‘যুদ্ধ শুরু করেছেন ট্রাম্প, মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের’: ট্রাম্পের ওপর ক্ষোভ বাড়ছে উপসাগরীয় মিত্রদের
ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্কে ক্রমেই অসন্তোষ বাড়ছে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যর্থ হচ্ছেন বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের কর্মকর্তারা।
এমনকি এসব দেশের কেউ কেউ নিজেদের ভূখণ্ডে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। আরব ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প বারবার ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিয়েছেন, আবার আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে জানিয়ে সেই হুমকি থেকে সরে এসেছেন। কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ এবং ইরান ও দেশটির মিত্রদের অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষোভ এখন প্রায় অভিন্ন হয়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা বলেন, 'ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছেন, আর এর মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের।' তার মতে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। কাতার ও বাহরাইনে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অসন্তোষের কারণে কিছু দেশ বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও ভাবতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে অদূর ভবিষ্যতে অঞ্চলটির নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। তবে কয়েকটি দেশ নিজেদের বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছে।
গত সপ্তাহে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি 'সংকেত' হিসেবে দেখছেন একজন ঊর্ধ্বতন ইউরোপীয় কর্মকর্তা।
নিয়মিত উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা ওই কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে তিনটি শক্তিশালী সুন্নি মুসলিম দেশ 'তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে'। তিনি আরও বলেন, 'তাদের মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট নয়।'
তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর 'অসাধারণ সম্পর্ক' রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরুর আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক সব মিত্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তিনি বলেন, 'সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ইরান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন।'
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের সরকারের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক বিভাগের পরিচালক ফিরাস মাকসাদ বলেন, 'শুরু থেকেই অসন্তোষ ছিল।' তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা মনে করছেন, ট্রাম্প তাদের 'অপ্রয়োজনীয়ভাবে' এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছেন, যেটির সমাধান করতে ট্রাম্প নিজেই হিমশিম খাচ্ছেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা মাকসাদ বলেন, ট্রাম্পের ইরান নীতিকে ওই অঞ্চলে প্রায়ই 'খামখেয়ালি' ও 'অনিশ্চিত' হিসেবে দেখা হয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের ফেলো আনা জ্যাকবস বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি 'আস্থা কমে গেছে'। তার মতে, মার্কিন মিত্ররা মনে করছেন, 'অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড তাদের নিরাপদ করার বদলে আরও অনিরাপদ করে তুলছে।'
তবে অঞ্চলে থাকা একজন পশ্চিমা কূটনীতিকের মতে, এসব পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সামগ্রিক মনোভাবের বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেও ওই অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের 'উৎসাহের সঙ্গে' স্বাগত জানানো হতো না।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিশেষ চাপের মুখে পড়েছে সৌদি আরব। ইরান ও ইরানপন্থী ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনে ইরানসমর্থিত হুতিদের হামলারও শিকার হয়েছে দেশটি।
হুতিরা বারবার সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে বাব আল-মান্দাব প্রণালির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের অবস্থানও বদলেছে। শুরু থেকেই ওমান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। তবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল।
ওই পশ্চিমা কূটনীতিকের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের ভূখণ্ডে 'অসংখ্য' হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরাক থেকে ইরানসমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার জবাবে সৌদি বাহিনীও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
ঊর্ধ্বতন ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলেন, 'যুদ্ধের শুরুতে তারা সমর্থন করেছিল, এমনটা বলতে চাই না। তবে সত্যি বলতে, তারা পুরোপুরি যুদ্ধের বিরোধীও ছিল না।' তার মতে, দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় তাদের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে বলেই আবুধাবি ও রিয়াদের ধারণা ছিল।
