আশির দশকের কয়েনবক্স টেলিফোন: হাজারো স্মৃতির জাদুর বাক্স
বর্তমান যুগে মোবাইল ফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আঙুলের ছোঁয়ায় প্রিয়জনদের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করতে পারি আমরা, সে বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। শুধু কথা বলা বা খুদে বার্তা পাঠানো ছাড়াও আরও হাজারো কাজ করা যায় এখন মোবাইল ফোন দিয়ে। ইন্টারনেট আর মোবাইল ফোনের যুগলবন্দীতে পৃথিবী এখন আমাদের হাতের মুঠোয়।
তবে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সবসময় এমন আধুনিক ছিল না, ছিল না সহজলভ্যও। আমাদের দেশে আশির দশক থেকে শুরু হয় ল্যান্ডফোনের যুগ। সেই ল্যান্ডফোন বা টিঅ্যান্ডটি ফোনের লাইন পেতে তখন অনেক ঝক্কি পোহাতে হতো। এখন যেমন দোকানে গিয়ে ফোন কিনে সিম লাগিয়েই কথা বলা শুরু করা যায়, তখন বিষয়টি মোটেও এমন সহজ ছিল না। সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে তবেই ঘরে তোলা যেত ল্যান্ডফোন সেট। মাসে মাসে বিল পরিশোধ করতে হতো হিসাব করে। শুধুমাত্র শহুরে অবস্থাসম্পন্ন পরিবারগুলোতেই ল্যান্ডফোন থাকত। এক বাড়িতে ফোন থাকলে আশেপাশের প্রতিবেশীরাও বিপদে-আপদে সেই ফোন ব্যবহার করতেন।
সে সময়ে সবার ল্যান্ডফোন নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ড (বিটিটিবি) দেশের প্রধান শহরগুলোয় কয়েনবক্স টেলিফোন স্থাপন করে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছিল এই কয়েনবক্স। ২৫ পয়সা আর ৫০ পয়সার মুদ্রা ব্যবহার করে মিনিটখানেক কথা বলা যেত। দেয়ালের সাথে একটি বড় বাক্স লাগানো থাকত, যাতে ছিল রিসিভার, ডায়াল করার জায়গা আর কয়েন ফেলার স্লট। কয়েন ফেলে যে কেউ এই ল্যান্ডফোনে কথা বলতে পারত। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিকে পরিচিত করানোর প্রথম ধাপ ছিল এই কয়েনবক্স টেলিফোন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েনবক্স টেলিফোন
সে সময়ে দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে বসানো হয়েছিল কয়েনবক্স টেলিফোন। হলের শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) হলগুলোয় ছিল কয়েনবক্স টেলিফোন।
শিক্ষার্থীদের কাছে চিঠিপত্রের পর যোগাযোগের সবচেয়ে আধুনিক ও তাৎক্ষণিক মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এটি। তবে সময়ের পরিক্রমায় কয়েনবক্স টেলিফোনের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। এরপর প্রচলন হয় পে-কার্ড টেলিফোনের। কয়েনের বদলে কার্ড প্রবেশ করিয়ে কথা বলা যেত। এরপরই চলে আসে মোবাইল ফোন আর সিম কার্ডের বিপ্লব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলে এখনো সেই কয়েনবক্স টেলিফোনগুলোর অস্তিত্ব রয়ে গেছে। যদিও সেগুলোর কার্যকারিতা এখন আর নেই, তবে সাবেক শিক্ষার্থীদের হাসি-কান্না, আনন্দ আর প্রেমের স্মৃতির সাক্ষী হিসেবে সেগুলো আজও নিশ্চলভাবে টিকে আছে। এই কয়েনবক্স টেলিফোন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীর স্মৃতিচারণ শোনা যাক।
লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে কয়েনবক্স টেলিফোন ছিল একটি বিপ্লবের মতো—এমনটাই মনে করেন দর্শন বিভাগের ৮৬-৮৭ সেশনের শিক্ষার্থী শহীদুর রহমান। তিনি বলেন, 'টেলিফোনে ডায়াল ঘুরিয়ে মুহূর্তেই কারো সাথে কথা বলা যায়, এটা ছিল তখনকার সময়ে অনেক আধুনিক ও নতুন একটি বিষয়। আমরা ছিলাম চিঠির যুগের মানুষ। চিঠি পাঠিয়ে সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করতে হতো উত্তরের জন্য। কিন্তু টেলিফোন আসার পর সবকিছু বদলে গেল। আমাদের অনেকেই হলের কয়েনবক্স টেলিফোন দিয়ে জীবনে প্রথমবার ফোন ব্যবহার করেছি।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সবগুলো হলেই কয়েনবক্স টেলিফোন বসানো হয়েছিল। তবে সে সংখ্যা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। একেকটি হলে তিন-চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য ফোন ছিল মাত্র একটি বা দুটি। যার ফলে কথা বলার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হতো। একজনের কথা বলা শেষ হলে তবেই অন্যজন সুযোগ পেতেন। এই লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেক অম্ল-মধুর স্মৃতি আছে।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ৮৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন রিতা ফারাহ নাজ। শামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী থাকাকালীন প্রায় প্রতিদিনই কয়েনবক্স টেলিফোন ব্যবহার করতেন তিনি।
তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, 'আমাকে হলের সবাই চিনত টেলিফোনে বেশি কথা বলা মেয়ে হিসেবে। প্রতিদিন রাতে দুই-তিন ঘণ্টা আমি টেলিফোনে কথা বলতাম। আবার দিনের অবসরেও কথা বলতাম। আমার পেছনে অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত। তবে কারো জরুরি প্রয়োজন থাকলে তাকে আগে সুযোগ দিতাম। দুটি ২৫ পয়সার কয়েন ফেললে এক-দুই মিনিট কথা বলা যেত। এমনও হয়েছে যে, এক রাতেই ২০০ টাকা খরচ করে ফেলেছি! যার সাথে তখন এত কথা বলতাম, তিনি এখন আমার জীবনসঙ্গী।'
পয়সা জমিয়ে আলাপ
কয়েনবক্স টেলিফোনের প্রাণ ছিল কয়েন বা খুচরা পয়সা। ২৫ পয়সা (চার আনা) আর ৫০ পয়সা (আট আনা) দিয়ে কথা বলা যেত। প্রথম দিকে দুটি ২৫ পয়সা ফেললে মিনিট দুয়েক কথা বলা যেত। তার কয়েক বছর পর ৫০ পয়সার চল শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা কথা বলার জন্য পয়সা জমাতেন কিংবা দোকানে গিয়ে টাকার বদলে খুচরা পয়সা নিয়ে আসতেন। যেসব হলের সামনে কয়েনবক্স টেলিফোন ছিল, তার পাশেই থাকত খুচরা পয়সা রাখার মুদি দোকান। দোকানে কেউ টাকা ভাঙিয়ে খুচরা পয়সা চাইলেই বোঝা যেত তিনি কয়েনবক্স ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিটিটিবি কর্তৃপক্ষ থেকে কয়েক দিন পর পর লোক আসতেন কয়েনবক্স খুলে জমানো পয়সাগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাদের কাছ থেকেও শিক্ষার্থীরা টাকা ভাঙিয়ে নিতেন, যার জন্য কোনো বাড়তি খরচ করতে হতো না।
মাঝে মাঝে কয়েনবক্স টেলিফোন কারিগরি গোলযোগ দেখা দিত। তখন শিক্ষার্থীরা হাত দিয়ে বক্সে মৃদু আঘাত করতেন। এ নিয়ে একটি মজার স্মৃতি শেয়ার করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, 'আমি ৯০-৯১ সেশনে শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলাম। কয়েনবক্স টেলিফোন তখন আমাদের মাঝে খুব জনপ্রিয়। মাঝে মাঝে নেটওয়ার্কে সমস্যা হতো। তখন অনেকেই বক্সে হাত দিয়ে আঘাত করতো। একদিন আমি কয়েকবার আঘাত করার পর বক্সের নিচ দিয়ে ঝরনার মতো কয়েন পড়া শুরু হলো!'
