যাত্রার ২ বছরেই লাভজনক চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ, আরও এক জোড়া ট্রেন চালুর পরিকল্পনা
বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর দুই বছরের মধ্যেই লাভজনক রুটে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ। পর্যটননির্ভর এ রুটে প্রতিদিন বাড়ছে যাত্রীর চাপ। বর্তমানে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল বলে মনে করছে রেলওয়ে। এ কারণে নতুন আরও এক জোড়া ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী বছরের মধ্যে নতুন ট্রেন যুক্ত করা সম্ভব হলে এ রুটে প্রতি মাসে ১০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এরই মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী মহানগর এক্সপ্রেসের গন্তব্য কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। চলতি মাসেই নতুন এ সেবা চালুর আশা করছে রেলওয়ে।
বাড়ছে যাত্রী ও রাজস্ব
২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর পর থেকেই কক্সবাজার রেলপথে ব্যাপক সাড়া মিলছে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস নামে দুটি বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে প্রবাল ও সৈকত নামে আরও দুটি ট্রেন চলাচল করছে।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার জয়নাল আবেদীন জানান, শুধু এই স্টেশন থেকেই ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৭২২টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। এতে রেলওয়ের আয় হয়েছে ৫৯ কোটি ৪ লাখ ২ হাজার ২৬৫ টাকা।
মাসভিত্তিক হিসাবে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ৮৪ হাজার ৫১৭টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ ২২ হাজার ৮৩০ টাকা। আগস্টে ৮৪ হাজার ৫৪টি টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ২৬০ টাকা। সেপ্টেম্বরে ৯০ হাজার ৩৩০টি টিকিটে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯৫ লাখ ১৮ হাজার ৬৭ টাকা।
অক্টোবরে ৮৬ হাজার ৭৯৭টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৪২ হাজার ১৪০ টাকা। নভেম্বরে ৮১ হাজার ৩৩৮টি টিকিটে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ২৫ হাজার ২৯২ টাকা। ডিসেম্বরে ৯৬ হাজার ৮৭০টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭২ টাকা।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮৯ হাজার ১৯৩টি টিকিটে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৪৩ লাখ ৮২ হাজার ২১৮ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ৫০ হাজার ৮৫৬টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৩ কোটি ৯ লাখ ১৫ হাজার ২৬৬ টাকা। মার্চে ৮০ হাজার ১৭টি টিকিটে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৯১ লাখ ৮৮ হাজার ৫০৪ টাকা।
এপ্রিলে ৮২ হাজার ৪টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫ কোটি ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৩৪৫ টাকা। মে মাসে ৭৮ হাজার ৬০৬টি টিকিটে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৭১৩ টাকা। জুনে ৮৫ হাজার ১৪০টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৫ কোটি ২৬ লাখ ২১ হাজার ৯৫৮ টাকা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্র বলছে, এই রুট থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ফলে যাত্রী চাহিদার পাশাপাশি রেলওয়ের আয় বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ।
যাত্রী চাপ সামাল দিতে নতুন ট্রেন
পর্যটকদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে কক্সবাজার রুটে দিন দিন বাড়ছে যাত্রীর চাপ। চার জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও বিভিন্ন সময় অতিরিক্ত যাত্রী সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় রেলওয়েকে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, 'ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে বর্তমানে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর পাশাপাশি আরও কয়েকটি ট্রেন কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে যাত্রীদের বাড়তি চাহিদা কিছুটা হলেও পূরণ করা সম্ভব হবে।' এরই অংশ হিসেবে রাত ৯টা ২০ মিনিটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া মহানগর এক্সপ্রেসের গন্তব্য চট্টগ্রামের পরিবর্তে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বলেন, 'ঢাকা থেকে চলাচলকারী আরও একটি ট্রেন কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। এ জন্য কোচ ও ইঞ্জিন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। এগুলো পাওয়া গেলে পর্যাপ্তসংখ্যক ট্রেনের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সহজে কক্সবাজার যাতায়াত করতে পারেন।'
পাঁচ জোড়া ট্রেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা
গত ১ আগস্ট কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন ও কক্সবাজার-দোহাজারী রেলপথ পরিদর্শন করেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। এ সময় তিনি জানান, কক্সবাজার রুটে ট্রেন সেবা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে এ রুটে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। এই সংখ্যা বাড়িয়ে পাঁচ জোড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'কক্সবাজার সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। চলতি মাসের মধ্যেই আরও এক জোড়া ট্রেন চালুর আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকে চলাচলকারী মহানগর ট্রেনটি শিগগিরই কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে এবং এটিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ট্রেনে রূপান্তর করা হবে '
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কক্সবাজার রুটে রেলসেবা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন রেলপথের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় লোকোমোটিভের কিছুটা সংকট রয়েছে। বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন লোকোমোটিভ যুক্ত করে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে।
সড়কের চেয়ে দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াত
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সড়কপথে প্রায় ১৫৯ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে সময় লাগে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা। বিপরীতে ১৫১ কিলোমিটার রেলপথে যেতে সময় লাগে প্রায় ৩ ঘণ্টা। ফলে সময় ও নিরাপত্তার বিবেচনায় রেলপথকে সড়কের বিকল্প হিসেবে দেখছেন যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা। সড়কপথের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক এড়িয়ে রেলপথে তুলনামূলক নিরাপদে যাতায়াতের সুযোগ থাকায় এই রুটে আরও ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, 'রেলপথকে কার্যকর করতে হলে রেলসেবার পরিধি ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো গেলে সড়কপথে দুর্ঘটনা কমানো এবং প্রাণহানি রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।'
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বলেন, 'আগামী বছরের মধ্যে কক্সবাজার রুটে আরও ট্রেন বাড়ানো সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ১০ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে।'