ওই কর্মকর্তা বলেন, এ অবস্থান বদলাতে শুরু করে এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার আলোচনা শুরুর আগে। তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, ইরানের সরকারের পতন যেমন হচ্ছে না; তেমনি তারা হরমুজ প্রণালিও পুনরায় খুলছে না।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক ও আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের ফেলো বদর আল-সাইফ বলেন, এরপর কয়েক মাসে ট্রাম্পের নীতির অসঙ্গতি উপসাগরীয় দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
তিনি বলেন, 'ট্রাম্পের সঙ্গে এসব টানাপোড়েন শুরুর আগেও কোনো স্পষ্ট কৌশল ছিল না।' এ ক্ষেত্রে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
আল-সাইফ বলেন, 'এমওইউটি ছিল একটি তামাশা।' তার মতে, এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান উদ্বেগগুলো, যেমন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এবং তেহরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের বিষয়, সমাধান করা হয়নি।
তিনি বলেন, 'ওই শর্তগুলো আমাদের পছন্দের ছিল না। এ কারণেই এটি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়।'
হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা বলেন, 'ট্রাম্প সবসময়ই স্পষ্ট করে বলেছেন যে তিনি কূটনীতিকেই বেশি পছন্দ করেন।'
তিনি বলেন, 'দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইরান সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে। তারা মার্কিন সেনাদের হত্যা করেছে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এবং এই অঞ্চলের প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। কমান্ডার ইন চিফ এসব সিদ্ধান্তের পরিণতি তাদের ভোগ করতে বাধ্য করেছেন।'
তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তাদের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করা ছাড়া আপাতত অন্য পথও নেই বলে মনে করছেন ওই উপসাগরীয় কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, 'আমরা যা-ই করি না কেন, যুক্তরাষ্ট্রকে না বলতে পারি না।'
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ট্রাম্পের আমলে কুয়েত ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডগলাস সিলিম্যান সম্প্রতি ওই অঞ্চল সফর করেছেন। তিনি জানান, সফরে ওয়াশিংটনের প্রতি হতাশার কথা শুনেছেন। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের অবকাঠামোতে অব্যাহত হামলা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে অস্বীকৃতির কারণে তেহরানের প্রতিও ক্ষোভ বাড়তে দেখেছেন তিনি।
বর্তমানে আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট সিলিম্যান বলেন, অঞ্চলটির মানুষের মধ্যে এক ধরনের 'অদ্ভুত দ্বন্দ্ব' তৈরি হয়েছে। একদিকে যুদ্ধ শুরুর জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্ষুব্ধ; অন্যদিকে সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও গোয়েন্দা তথ্যের জন্য তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপও বাড়বে। এমনিতেই শান্তির সময়ে গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলের কার্যক্রম কমে যায়, পর্যটন ধীর হয়ে পড়ে এবং প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা এড়াতে মানুষ ঘরের ভেতর অবস্থান করে।
তবে শরৎকালে তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আবার স্বাভাবিক জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এ বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় সম্মেলন, শীর্ষ বৈঠক, উৎসব এবং ফর্মুলা ওয়ান রেসসহ বিভিন্ন আয়োজনের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
সৌদি আরবের ১০ম বার্ষিক 'ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ' (এফআইআই) সম্মেলন অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। 'মরুভূমির দাভোস' নামে পরিচিত এই সম্মেলনটি এ বছর অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বড় একটি পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তারা আগের মতো অংশ নেবেন কি না, তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের আস্থারও একটি ধারণা পাওয়া যাবে।
ওই পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অস্থির থাকায় সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্যে কিছুটা পরিবর্তন আনা হতে পারে। তবে সম্মেলন পিছিয়ে দেওয়া হলে তা 'ভুল বার্তা' দেবে।
কুয়েতে ইরান এখনো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দেশটির রাজধানীতে দৈনন্দিন জীবনের অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে বলে জানান আল-সাইফ। তিনি বলেন, 'আমরা এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি।'
১৯৯০ সালে ইরাকের আগ্রাসনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমরা দখলদারত্ব মোকাবিলা করেছি। এটিও মোকাবিলা করতে পারব।'
যুদ্ধের শুরুর দিকে জারি করা নিরাপত্তা বিধিনিষেধের বেশির ভাগই এখন তুলে নেওয়া হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলেছে, শহরের রাস্তায় যান চলাচলও স্বাভাবিক হয়েছে। আল-সাইফও সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আবার পড়ানো শুরু করেছেন।
তবে তার মতে, যুদ্ধ আর বেশি দিন চলা উচিত নয়। তিনি বলেন, 'দ্রুত যুদ্ধের অবসান চাই, এটাই স্বাভাবিক।'
তিনি আরও বলে, 'আজকের পরিস্থিতির তুলনায় উপসাগরীয় যুদ্ধ অনেক বেশি সরল ছিল।'
