২০২৯ সালের মধ্যে আরও ৩ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার: জ্বালানিমন্ত্রী
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে এবং বিদ্যমান টার্মিনালে সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব কমাতে ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি 'ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট' (এফএসআরইউ) বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
আজ (১৩ আগস্ট) ঢাকার ব্র্যাক ইন-এ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত 'ন্যাভিগেটিং বাংলাদেশ'স এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু আ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার' শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ তথ্য জানিয়েছেন।
একটি এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী। পাশাপাশি আরও তিনটি টার্মিনাল স্থাপনে বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
তিনি বলেন, 'আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে আরও তিনটি এফএসআরইউ থাকবে।'
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
বর্তমানে বাংলাদেশের মহেশখালীর উপকূলে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এগুলোর পুনরায় গ্যাসীকরণের সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)।
জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন টার্মিনালগুলো নির্মাণে বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা একটি মার্কিন প্রতিনিধি দলও এফএসআরইউতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, 'আমরা তাদের আগ্রহ প্রকাশ করে দ্রুত চিঠি দিতে বলেছি, যাতে প্রকল্পগুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি।'
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাত
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারখানা বন্ধ থাকলেও ঋণের সুদ জমতে থাকায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপের বিষয়টি তিনি বুঝতে পারছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, 'নিশ্চয়ই শিল্প খাতে গ্যাসের সমস্যা এবং বিদ্যুতের সমস্যা রয়েছে। এর ফলে শিল্প খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।'
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, 'এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আগুন লাগার ঘটনাটি ছিল অপ্রত্যাশিত এবং সরকার এমন ঘটনা আগে থেকে ধারণা করেনি।'
তিনি জানান, আগুন লাগার সময় এফএসআরইউটির পাশে আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ ছিল। তবে সেটি দ্রুত সরে যেতে পারায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন এবং মেরামতের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করছেন।
তিনি আরও বলেন, 'এফএসআরইউটি মেরামতের পর এর দুটি বয়লারকে সমন্বিতভাবে চালু করতে আরও ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে। ফলে ওই সময়ে গ্যাস সরবরাহে আবারও বড় ধরনের সাময়িক ঘাটতি তৈরি হতে পারে।'
এফএসআরইউতে সমস্যা হলেও এলএনজি কেনা চলমান রয়েছে
ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর কারণে সরকার এলএনজি আমদানি বন্ধ করেনি উল্লেখ করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, 'আমরা গতকাল চারটি এলএনজি কার্গো কিনেছি, যাতে এফএসআরইউ প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কার্গো দেশে পৌঁছাতে পারে।'
এসব ক্রয়কৃত এলএনজি দ্রুত খালাস করা সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি চালু হওয়ার পর গ্যাস সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর জন্য প্রয়োজনীয় বিকল্প কেবল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম আমদানিও দ্রুত করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'কেবলগুলো দেশে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা সেগুলো ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছি। ফলে কাস্টমসে কোনো বিলম্ব হয়নি।'
তবে এফএসআরইউটি মেরামতের দায়িত্ব এর মালিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির বলে জানান তিনি।
দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানোর উদ্যোগ
দেশে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজও দ্রুততর করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) দ্রুত খননকাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে আরও দুটি রিগ আনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।'
মন্ত্রী বলেন, 'গত ১৭ বছর ধরে যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি এবং দেশকে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছে।'
তবে সফলভাবে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে স্বীকার করেন তিনি। ফলে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে বলেও জানান।
দক্ষিণাঞ্চলের এফএসআরইউর জন্য নতুন পাইপলাইন
শুধু এফএসআরইউর সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে থাকা বর্তমান গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্কের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই সম্প্রসারিত এলএনজি অবকাঠামোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, 'আমাদের নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করে লাইনটি মহেশখালীর দিকে নিতে হবে।'
প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো গড়ে তোলাই সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য। এর মাধ্যমে আরও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি জানান, বড় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, 'আমরা দিন-রাত কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো অবকাঠামো শক্তিশালী করা, যাতে বিনিয়োগকারী ও শিল্প খাতের ওপর চাপ কমানো যায়।'
বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ
জ্বালানি তেলের একটি অংশ আমদানির সুযোগ যোগ্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে দেওয়ার নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের কথাও জানান মন্ত্রী। একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এখন একক ক্রেতা হিসেবে তেল কেনে। আমরা যদি একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল থাকি, তাহলে সমস্যায় পড়তে পারি। আমার মনে হয়, জ্বালানি তেলের একটি নির্দিষ্ট অংশ বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে আমদানির সুযোগ দেওয়া উচিত।'
তবে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে জ্বালানি তেলের ব্যবসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি বলে জানান তিনি।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, 'নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগে আমরা এই ব্যবসা অমুক বা তমুক কোম্পানিকে দিয়ে দিয়েছি—এমন কথা বলা নিছক প্রচারণা।'
নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, 'আমরা সব অংশীজনের সঙ্গে বসব, তাদের মতামত নেব এবং কীভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের বাজার কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করব।'