'এই বুঝি বেজে উঠল ডায়ালিং টোন…'
কয়েনবক্স টেলিফোনে কথা বলার নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ছিল, যা বক্সের উপরেই লেখা থাকত। প্রথমেই রিসিভারটি তুলে দুটি ২৫ পয়সা ফেলতে হতো। পয়সা ফেলার পর কানে ডায়ালিং টোন শোনা যেত। এরপর ডায়াল ঘুরিয়ে নম্বর টিপতে হতো। সংযোগ স্থাপিত হলে কথা বলা যেত।
এক-দুই মিনিট পর কলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তবে হুট করেই তা হতো না; সময় শেষ হওয়ার আগে সতর্কবার্তা হিসেবে আবার ডায়ালিং টোন বেজে উঠত। সেটি শোনার সাথে সাথেই আরও দুটি ২৫ পয়সা ফেলতে হতো কথা চালিয়ে যাওয়ার জন্য।
শহীদুর রহমান বলেন, 'এখন তো ফোনে টাকা বা মিনিট রিচার্জ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায়। কিন্তু তখন গুরুত্বপূর্ণ কথাটুকু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হতো। অপ্রয়োজনীয় কথা আমরা খুব কম বলতাম। কথা বলার সময় সবসময় হাতঘড়ির দিকে খেয়াল রাখতাম—এই বুঝি বেজে উঠল ডায়ালিং টোন!'
যেসব কয়েনবক্সে ৫০ পয়সা লাগত, সেগুলোতে সতর্কবার্তা হিসেবে ডায়ালিং টোনের বদলে একটি লাল আলো জ্বলে উঠত। সেই লাল আলো দেখলেই আরও একটি ৫০ পয়সার মুদ্রা ফেলতে হতো।
আবেগ আর অপেক্ষা
ড. মফিজুর রহমান বলেন, 'এখনকার স্মার্টফোনের চেয়ে তখনকার ল্যান্ডফোন বা কয়েনবক্স টেলিফোনগুলো অনেক বেশি রোমান্টিক ছিল। এখন স্মার্টফোন একটি প্রয়োজনীয় পণ্য, কিন্তু তখন একটি টেলিফোন কলের পেছনে ছিল গভীর আবেগ আর দীর্ঘ অপেক্ষা। প্রিয় মানুষ বিকাল পাঁচটায় ফোন করবে জানলে আমরা আধা ঘণ্টা আগে থেকেই ফোনের সামনে বসে থাকতাম। যোগাযোগ প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, সেই পুরোনো দিনের আবেগ আর অপেক্ষা কখনোই ফিরে আসবে না।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের গেটকিপার আব্দুল্লাহ আল মামুন ১৯৭৯ সাল থেকে সেখানে কাজ করছেন। তিনি বলেন, 'এই গেটের সামনেই ছিল কয়েনবক্স টেলিফোনটা। ৯০ সাল পর্যন্ত এটার খুব ব্যবহার দেখেছি, এরপর আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে গেল। কত শিক্ষার্থীর প্রেম দেখলাম! কত দুঃসংবাদ শুনে কান্নাকাটি করতে দেখলাম—সবই তো আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে। অনেকের বাবা-মায়ের মৃত্যুর খবরও এই টেলিফোনেই আসত। হাসি-কান্না আর জীবনের নানা বাঁকবদলের সাক্ষী এই টেলিফোন বাক্স।'
প্রযুক্তির উৎকর্ষে কয়েনবক্স টেলিফোনের বিলুপ্তি ছিল অনিবার্য। কয়েনবক্স, পে-কার্ড কিংবা ল্যান্ডফোন—সবই সময়ের নিয়মে হারিয়ে গেছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল আর মাস্টারদা সূর্যসেন হলে এখনো সেই জরাজীর্ণ কয়েনবক্সগুলো দেখা যায়। এখন আর ব্যবহার নেই, মেশিনগুলোও অকেজো; তবুও হাজারো শিক্ষার্থীর স্মৃতি সঙ্গী করে আজও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে এই 'জাদুর বাক্স'।