্গে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার সময় তিনি এই মহড়া সম্পূর্ণ স্থগিত করেছিলেন। সে সময় তিনি মহড়াগুলোকে উত্তর কোরিয়ার জন্য 'উসকানিমূলক' এবং এই 'যুদ্ধ খেলা' বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়েও এই মহড়ার পরিধি কমানো হয়েছিল।
গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে কাগজে-কলমে চলে আসা যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত করার জন্য আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প অতীতেও বহুবার দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়াকে নিরাপত্তা দিলেও তার বিনিময়ে খুব বেশি কিছু পাচ্ছে না। তিনি কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সেনা মোতায়েন এবং এর পেছনে হওয়া খরচের সমালোচনা করেছেন। এর ফলে ওয়াশিংটন ও সিউলের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে, কারণ সিউল এই মার্কিন সেনাকে তাদের জোটের প্রধান ভিত্তি বলে মনে করে। এই উত্তেজনা প্রশমিত করতে চলতি বছরের শুরুর দিকে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং গত বছর প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং ট্রাম্পকে একজন 'শান্তিপ্রণেতা' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
